কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক বিভাগের অনাপত্তি বাতিলের নির্দেশ অন্য বিভাগের!

আপডেট : ০২ জুন ২০২১, ০০:৩২

অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে রপ্তানি পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই অনিয়ম। আবার রপ্তানি না করেই মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধের তালিকায় রয়েছেন সিংকি গার্মেন্টসের কর্ণধার মো. ইকরাম উল্লাহ নামের এক ব্যবসায়ী। ২০১৯ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে কারখানা। এরপরও বিশেষ সুবিধায় এই খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দিয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির এ সিদ্ধান্তে অনাপত্তিও দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগের পর্যবেক্ষণে সম্প্রতি পুনঃতপশিল সুবিধা বাতিল করতে বলা হয়েছে। জনতা ব্যাংকের কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউ শাখার স্বল্প পরিচিত গ্রাহক সিংকি গার্মেন্টসের ক্ষেত্রে ঘটেছে এমন ঘটনা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রপ্তানি না করেই রপ্তানি দেখিয়ে চক্রটি বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছে। বিল অব লেডিং, বিল অব এক্সপোর্ট বা কাস্টম সার্টিফায়েড ইএক্সপির মতো ডকুমেন্ট না থাকার পরও তাদের রপ্তানি বিল কেনে জনতা ব্যাংক। ভুয়া ডকুমেন্টের ভিত্তিতে রপ্তানি বিল কেনা হয় বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০১৭ সালের এক পরিদর্শনে উঠে আসে। এ তথ্য উদ্ঘাটনের পর তখন জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উলটো প্রতিষ্ঠানটির নামে ৬০ কোটি ৯৮ লাখ টাকার ঋণ সৃষ্টি করা হয়। সুদসহ যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এই ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে প্রতিষ্ঠানটির বন্ধক আছে মাত্র ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার সম্পদ। এর মানে বন্ধকি সম্পত্তির ২৮ গুণের বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সাল থেকে বন্ধ প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহ না থাকায় সিংকি গার্মেন্টের ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা কম। বিএফআইইউর তদন্তে মানি লন্ডারিংসহ নানা অনিয়মের তথ্য উঠে আসায় ২০১৯ সালের জুনে সিংকি গার্মেন্টের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়। দুদক বিষয়টি নিষ্পত্তি করেছে কি না নিশ্চিত না হয়েই গত বছরের ২৯ নভেম্বর ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে এই ঋণ পুনঃতপশিলে অনাপত্তি দেওয়া হয়। এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ পাওনা পরিশোধে ছয় বছর সময় দেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গত ১৪ ডিসেম্বর জাল-জালিয়াতির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অনাপত্তি প্রত্যাহারে বিআরপিডিকে পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট ঋণ পুনঃতপশিলে অনাপত্তি দেওয়ায় ভবিষ্যতে এর দায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর বর্তাবে। একই সঙ্গে জনতা ব্যাংককে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা বের করে নেওয়ার বিষয় উদ্ঘাটিত হয়েছে। ফলে বিআরপিডির ঋণ পুনঃতপশিল সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। সমুদয় ঋণ আদায় করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, আরজেএসসিতে ২০১০ সালে নিবন্ধিত মেসার্স সিংকি গার্মেন্টের পরিশোধিত মূলধন ৫০ লাখ টাকা। এর ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা দেখানো হয়েছে ইকরাম উল্লাহর। বাকি ৪৯ শতাংশ নেদারল্যান্ডসের বোগারার্ডস ইন্টারন্যাশনাল বি.ভি-এর প্রতিনিধি রোনাল্ড বোগারার্ডসকে দেখানো হয়। এই দুই নাম ব্যবহার করে যৌথ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। তবে হিসাব খোলার ফরমে স্বাক্ষর রয়েছে শুধু ইকরাম উল্লাহর। আবার বিদেশি বিনিয়োগকারীর নামে অ্যাকাউন্টের জন্য বিনিয়োগ বোর্ড থেকে অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা নেওয়া হয়নি। ফলে পুরো বিনিয়োগ ইকরাম উল্লাহর একার হলেও তিনি বিদেশি বিনিয়োগ দেখিয়েছেন।