এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে আগামীর পথে বাংলাদেশ’। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তার বাজেট বক্তৃতার বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানুষের প্রসঙ্গটি এনেছেন। তবে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন, তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি রয়েছে। বাজেট বক্তৃতার শেষ অংশে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এ বছরও সব তথ্য-উপাত্ত পরিপূর্ণভাবে আমাদের সামনে নেই।’
উল্লেখ্য, করোনার এই সময়ে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি, কর্মসংস্থানের তথ্য, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পরিসংখ্যান তৈরি সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গতানুগতিক ধারায় চলছে। বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এ নিয়ে বিবিএসের সমালোচনা করলেও সঠিক তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি রয়েই গেছে।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় কোভিড-১৯ পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম বিস্তারিত তুলে ধরে উল্লেখ করেন, সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার ফলে দেশে ৫ কোটি ৮১ লাখ ৯৫ হাজার নাগরিক এবং ১ লাখ ৪ হাজার ৯৯৬টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি উপকৃত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, করোনার এই সময়ে দেশের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। সাধারণ মানুষের আয় কমে গেছে। কোভিডের কারণে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার কতটুকু ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান নেই।
বাজেট বক্তৃতার শুরুতে অর্থমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। সেই সঙ্গে শহিদ বঙ্গমাতাসহ ১৫ আগস্ট কালরাতের সব শহিদকে স্মরণ করেন। পাশাপাশি জেলখানায় নিহত জাতীয় চার নেতা, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে দেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন, যারা চরম ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সেই বীর সন্তানদের স্মরণ করেন। তিনি মুজিব জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের অর্থনীতির এগিয়ে যাওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন। মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এ বছর সরকারি আয়োজনে আমন্ত্রিত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেন অর্থমন্ত্রী। বাংলাদেশ নিয়ে তাদের প্রত্যাশার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, গত পাঁচ দশকে অনেক দিক থেকে বাংলাদেশ বদলে গেছে। কেবল বদলায়নি বঙ্গবন্ধুর চিরঞ্জীব আদর্শ এবং জাতির জীবনে সর্বক্ষেত্রে তার সজীব উপস্থিতি। তার নির্দেশিত পথেই এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। এ বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর দুই বলিষ্ঠ প্রবাহের মিলনমেলায় যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ। এর হাত ধরেই বিশ্বসভায় বাংলাদেশ স্থান পেয়েছে এক অনন্য উচ্চতায়।
বিগত ১২ বছর ধরে যে গতিতে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হয়েছে, তাতে দেশে উন্নয়নের একটা ধারাবাহিকতা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালের মার্চে কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারি আমাদের ওপর আঘাত হানে, যা অদ্যাবধি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর ঝুঁকি তৈরি এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে। ফলে আমাদের এখন স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধের মাধ্যমে কোভিড-১৯-এর মোকাবিলা করে যেতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সুদৃঢ় ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব জীবন ও জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে আমরা দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় বাজেটে সাধারণত আমরা সুসংহতভাবে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন কর্ম পরিকল্পনার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার উন্নয়ন রূপরেখা প্রণয়ন করে থাকি। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এ বছর সব তথ্য-উপাত্ত পরিপূর্ণভাবে আমাদের সামনে নেই। প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে কোভিড-১৯-এর প্রাথমিক অভিঘাত মোকাবিলা করে বাংলাদেশ যখন অন্যান্য দেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে অর্থনৈতিক উত্তরণের পথে এগিয়ে চলছিল, তখনই সারা বিশ্বে দ্বিতীয়, কোথাও কোথাও তৃতীয় অভিঘাত শুরু হয়, যার প্রভাব সর্বত্রই প্রবল। তাই আমাদের এবারের বাজেটেও দেশ ও জাতির উন্নয়নের পাশাপাশি প্রাধিকার পাচ্ছে দেশের পিছিয়ে পড়া মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও তাদের জীবন-জীবিকা।’
