তফাজ্জল হোসেন স্মরণে

আপডেট : ০২ জুন ২০২১, ০৭:৩০

তফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে তার লেখার মাধ্যমে। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পড়বার সময় তার সম্বন্ধে শক্তিশালী একজন লেখক বলে আমার প্রতীতি জন্মায়। তার সঙ্গে কাজ করবার সুযোগ আমি পাইনি, কিন্তু তার দৈনিক ইত্তেফাকের লেখাগুলি একান্ত আগ্রহভরে ও পরম আনন্দের সঙ্গে পাঠক করেছি। তার মধ্যে যে যুক্তি ও তথ্যের সন্ধান লাভ করেছি তাতে সুগভীর রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টির ভূরি ভূরি প্রমাণ পাওয়া যায়। জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে এই জন্যই তার যোগাযোগ অতি ঘনিষ্ঠ ছিল। তার সত্যনিষ্ঠার কথা সাংবাদিক মহল থেকে বার বার শুনেছি।

স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট ও মানিক মিয়া

তিনি সব মানুষের সমান অধিকারের কথায় বিশ্বাস করতে এবং তার নীতির প্রশ্নে তিনি ছিলেন হিমাদ্রিসদৃশ অটল। তাকে এদিক দিয়ে কোনো ক্রমেই মতের পরিবর্তন করতে দেখিনি। এর ফলে গভর্নমেন্টের থেকে তিনি বহুবিধ নির্যাতন ভোগ করেছেন এবং ক্রমে স্বাস্থ্য হারিয়েছেন কিন্তু মতের পরিবর্তন দিয়ে আপোষ মীমাংসার কথা কোনোদিন চিন্তা পর্যন্ত করেননি। ফলে একবার নয় বহুবার তাকে নানাভাবে নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে।

ফুল ঝরে যায়, সুবাস তো রয়ে যায় - Eye News BD

মানুষের প্রতি ভালোবাসার মতো তার দেশপ্রেম স্পষ্টভাবে রূপ নেয়। তিনি চেয়েছিলেন, স্বাধীন দেশের সব লোক সুখে ও শান্তিতে বাস করবে। এবং সেই শান্তিপূর্ণ জীবনের প্রতিষ্ঠাকল্পে যে সংগ্রামের প্রয়োজন তার থেকে তিনি কোনদিন পিছপা হন নাই। পরন্ত দেশকে অনাগত দিনের শুধু সম্মানই দেন নাই পথের নির্দেশ বরাবরই দিয়ে এসেছেন।

দেশের আবাল বৃদ্ধ বনিতা তাকে অকৃত্রিমভাবে স্নেহ করত। এরই জন্য তার মৃত্যুসংবাদ অতি আকস্মিকভাবে সারাদেশকে চঞ্চল ও অশান্ত করে গেলো। এ সংবাদ যখন প্রথম আসে তখন তা বিশ্বাস করা কঠিন ছিল। কিন্তু তার শরীরের অবস্থা যারা জানতেন তাদের কাছে মর্মান্তিক ব্যথা বহন করেই এ সংবাদ তাদের বিষাদ সাগরে ভাসিয়ে দেয়।

Tofazzal Hossain Manik Mia and Begum Manik Mia (Mrs. Mazeda Begum ) at the  foundation laying ceremony of Ittefaq Bhaban.

তফাজ্জল হোসেন সাহেবের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় অনেক পরে হয়েছে। তখন তার মধ্যের মানুষটিকে জানবার সুযোগ হয় এবং আমি দেখে মুগ্ধ হই যে, তার দেশের প্রতি ভালোবাসা সত্যিই অকৃত্রিম। তিনি নেতৃত্বের ভিখারী ছিলেন না এবং সেই জন্যই তাকে কোনো বিশিষ্ট পদে কখনো সমাসীন দেখলাম না। তার জীবনকে প্রাচুর্যের মধ্যে যাপন করার সুযোগ তিনি পান নাই। তবু তাকে কেউ কখনো অর্থের প্রলোভনে তাকে বিশ্বাসেই বিরুদ্ধে কোনো কাজ করাতে পারে নাই।

