ঘরের ভিতর চৌকো ঘর, সেই ঘরেতে বন্দি কৈশোর। পৃথিবীতে জনসংখ্যা ও কংক্রিটের দালানকাঠা যত বৃদ্ধি হয়েছে, তারুণ্যের চারণভূমি ঠিক তার সমানুপাতিক হারে হ্রাস পেয়েছে। স্থান সংকোচনে ধীরে ধীরে ‘কৈশোর’ কোণঠাসা হয়ে দেওয়ালে এসে পিঠ ঠেকিয়েছে। পিঠ ঠেকিয়েও সে ক্ষান্ত হয়নি, সংকোচনের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পণ করেছে। এ যেন কৈশোর বিলুপ্তির বিশ্বযুদ্ধ, যেখানে প্রকৃতি প্রায় অসহায়। চার দেওয়ালে বন্দি কৈশোর এখন আত্মসমর্পণ করতে বসেছে চারকোনা স্ক্রিনে। বছর কয়েক আগে গ্রামের চিত্র শহর অপেক্ষা ভালো থাকলেও এখন আর খুব বেশি পার্থক্য নেই। উড়তে উড়তে, ঘুরতে ঘুরতে চারকোনা স্ক্রিন এখন শহর পেরিয়ে গ্রামে পৌঁছে গেছে। চারকোনা স্ক্রিন বলতে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের কথা বলছি। এখন শিশু-কিশোরদের সবচেয়ে বেশি সময় কাটে এই স্ক্রিনে। যে বয়সটাতে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠের নানান খেলাধুলা, হইহুল্লোড়, ঘোরাঘুরি, ছোটাছুটি, গল্প, উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশনের বই পড়ে মধুর সময় পার হওয়ার কথা, সেখানে তারা আজ বন্দি ঘরের ভেতরের ক্ষুদ্র ঘরে। তারা এখন ইন্টারনেটে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এমনভাবে অভ্যস্ত হয়েছে যে, স্মার্ট ডিভাইস ও ইন্টারনেটকে মৌলিক চাহিদায় পরিণত করে ফেলেছে।
পরিবারের সবার সঙ্গে এখন আর টিভি সেটের সামনে বসে নাটক, সিনেমা দেখা হয় না। ফেইসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকই তো সময় ফুরিয়ে দেয়। হারিয়ে যাচ্ছে বিকেলবেলার সেই আড্ডা। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটা ছবি ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু তরুণ খোলা মাঠে গাছের নিচে বসে আছে। প্রত্যেকেই ব্যস্ত যার যার হাতে থাকা স্মার্টফোনে। সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তিতে নষ্ট হচ্ছে তারুণ্যের মূল্যবান সময়। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সৃজনশীলতা। সহজে গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং ও অপরাধ চক্র। ক্রমশ ভঙ্গুর হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়।
কিশোর বয়সে আমরা টাকা জমিয়ে ক্রিকেট ব্যাট বা ফুটবল কেনা কিংবা বনভোজনের জন্য চাঁদা তুলতাম। আর এখনকার কিশোরেরা টাকা ঠিকই জমায়, কিন্তু সেটা খেলার সরঞ্জাম আর বনভোজনের কাজে ব্যবহার করে না। কত টাকায় কী পরিমাণ ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনতে পারবে, সেই হিসাব কষতে বসে। তারা যে খেলছে না এমনটা নয়। তারাও খেলে। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডি, লাটিম, ঘুড়ি, গোল্লাছুট, ডাঙ্গুলি নয়; তারা খেলছে ফ্রি-ফায়ার, পাবজি, ফোর্টনাইট, ভ্যালোরেন্ট ইত্যাদি প্রমত্ত ধরনের ভার্চুয়াল গেম। এর ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা কমবেশি জেনেছি। এটা এখন বিশ্বের অনেক দেশেই বড় সমস্যা তৈরি করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার নতুন একটি আইন করেছে, যাতে ১৬ বছরের কম বয়সিদের মধ্যরাত থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত অনলাইন গেমস খেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। জাপানে যারা গেম খেলে, তারা প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট সময়ের বেশি খেললে তাদের সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। চীনে টেনসেন্ট নামে বড় ইন্টারনেট কোম্পানি বাচ্চারা কত ঘণ্টা ইন্টারনেটে তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলো খেলবে, তার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত শিশু-কিশোরদের মানসিক গড়ন, চিন্তাকাঠামো, সৃজনশীলতার ক্ষেত্র তৈরি হয়ে ওঠে শৈশব-কৈশোরে। কিন্তু জীবন গঠনের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ সেই সময় যদি স্মার্ট ডিভাইসেই চলে যায়, তাহলে যে একটা বিকলাঙ্গ প্রজন্ম তৈরি হবে, সেটা অনেকটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলা যায়। বিশেষ করে কোভিডের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ছেলেমেয়েদের স্মার্ট ডিভাইস, ইন্টারনেট ও গেমে আসক্তি অকল্পনীয় মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। অতিরিক্ত স্মার্ট ডিভাইসের আসক্তির ফলে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে, যা নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীল ও দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার পথে বিরাট প্রতিবন্ধক। সুতরাং এই প্রজন্মকে নিয়ে অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট মহলকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। অন্যথায় আগামীর সব সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটতে পারে। গড়ে উঠতে পারে মেধাহীন এক প্রজন্ম।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুর
