রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় কাম্য নহে

আপডেট : ০২ জুন ২০২১, ২১:৩১

রাষ্ট্রীয় সম্পদ ছাড়া কখনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব নহে। যেই দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহার যত যথাযথ, সেই দেশ অর্থনৈতিক দিক দিয়া তত উন্নত ও সমৃদ্ধ। মূলত দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা অনেকটাই নির্ভরশীল দেশের ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয়সহ সকল সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের ওপর। কিন্তু আমরা ব্যক্তিগত সম্পদের সুষ্ঠু সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর যতটা গুরুত্ব প্রদান করি, ততটা রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষেত্রে করিনা বলিলেই চলে। এই ব্যাপারে আমাদের সামষ্টিক অবহেলা ও উদাসীনতা বিদ্যমান। অযত্ন ও অবহেলায় পড়িয়া আমাদের প্রচুর রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যয় ও অপচয় হইতেছে। যেমন—খুলনা কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুইটি হল রুমে অযত্ন ও অবহেলায় পড়িয়া রহিয়াছে মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ১০টন বই। এইভাবে দীর্ঘদিন মেঝেতে পড়িয়া থাকায় পাঠ্যবইগুলি এখন উইপোকার খাবারে পরিণত হইয়াছে। পুরাতন বইগুলি বিক্রয় করিতে পারিলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাশ্রয় হইত। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা না আসায় বইগুলি দুঃখজনকভাবে নষ্ট হইয়া যাইতেছে। ইহা একটি ছোট্ট উদাহরণ মাত্র। প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশে কতভাবে যে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হইতেছে তাহার ইয়ত্তা নাই।

রেলস্টেশনে বা রেললাইন দিয়া যাওয়ার সময় খেয়াল করিলেই আমাদের নজরে পড়ে অসংখ্য রাষ্ট্রীয় সম্পদের করুণ দশা। প্রত্যেকটি স্টেশনে পড়িয়া রহিয়াছে নষ্ট হওয়া ট্রেনের বগি বা মূল্যবান ইঞ্জিন। এইগুলি বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া পড়িয়া থাকিলেও তাহা মেরামত বা বিক্রয়ের নাম নাই। হাজার হাজার ফিট রেলের স্লিপার, লোহার যন্ত্রাংশ, পাথরসহ অনেক সম্পদই মাটির নিচে বিলীন হইয়া যাইতেছে ক্রমান্বয়ে। অপ্রয়োজনে ও অবৈধভাবে বিদ্যুত্ ও গ্যাসের ব্যবহার আমাদের দেশে নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। গ্রাহকরা যেমন অপচয় করিতেছেন, তেমনি কর্তা ব্যক্তিরাও রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয়ে পিছাইয়া নাই। বিভিন্ন থানা কমপ্লেক্সেও আটক করা বিভিন্ন যানবাহন পড়িয়া থাকিতে দেখা যায়। বিভিন্ন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালগুলিতেও দেখা যায় বিভিন্ন শিক্ষা ও চিকিত্সা উপকরণ বহু দিন ধরিয়া অব্যবহূত অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। বিশেষ করিয়া প্রাইমারি স্কুলে অসংখ্য চেয়ার-টেবিল, আসবাবপত্র ইত্যাদি সামান্য ত্রুটি হইলেই তাহা ফেলিয়া রাখা হইতেছে গোডাউন রুমে। রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আধুনিক ও পর্যাপ্ত ওয়ার্কশপ না থাকায় মেরামতের অভাবে সংস্থাটির বিভিন্ন ডিপোতে পড়িয়া রহিয়াছে পাঁচ শতাধিক বাস। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তি সামগ্রী সঠিকভাবে ব্যবহার না করায় তাহা পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলিয়া রাখা হইতেছে। ইহাছাড়া রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, ফুটওভার ব্রিজ, ফ্লাইওভার ইত্যাদি সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হইতেছে না। বন্ধ হইতেছে না খাসজমি ও ফুটপাতের অপব্যবহার। শুল্ক অফিসেও পরিত্যক্ত অবস্থায় বিভিন্ন যানবাহন ও আসবাবপত্র নষ্ট হইতেছে।

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন করিতে গিয়া সাধারণ মানুষের নিকট হইতে আদায় করা হয় বিপুল পরিমাণ ট্যাক্স বা কর। কিন্তু সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হইলেও শেষপর্যন্ত বিল কোম্পানি বা ব্যক্তি বিশেষ না দিয়া সরকারি কোষাগার হইতেই দেওয়া হয়। ঠিকাদাররা নিম্নমানের কাজ করিলেও রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হয়। বিস্ময়ের ব্যাপার হইল, রাষ্ট্রীয় সম্পদের যদি অপচয় ও অপব্যবহার হয় তাহা হইলে কাহাকেই শাস্তির জন্য আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াইতে হয় না। অর্থনীতিবিদদের মতে, গত ৪৫ বত্সরে আমাদের রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সম্পদের যত অপচয় হইয়াছে, তাহা দ্বারা বাংলাদেশের সমান আরো দুইটি দেশ গড়িয়া তোলা সম্ভব হইত। অতএব, রাষ্ট্রীয় অপচয় ও অপব্যয় রোধেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। তাহা হইলেই ভবিষ্যতে আমরা একটি উন্নত জাতিতে পরিণত হইতে পারিব।