আমাদের দেশে কিছুদিন পর পর একেকটি মাদকদ্রব্য নিয়ে হুজুগ ওঠে। আলোচিত হয়। আটের দশকে বিখ্যাত ছিল ফেনসিডিল, তারপর হেরোইন। গত কয়েক বছর ধরে চলছে ইয়াবা। গত কয়েক দিন ধরে আলোচিত হচ্ছে এলএসডি। সেদিন পত্রিকায় যখন দেখলাম, ‘এলএসডিসহ গ্রেফতার পাঁচ ছাত্র পাঁচ দিনের রিমান্ডে’। প্রথম দেখায় পড়েছিলাম ‘এলএমজিসহ’। ভেবেছিলাম আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যাপার। যেটাকে বলা হয় লাইট মেশিন গান। পরে ভালো করে দেখি এটা এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডায়েথিলামাইড)! নতুন এক মাদকের নাম!
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনার পুলিশি তদন্তে এলএসডি নামক মাদকদ্রব্যটির নাম সামনে চলে এসেছে। এটা কারা খায়, কীভাবে আসে, কারা সরবরাহ করে—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটা নাকি বিশেষ ধরনের মাদকদ্রব্য, যাকে ‘সাইকাডেলিক’ মাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নেশার সামগ্রী হিসেবে এলএসডি কিন্তু বেশ অভিজাত। রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি একটি পদার্থ, যা রাইসসহ কয়েকটি বিশেষ শস্যের গায়ে জন্মানো এক বিশেষ ধরনের ছত্রাকের শরীরের লাইসার্জিক অ্যাসিড থেকে তৈরি করা হয়। এটি স্বচ্ছ, গন্ধহীন একটি পদার্থ যা জিহ্বার নিচে নিয়ে কিংবা ইনজেকশনের মাধ্যমে সেবন করা হয়।
বাংলাদেশে মাদক হিসেবে নিষিদ্ধের তালিকায় থাকা এলএসডি গ্রহণ করলে নাকি মানুষের মধ্যে একধরনের বিভ্রম তৈরি হয়। আশপাশের বাস্তবতা অনুভব হয় ভিন্নভাবে। যা নেই, এমন অলীক বস্তুও দেখতে পাওয়া যায়, যা আছে তা দেখা যায় না। এলএসডি গ্রহণ করে ভুল রাস্তা দেখে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া, বাড়ির জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়া বা অহেতুক আতঙ্কিত হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।
এলএসডির বিরুদ্ধে পুলিশের এত কঠোর মনোভাবের কারণ কী? কারণ এটা একটা বিপজ্জনক মাদকদ্রব্য। এই মাদক গ্রহণ করলে মানুষের শরীর ও মনের সমূহ ক্ষতি হয়। মাদকগ্রহণকারী ব্যক্তি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর বিপদের কারণ হতে পারে। তাই সরকার এই মাদকের বিরুদ্ধে নানা অভিযান পরিচালনা করছে। অবশ্য সরকার গত কয়েক বছর ধরে সব ধরনের মাদকের বিরুদ্ধেই অভিযান পরিচালনা করছে। যদিও সরকারের এ ভূমিকা নিয়ে নানা সমালোচনা আছে।
মাদকের পক্ষের লোকেরা মনে করেন যে, মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণীর পার্থক্যই হলো, মানুষ নেশা করে অন্য কোনো প্রাণী তা করে না। নিজের ইচ্ছাতে নেশা করা বা নেশাগ্রস্ত হওয়া নিতান্তই মানুষের অনন্য সৃষ্টি। অন্য কোনো প্রাণীর পক্ষে যা কল্পনাও করা সম্ভব না।
শুধু মাদকের নেশাই নয়, মানুষের রয়েছে নানা ধরনের নেশা। কারো ফেসবুকের নেশা, কারো টাকার নেশা, ক্ষমতার নেশা, ক্ষমতায় থাকার নেশা, কারো ঘুরে বেড়ানোর নেশা—এমনি নানা নেশায় আসক্ত মানুষ। কিন্তু এসব নেশা তাড়ানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কোনো উদ্যোগ বা ভূমিকা নেই, রাষ্ট্রের যত মাথাব্যথা তা ঐ মাদকের নেশার বিরুদ্ধে! কেন বাবা, কোনো মানুষ যদি সজ্ঞানে নেশা করে, আগুনে কিংবা সমুদ্রে ঝাঁপ দেয়, তাতে কার কী? ‘নিজের চরকায় তেল দাও’—এই নীতি সমাজের সব ক্ষেত্রে, সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কেন হবে না? তাহলে নেশার বিরুদ্ধে, নেশাখোরদের বিরুদ্ধে সরকারের এত এত অভিযান কেন? মানুষ একটু নেশা করবে, একদল মানুষ নেশার উপকরণ উত্পাদন-বিপণন করবে, কিছু মানুষ ঝিমাবে, পরকালের পথে একটু একটু করে এগিয়ে যাবে, আর কিছু মানুষ অর্থ ও ক্ষমতার মালিক হবে—এতে রাষ্ট্রের আপত্তি থাকবে কেন? কারো ভালো লাগা ও পছন্দে বাগড়া দেওয়া কি রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে? তা যদি না হয়, তাহলে রাষ্ট্র কেন নেশার বিরুদ্ধে এত কঠোর?
