নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন আলোচিত মিতু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুসার স্ত্রী পান্না আক্তার। গত সোমবার আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবার নিরাপত্তা চেয়ে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তিনি। রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি মাহবুব মিল্কি বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, পান্না আক্তার গত সোমবার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তার ক্ষতি করতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে তিনি থানায় জিডি করেছেন। এ বিষয়ে পান্না আক্তার গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ২০১৬ সালে মিতু হত্যার পর আমার স্বামীকে যখন ডিবি পুলিশ নিয়ে যায়, তারপর থেকেই আমাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছিল। মোবাইল ফোনেই বেশির ভাগ হুমকি পেতাম। আমাকে বলা হতো এ বিষয়ে যেন মুখ না খুলি। তখন তো আমার কাছে ভালো মোবাইল ছিল না। তাই তাদের কথাগুলো রেকর্ড করে রাখতে পারিনি। তখনো রাঙ্গুনিয়া থানায় গিয়েছিলাম জিডি করার জন্য, কিন্তু আমার জিডি নেওয়া হয়নি। ভয়ে এতদিন এসব কথা বলিনি। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর মিতু হত্যায় নতুন একটি মামলা হয়েছে। সেই মামলার সাক্ষী হিসেবে গত সোমবার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছি। এতে সেই হুমকিদাতা চক্রটি আমার ওপর ক্ষুব্ধ হতে পারে। তারা আমার বা পরিবারের সদস্যদের বড় ধরনের ক্ষতিও করতে পারে। তাই নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করেছি।’ গত সোমবার চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট হোসেন মো. রেজার আদালতে পান্না আক্তারের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এ বিষয়ে পান্না বলেন, ‘মিতু হত্যার বিষয়ে গত কয়েক দিন মিডিয়ায় যেসব কথা বলেছি, সেসব কথাই আদালতকে অবহিত করেছি। এর বাইরে নতুন করে কিছু বলিনি।’
২০১৬ সালের ৫ জুন মাহমুদা খানম মিতু খুন হওয়ার ১৭ দিন পর রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যান মুসা। তার স্ত্রীর দাবি, ২২ জুন মুসাকে চট্টগ্রাম নগরীর কাঠগড় এলাকা থেকে ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তবে পুলিশ এ কথা অস্বীকার করে আসছে। পুলিশের খাতায় মুসা আজও পলাতক। মুসাকে পলাতক দেখিয়েই গত ১২ মে আদালতে মিতু হত্যা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এই মামলার বাদী ছিলেন মিতুর স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার। একই দিন বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে নতুন একটি হত্যা মামলা করেন মিতুর বাবা। এতে বাবুল, মুসাসহ আট জনকে আসামি করা হয়েছে।
নগরীর পাঁচলাইশ থানায় এই মামলা হওয়ার পরদিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মুসার স্ত্রী পান্না আক্তারের কিছু বক্তব্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পান্না দাবি করেন, তার স্বামী মুসা মিতু হত্যায় জড়িত ছিলেন। তবে তিনি স্বেচ্ছায় এ কাজ করেননি। মিতুর স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের নির্দেশে আরো কয়েক জনের সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন তিনি। মুসার অবস্থান নিয়ে পুলিশের বক্তব্য প্রসঙ্গে পান্না আক্তার বলেন, তার স্বামী পলাতক নন। মিতু হত্যার ১৭ দিন পর ২২ জুন চট্টগ্রাম নগরীর কাঠগড় এলাকা থেকে পুলিশ মুসাকে গ্রেফতার করে।
গত ১৯ মে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পান্না আক্তার একই দাবির পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি বলেন, মুসাকে গ্রেফতার অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে দুই জন সিএমপির, দুই জন ওসিকে তিনি চিনতে পেরেছেন। তাদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে পান্না বলেন, তারা সাদা পোশাকে ছিলেন। তাদের নাম প্রকাশ করলে আমাদের বিপদ হতে পারে। বাকি যারা ছিলেন তাদের কয়েক জনকে দেখলে চিনতে পারব। মিতু হত্যায় মুসার জড়িত থাকার বিষয়টি এতদিন গোপন রাখার কারণ জানতে চাইলে পান্না আক্তার বলেন, ‘মুসা জড়িত থাকার কথা প্রকাশ করতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই নির্দেশদাতা বাবুল আক্তারের কথা বলতে হতো। কিন্তু আমাকে বিভিন্ন জায়গা থেকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, যাতে আমি এ বিষয়ে মুখ না খুলি। কাউকে কিছু না বলি। মামলার তদন্তকারীরাও কখনো আমাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেননি। তাই এতদিন কাউকে বলা হয়নি। এখন দেখলাম নতুন একটা মামলা হয়েছে, যেখানে বাবুল আক্তারও আসামি। তাই ভাবলাম এখন সত্য কথা বলার সময় এসেছে।’
পান্না আক্তার আরো বলেন, ‘মিতু মারা যাওয়ার চার-পাঁচ দিন পর আমার স্বামীর মোবাইলে টিঅ্যান্ডটি নম্বর থেকে একটি কল এসেছিল। আমি ফোন রিসিভ করেছিলাম। কলদাতা তার পরিচয় না দিয়ে মুসা কোথায় জানতে চায়। আমি বলি, উনি বাসার বাইরে। এ কথা বলার পর কলদাতা আমাকে বলেন, মুসাকে সাবধানে থাকতে বলবা। এটা বলেই তিনি ফোন রেখে দেন। আমার স্বামীকে এ ঘটনা বলার পর তিনি বলেন, এটা বাবুল আক্তার স্যার। উনি আমাকে এই কাজটা (মিতু হত্যা) করতে বাধ্য করেছেন। এরপর আমার স্বামী আমাকে বলেন, আমি যে মিতু হত্যায় জড়িত ছিলাম, এই কথাটা তুমি কাউকে বলো না। আমার সমস্যা হবে। তাছাড়া স্যার (বাবুল আক্তার) আমাকে বলেছেন, তিনি আমাকে রক্ষা করবেন। আমার কোনো সমস্যা হবে না।’
