সংকটে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য

আপডেট : ০২ জুন ২০২১, ২১:৩৩

করোনা ভাইরাস পুরো বিশ্বকে স্থবির করে রেখেছে। সুস্থ, স্বাভাবিক, প্রাঞ্জল পৃথিবীটাকে করে তুলেছে অসার, গতিহীন ও নিশ্চল। প্রতিদিন নতুন নতুন নাম মৃত্যুর খাতায় যোগ হওয়া এবং জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলা লাশের সংখ্যা হয়ে উঠেছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, যার প্রভাব পড়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক, চিকিত্সাক্ষেত্র, শিক্ষাব্যবস্থাসহ জনজীবনের প্রায় প্রতিটি সেক্টরে। অন্যান্য সেক্টর যদিও করোনা পরিস্থিতির তীব্রতা বিবেচনায় সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে মোটামুটি নিজেদের ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে, কিন্তু কোনো রকম পরিবর্তন হয়নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে বন্ধ হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে কয়েক দফায় ছুটি বাড়ানো আর অনধিকৃত কিছু অনলাইন ক্লাস ছাড়া কার্যকর শিক্ষার্থীবান্ধব কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি এখনো পর্যন্ত। তাই এই করোনা পরিস্থিতির মারাত্মক প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর।

একজন শিক্ষার্থী যখন স্কুল, কলেজের গণ্ডি অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে পা রাখে, স্বভাবতই তার কাছ থেকে পরিবারের প্রত্যাশা বেড়ে যায়। মা-বাবা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকে সন্তান শিগগির সংসারের হাল ধরবে বলে। অনেক ক্ষেত্রে স্নাতক পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা পরিবারের কাছে হাত পাতাকে অপছন্দ করেন। আবার অনেকেরই এই সময়ে পরিবারকে সাপোর্ট দিতে হয়।

ঠিক এমন একটা বয়সকালে যখন অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে, তখন শিক্ষার্থীদের বিকল্প কোনো পথ থাকে না। এই পরিস্থিতিতে কোনো কোনো শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা এতটাই বিপন্ন যে, তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, যার ফলাফল করোনা সংক্রমণে যেখানে ১২ হাজার ৬৬০ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে, সেখানে প্রায় ১৪ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে আত্মহত্যায়।

মহামারি করোনা ভাইরাসকে প্রথম দিকে হেলথ ক্রাইসিস বা স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে বেশি। বাধ্যতামূলকভাবে সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টির কারণে প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী এক বছর চার মাস ধরে ঘরবন্দি হয়ে আছে। দীর্ঘদিন বন্দিদশায় কাটানোর কারণে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী লকডাউনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার। ওয়ার্ল্ড ভিশনের আর এক জরিপে দেখা গেছে, ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী মানসিক চাপে রয়েছে, যেটা খুবই স্ট্রেসফুল।

ভাইরাসের দৌরাত্ম্য বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন দেশ জারি করেছে লকডাউন, শাটডাউন, কারফিউসহ বিভিন্ন সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টিকারী মাধ্যম। পরে করোনা পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে যুগোপযোগী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে লকডাউনের ক্ষতি উের নিয়েছে এই দেশসমূহ। এমনকি বিভিন্ন দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিয়েছে ইতিমধ্যে। ইউরোপের প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সরাসরি ক্লাস নিচ্ছে মে মাস থেকে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মানসিক ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে শিগগির সম্পূর্ণভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিভিন্ন দেশ।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশেও খুব শিগগির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া সমীচীন বলে মনে করছে শিক্ষার্থী ও অবিভাবকেরা। কেননা, জরিপ মোতাবেক ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণই করতে পারেনি। এই বছর করোনায় মৃত্যুর চেয়ে আত্মহত্যায় মৃত্যুবরণ করেছে প্রায় দ্বিগুণ শিক্ষার্থী, যার অধিকাংশই মানসিক হতাশার কারণে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের এই বিষয়ের প্রতি সুদৃষ্টি দিতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়