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ভূমিকায় অনেকেই গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছেন। এই হতাশা ব্যক্ত করার কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এই চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের যুগে আমি কী খাব, কী বলব, কী পরব, কী পান করব—সেটা নিয়ে রাষ্ট্র মাথা ঘামাবে কেন? নারীবাদীরা যদি বলতে পারেন, ‘শরীর যার, সিদ্ধান্ত তার’ তাহলে অন্যরা কেন বলতে পারবে না, দেহ যার, সে কী খাবে আর কী পান করবে, সিদ্ধান্ত তার! মানুষের ব্যক্তিগত চৌহদ্দিতে রাষ্ট্র কেন মাথা ঘামাবে? নির্বাচনে যেমন ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’; খাওয়া-পরার ক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত নয় কি? আমার খাওয়া আমি খাব, যা খুশি তা-ই খাব!
মদ-গাঁজা-ভাং-ফেনসিডিল-ইয়াবা, কুত্তা-বিড়াল-সাপ-ব্যাং-টিকটিকির লেজ, কেরোসিন তেল, সাপের বিষ—যা খুশি তাই খাওয়ার স্বাধীনতাই যদি কারো না থাকে, তাহলে আর মুক্তিযুদ্ধ করে, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট পাঠিয়ে, লাভটা হলো কী? নেশা ছাড়া কি মানুষ বাঁচে? আর মাদকের নেশা ছাড়া অন্য কোনো নেশা জমে নাকি? তাহলে কেন মাদকের বিরুদ্ধে এত কথা, এত অভিযান?
তবুও নেশা নাহি মানে পরাভব। বিচিত্র্য সব নেশার উপাদান সমাজে বিস্তৃত হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে এখন ২৪ ধরনের মাদকের ব্যবহার রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফাইড স্পিরিট, ডিনেচার্ড স্পিরিট, তাড়ি, প্যাথেডিন, বুপ্রেনরফিন (টেমজেসিক ইঞ্জেকশন), ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড ওয়াশ (জাওয়া), বুপ্রেনরফিন (বনোজেসিক ইঞ্জেকশন), মরফিন, আইচ পিল, ভায়াগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট ও মিথাইল-ইথাইল কিটোন। এর বাইরে আরো নানা ধরনের মাদক রয়েছে।
তবে আমাদের এই শ্রেণিবিভাজিত সমাজে নেশাখোরদেরও স্পষ্ট দুটি শ্রেণি আছে। প্রথম শ্রেণিটি প্রচলিত নেশার জগতের (মদ, গাঁজা, ঘুমের ওষুধ, কাফ সিরাপ, চরস, হাসিস কিংবা হেরোইন)। দ্বিতীয় শ্রেণির উদ্ভব মাত্রই বছর দশেক বা তার একটু বেশি পুরোনো। এখানে ঢুকে পড়েছে গরিব, মধ্যবিত্ত ও বড়লোকের দূরত্ব। প্রচলিত নেশার সঙ্গে মিশে গেছে আর্থিক সম্পর্কের বিচারে গরিব-বড়লোকের দ্বন্দ্ব। তার সঙ্গেই যান্ত্রিক জীবন, প্রতিযোগিতা, বিদেশি নেশার প্রতি হাতছানি। তাতে বড়লোক সমাজে জাতে ওঠার ব্যাপার থাকে। অর্থাত্ নেশার জগতেও অদৃশ্য শ্রেণিবৈষম্য ও শ্রেণির জন্ম হয়েছে। দ্বিতীয় জগতের হাত ধরেই ঢুকে পড়েছে এলএসডি, এক্সট্যাসি, এমডিএমএ, মানালা চরস, ম্যাজিক মাশরুম ইত্যাদি। এখানেই শেষ নয়। চলে এসেছে নানা ধরনের ট্যাবলেট ও ইনজেকশন।
