জিভে জল আনা এক চমত্কার ঝাঁজালো খাবার। বাঙালি খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে এর সম্পর্ক বিনে সুতোয় গাঁথা। গ্রামবাংলায় বৈশাখ মাসের খুব সকালে পান্তাভাত বা ভরদুপুরে বরই, পেয়ারা, আমড়া, চালতা ও কাঁচা আম বা বিকেলে দলবদ্ধভাবে বসে মুড়ি কাসুন্দি দিয়ে মাখিয়ে খাওয়া বহুল প্রচলিত।
কাসুন্দি একসময় শুধু জমিদার বা রাজবাড়ির চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন ঝাঁজালো রাইসরিষা ওঠামাত্রই বেশ উত্সবমুখর পরিবেশে কাসুন্দি তৈরি করার পর প্রাচীন বাংলায় রাজকীয় বা জমিদারি রীতির অংশ অনুযায়ী চাটনি হিসেবে গরম ভাত, আমের তরকারি ও মরিচের সঙ্গে পরিবেশন করা হতো। কাসুন্দিকে তখন বলা হতো ‘চাটনির রানি’। রেণুকা দেবী চৌধুরাণীর ‘পথের আচার’ বই থেকে প্রাচীন বাংলার কাসুন্দির ঐতিহ্য সম্পর্কে বেশ খানিকটা ধারণা পাওয়া যায়।
বাংলা বাগধারায় পাওয়া যাবে—‘পুরনো কাসুন্দি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি’, ‘আড়াই কড়ার কাসুন্দি’, ‘হাজার কাকের গোল’। বলা যায় কাসুন্দি বাঙালির জীবনে বেশ ভালোভাবেই জড়িয়ে আছে।
গ্রামবাংলায় বৈশাখ মাসে নানা ধরনের চৈতালি ফসলের সঙ্গে রাইসরিষা ওঠে। গৃহবধূ ও মেয়েরা এই সরিষা পানি দিয়ে ধোয়ার পর শুকিয়ে নেয়। এরপর শিল-পাটায় বেশ কিছুক্ষণ সরিষা বেটে নেওয়া হয়। এরই মাঝে চুলায় পানি গরম হতে থাকে। তারপর এর মাঝে বাটাসরিষা, কাঁচামরিচ, গোলমরিচ, হলুদ, জিরা, পাঁচফোড়ন, আদা ও লবণ দিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়। মিশ্রণ ঘন হতে শুরু করলে যোগ করা হয় সামান্য কাঁচাআমবাটা, লেবুর রস বা তেঁতুলের রস। এরপর ঠান্ডা করে হাঁড়ি বা বোতলে সংগ্রহ করা হয় কাসুন্দি।
ঐতিহ্যগতভাবেই বৈশাখ মাসের দিকে বিশেষ করে মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, যশোর, মাগুরা, খুলনা, টাঙ্গাইল, পাবনা ও রাজশাহী জেলায় কাসুন্দি তৈরি করা হয়। কাসুন্দি দিয়ে মাখানো টক জাতীয় ফলের স্বাদের জুড়ি মেলা ভার। কাসুন্দি ও আম দিয়ে রান্না করা ইলিশ, পাবদা ও টেংরা মাছের তরকারির ঘন ঝোল দিয়ে ধোঁয়াওঠাভাতের স্বাদ যেন অমৃত।
টাটকা কাসুন্দির স্বাদ সবসময় অতুলনীয়। এর ঝাঁজ সর্দি-কাশিতে উপশম দেয়। শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানও (যেমন ফাইবার, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, জিংক ও সেলেনিয়াম) পাওয়া যায় এতে ব্যবহূত রাইসরিষা থেকে। পুরনো বা বাসি কাসুন্দি অনেকটাই বিস্বাদ ও খাওয়ার অযোগ্য। তাই পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটাঘাঁটি করলে দুর্গন্ধ বের হয়। এখানেই সেই বাগধারা ‘পুরনো কাসুন্দি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি’-র সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়।
বেনজীর আহমেদ সিদ্দিকী