তিনি যে আদর্শ দেশের যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে রেখে গিয়েছেন তাতে কোথাও ভুলের কোনো চিহ্ন আমার চোখে পড়ে নাই। আমি পশ্চিম পাকিস্তানে বেশ কিছু দিন পর্যন্ত থাকবার সুযোগ পেয়ে এ সম্বন্ধে এখন গভীর বিশ্বাস পোষণ করি যে, পাকিস্তানের অখণ্ডতা বহাল রাখতে হলে আমাদের দুটি অঞ্চলকে সব দিক দিয়ে সমান অবস্থায় উন্নীত করতে হবে। কোনো দেশেই এমনি সমান অবস্থা ব্যতিরেকে দুই বা ততোদিক অঞ্চলের একত্র থাকা সম্ভব নহে।... দেশের এক অঞ্চলের অধিবাসী থেকে যদি দেশরক্ষা বাহিনীর সৃষ্টি হয় তা হলে তার দ্বারা সারা দেশের প্রতিরক্ষা কাম সম্পূর্ণরূপে সম্পন্ন হয় না। পাকিস্তানের দেশরক্ষা বিভাগে বিজ্ঞানী উপদেষ্টারূপে আমার এ বিষয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়, তার উপলব্ধি সেদিন ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে সকলে মনে জেগে উঠেছে। এই সব বিভিন্ন কারণে আমিও গভীরভাবে বিশ্বাস করি যে ইত্তেফাকের সম্পাদকরূপে মানিক ভাই যে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের উপদেশ দিতেন, তা কত সত্য এবং কত প্রয়োজনীয়।

স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট ও মানিক মিয়া

দুঃখের বিষয় বার বার এমনি সত্য কথা উচ্চারণের ফলে পূর্ব পাকিস্তানের উপর দেশের তদানীন্তন পরিচালকদের মধ্যে দেশাত্মবোধের যথেষ্ট বিকাশ না হওয়ায় তারা পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিষ্ট প্রাধান্যের স্বপ্ন দেখেছেন অথবা আমাদের পড়শী দেশের সঙ্গে অলীক যোগাযোগের স্বপ্ন দেখেন। এবং তার ফলে সত্যভাষী লোকদের উপর জুলুমের আর শেষ হয় না। এমনি জুলুমের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন দেশের এই প্রিয়সন্তান দেশমাতার সুযোগ্য পুত্র মানিক ভাই। আমরা আজ তাঁকে হারিয়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েছি।

মানিক মিয়া এভিনিউ' চিনি কিন্তু মানিক মিয়াকে কতটা জানি! – বাংলা রিপোর্ট

কিন্তু আমার বিশ্বাস যে সত্যের সন্ধান মানিক ভাই নিজে লাভ করেছিলেন, তা তিনি দেশবাসীর কাছে বারবার আলোচনা করেছেন এবং নিশ্চয় আমার যুবক ভাইরা এর থেকে ন্যূনতম আদর্শের সন্ধান পেয়েছেন। মানিক ভাইয়ের সেই আদর্শ আজ উজ্জ্বল হবে পাকিস্তানের বর্তমান গভীর অন্ধকারে সত্যিকার পথের সন্ধান দিক এবং তার প্রদত্ত পথের দিশা লাভ করতে এই জ্ঞানের বাতি বহন করবার জন্য আবার নতুন লোকের সৃষ্টি হোক। মানিক ভাই যে আদর্শের জন্য জীবন দান করলেন সেই আদর্শ নূতনভাবে আমাদের যুবকসমাজকে উদ্বুদ্ধ করে তুলুক এবং ইত্তেফাকের কর্মীরা তাঁর সাহায্যে মনে বল সংগ্রহ করুন যে, তাঁদের মানিক ভাই অসুস্থ শরীরকে অবসর দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর আদর্শের মৃত্যু হয় নাই, উপরন্তু তা উজ্জ্বলতররূপে জেগে উঠেছে। আজ ইত্তেফাক পরিবার যদি এ বিষয়ে সচেতন হয়, তাহলে মানিক ভাইয়ের মৃত্যুহীন পরশ তারা বরাবরই পেতে থাকবেন।

সেই আদর্শ আজ সারা দেশে প্রচারিত হোক এবং সেই আদর্শ লাভ করতে সকলে এরকম হয়ে জেগে উলে আমরা দেখবো মানিক ভাই আমাদের মাঝে চির বর্তমান ও মহান রূপ নিয়ে জেগে আছেন। তাঁর আশা আমাদের ভবিষ্যেক সুন্দর, উজ্জ্বল ও সুখময় করুক, এই আজ একান্ত মনে প্রার্থনা করছি। (সংক্ষেপিত)

রসায়নবিদ, গ্রন্থকার এবং শিক্ষাবিদ
প্রকাশকাল: ১৪ জুন ১৯৬৯

ইত্তেফাক/কেকে