এক সময় গাঁজা ছিল আমাদের দেশের ‘গাঁও-গেরামে’ ঐতিহ্যে ভরপুর এক নেশার সামগ্রী। হোমিওপ্যাথি দোকানগুলোতে রীতিমতো ‘এখানে গাঁজা পাওয়া যায়’ এমন সাইনবোর্ড দিয়ে এই ধন্বন্তরি জিনিস বিক্রি করা হতো। সাহেবি আমলের শুরুতেও মুখ্যত ভবঘুরে, বৈরাগী এবং নিম্নবর্গের কৃষিজীবীরাই গাঁজার নেশা করতেন। পরে শহর তৈরি হলো, হাফ-আখড়াই, জেলেপাড়ার সং ও পক্ষীর দল শুরু করল গাঁজার নেশা। উল্লেখ্য, পক্ষী হওয়া মোটেই সহজ ছিল না। যে গেঁজেল টানা ১০৮ ছিলিম গাঁজা খেতে পারতেন, তাঁকে একটা ইট দেওয়া হতো। এভাবে পাওয়া ইট দিয়ে যিনি ঘর তুলতে পারতেন, তারই ‘পক্ষী’ খেতাব জুটত। নগরসভ্যতার আগে থেকে চলে আসা গাঁজাপ্রেম শহর-নগরগুলোতেও অটুট থাকে। সিপাহি বিদ্রোহের মাত্র দুই বছর পর ‘হুক্কাপুরাণ’ বইয়ে লেখা, ‘তামাকু হইল দেখ পৃথিবীর সার/ গাঁজা ভাঙ ধুতুরা তবে হৈল অবতার।’
অভিজ্ঞজনদের মতে, মদ, মারিজুয়ানা, ফেনসিডিল, হেরোইন, ইবাবা, এলএসডি— যে যা-ই বলুন, এর মধ্যে গঞ্জিকা হলো সাক্ষাত্ অমৃতের সন্তান! অমৃত নিয়ে সুর আর অসুরে কাড়াকাড়ি। অবশেষে দেবতাদের কাছে অমৃত এলো। শিব নিজের অঙ্গনিঃসৃত এক লতায় শোধন করে নিলেন অমৃত। অথর্ববেদ বলেছে, সেই পুণ্য উদ্ভিদই গাঁজাগাছ। মদ ও গাঁজা দুই পক্ষকেই আমরা কুর্নিশ জানিয়েছি। উনিশ শতকে সাহেবরাই প্রথম ‘আমরা-ওরা’ তৈরি করল। বলা হলো, বেশি গাঁজা খেলে লোকে পাগল হয়ে যায়, কিন্তু মদ উন্নততর নেশা। সেই ‘উন্নততর নেশা’ কিন্তু ব্রিটেনসহ ধনী দেশগুলো এখনো চালিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের দেশে প্রচলিত নেশার জগতে ‘সুখের ঘরে দুঃখের আগুন’ জ্বালাতে প্রথম আসে ভারতীয় ফেনসিডিল। এরপর প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে আসে ইয়াবা। যুবসমাজ আদর করে যার নাম দিয়েছে ‘বাবা’! এই ‘বাবা’ই শেষ পর্যন্ত আমাদের যুবসমাজের কাছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত নেশায় পরিণত হলো। সরকার অনেক ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ‘বাবা’সহ অন্য সব মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু মাদকের ব্যবহার তাতে কমছে না। সৃজনশীল নেশাগ্রস্তরা নিত্যনতুন নেশার সামগ্রী খুঁজে বের করছে। একদল সরবরাহকারীও ঠিকই বের হয়ে যাচ্ছে। করোনাকালেও নিত্যনতুন মাদক সরবরাহ চেইনে কোনো বিপত্তি সৃষ্টি হচ্ছে না।
মাদকের ব্যাপারে সরকারের কড়াকড়ি নীতির ফল তাহলে কী? এক নেশাখোরের মন্তব্য : যে জিনিস আগে সস্তায় এবং সহজে মিলত, এখন সেটা চড়ামূল্যে এবং কষ্ট করে কিনতে হচ্ছে!
n লেখক :রম্যরচয়িতা
