সরকারের উন্নয়ন ও অবকাঠামো-সংক্রান্ত কাজের নিম্নমান লইয়া শত শত খবর প্রতি বত্সর ছাপা হয়। মতলজবাজরা দোষ দেয় বিটুমিনের, ইট-বালি-সুরকি প্রভৃতি উপকরণের মানের। এমনকি যেই ঠিকাদার কাজটি পাইয়াছেন, তিনি অন্য কাহারো নিকট কাজটি বিক্রয় করিয়া দিয়াছেন বলিয়া কাজটির মান খারাপ হইবার অজুহাতও শুনা যায়। আর সকল কিছুর ঊর্ধ্বে যাহারা তদারকির দায়িত্বে ছিলেন—তাহারা যেন ধোয়া তুলসীর পাতা! ইহা এমন যে, এক ব্যক্তি আরেক জনকে থাপ্পড় মারিবার পর বলিল—‘আমার কোনো দোষ নাই; আমার হাত থাপ্পড় মারিয়াছে, আমি তো মারি নাই!’
ইহা ঠিক যে, কোনো ঠিকাদার একই সময়ে একাধিক কাজ পাইলে অনেক সময় কাজ বিক্রি করিয়া দেন। ইহাতে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ হয়; কাজের গুণমানও সঠিক না থাকিবার দৃষ্টান্ত দেখা যায়। সেই ঠিকাদার তো নিজে কাজ করিতেছেন না। লাভের গুড় পিঁপড়াদের মধ্যে ভাগ হইয়া যাইতেছে। সুতরাং কাজ একাধিক হাত ঘুরিলে কাজের মান থাকিবে কী করিয়া? কেমন করিয়া নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ হইবে? তবে কোনো ঠিকাদার তাহার কাজটি বিভিন্ন হাতে বিক্রয় করিলেই কাজটি খারাপ হইবার পুরোপুরি দায় তৈরি হয় না। কারণ, কাজটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী ও সময়মতো শেষ করা হইল কি না—তাহা দেখভাল করিবার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারেরা রহিয়াছেন। এমন নহে যে, এই তদারকি করা হয় ঢাকা হইতে। প্রতিটি জেলায় সংশ্লিষ্ট উন্নয়নকাজের কর্মকর্তারা রহিয়াছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত অফিসার রহিয়াছেন। এসও, এসডি, এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, চিফ ইঞ্জিনিয়ার—এত স্তরের কর্মকর্তারা কী করিয়াছেন? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাহাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিলে কোনো একটি উন্নয়নকাজও নির্দিষ্ট নিয়মের বাহিরে হইবার সুযোগ নাই। কারণ নির্মাণকাজের সকল উপকরণের মানের ও আকারের স্পেসিফিকেশন রহিয়াছে—তাহা বিটুমিন হউক কিংবা ইট, বালু সুরকি—যাহাই হউক না কেন! নির্দিষ্ট মানের বাহিরে নিম্নমানের উপকরণ দিয়া নির্মাণকাজ করিবার সুযোগ নাই। সুতরাং কাজটি বেচাকিনা হইলেও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তারা বুঝিয়া লইবেন—ইহাই তাহাদের দায়িত্ব। কিন্তু তাহারা কি এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করিয়া থাকেন? এই দায়িত্ব পালন করিলে কয়েক দিন পরই কেমন করিয়া নূতন নির্মিত রাস্তার আস্তরণ উঠিয়া যাইবে? তাহারা কি নিজের বাপের অর্থ খরচ করিয়া রাস্তা বানাইতেছেন যে, এইভাবে অর্থ অপচয় করিবেন? যখন নির্দিষ্ট ঠিকাদার তাহার কাজটি অন্য কাহারো নিকট বিক্রয় করিয়া দিল, তখন কেন সেই কাজ বন্ধ করিয়া দেওয়া হয় নাই? দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মিনমিন করিবেন কেন? তাহাদের দুর্বলতা কোথায়? মিনমিন তো চোরেরা করে। অফিসাররা এই ক্ষেত্রে যদি বলিতে চাহেন যে, সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য তাহারা অত্র এলাকার সাংসদ কিংবা চেয়ারম্যানদের কথা শুনিয়া ঐ অনিয়মকে মান্যতা দিয়াছেন, তখন ঐ জনপ্রতিনিধিদেরও কৈফিয়তের কাঠগড়ায় দাঁড় করাইতে হইবে বটে।
দিন এইভাবে চলিতে পারে না। সময় এইরকম থাকিবে না, থাকিতে পারে না। যাহারা জনগণের টাকা এইভাবে নষ্ট করিতেছেন, তাহাদের মনে রাখিতে হইবে, অনিয়ম করিয়া অর্জিত এই টাকা দল পুষিবার জন্য নহে, এই টাকা নিজের গুটিকয়েক গোষ্ঠীশ্রেণির মানুষের জন্যও নহে। এই টাকা জনগণের। যেহেতু ইহা জনগণের টাকা, ৩০ লক্ষ শহিদ আর দুই লক্ষ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশটির মানুষের টাকা—সুতরাং এই টাকা এইভাবে নষ্ট করিবার অধিকার কাহারো নাই। কোনো নষ্ট গোষ্ঠীর নিকট এই দেশ জিম্মি হইয়া থাকিতে পারে না। সরকারি চেয়ার-টেবিল পাইয়া স্বীয় দায়িত্ব শিকায় তুলিয়া যাহারা এই ভয়ংকর অন্যায় করিতেছে, তাহাদের প্রতিটি দুর্নীতি-অনিয়মের হিসাব একদিন পাই-টু-পাই দিতে হইবে। কোনো মাফ নাই। শতবর্ষপূর্বে জন্ম নেওয়া কবি মোহিনী চৌধুরী লিখিয়াছিলেন—মানবের তরে মাটির পৃথিবী, দানবের তরে নহে। কিন্তু এই লুটেরা আর দুর্নীতিবাজদের লোভের লম্বা জিহ্বা এবং দেশপ্রেমহীনতা নগ্ন প্রতিচ্ছবি দেখিলে সেই কবি অতীব দুঃখে তাহার পঙিক্ত নিশ্চয়ই উলটাইয়া দিতেন! তিনি তখন বলিতে বাধ্য হইতেন—এই পৃথিবী তো দানবেরই তরে, মানবের তরে নহে! কিন্তু দানবদের মনে রাখিতে হইবে, ৩০ লক্ষ শহিদের অমূল্য রক্ত কোনোভাবেই বৃথা যাইবে না, কিছুতেই বৃথা যাইতে পারে না।
