বেলাল চৌধুরী। কি ঢাকা, কি কলকাতা, দুই বঙ্গের সাহিত্যসেতু রচনা করে গেছেন জীবনভর। অদ্ভুত জীবন, পরোপকারেই কেটে গেল তার সবটা। এরকম আড্ডাবাজ, নিঃস্বার্থ, পরোপকারী, হাস্যমুখ আর সাহিত্যগত প্রাণ খুব অল্পই দেখা যায়।
রক্তে ছিল বোহেমিয়ানা, ‘পথের পাঁচালী’র অপু যেন। তবে অপু পারেনি, বেলালদা পেরেছিলেন তারুণ্যেই জাহাজে উঠে সমুদ্র পাড়ি দিতে। তারপর এই নোয়াখাইল্যা মানুষটি সহসা কলকাতায়। এলেন, দেখলেন, জয় করলেন। পাঁচ-ছয় বছর আর ফিরে যাওয়া নেই। ‘কৃত্তিবাস’লগ্ন হয়ে গেলেন তিনি, সুনীল-শক্তি-দিলীপ গুপ্ত-কমলকুমার মজুমদারদের অন্তরঙ্গ সহচর। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যখন আইওয়ায়, তখন কৃত্তিবাস সামলেছেন বেলালদা। আর কলকাতার আমেরিকান দূতাবাসের সূত্রে ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে লাগলেন একের পর এক বই। ‘কৃত্তিবাস’-কুলের সবাই অনুবাদে আগ্রহী ও পড়ছিলেন, এটা কৌতূহলের বিষয়। পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক দীপক মজুমদার গ্রিক ভাষা জানার সূত্রে অনুবাদ করেছিলেন সে সময়কার নোবেলপ্রাপ্ত কবি জর্জ সেফেরিসের কবিতা। অনুবাদ করেন লেসবিয়ান কবি স্যাফোর কবিতা।
বেলালদার লেখা পড়েছি, তাকে নিয়ে সত্যমিথ্যে বানানো গল্প শুনেছি অনেক, কিন্তু তার সঙ্গে মুখোমুখি পরিচয় হলো ১৯৮৫-তে ঢাকায়। সে সময় তিনি ভারতীয় হাইকমিশন থেকে প্রকাশিত ‘ভারত বিচিত্রা’ পত্রিকার সম্পাদক। তখন এর দপ্তর ছিল ধানমন্ডিতে। একদিন গেলাম আলাপ করতে। কলকাতা থেকে এসেছি শুনে তো তিনি আনন্দে আপ্লুত। বললেন, পরদিন শো আছে। নির্মলেন্দু গুণের কাহিনি ‘হুলিয়া’ অবলম্বনে তানভীর মোকাম্মেলের ছবি। ঠিক সময়ে তার অফিসে চলে আসতে, নিয়ে যাবেন তিনি।
বেলালদাকে ওখানে দেখলাম শাহানশাহ। সিনেমা দেখতে এসেছেন, এমন সব নারী-পুরুষ তাকে উইশ না করে হলে ঢুকছেন না। বুঝলাম, ঢাকা শহরে তুমুল জনপ্রিয় তিনি। মানুষের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়ার বিরল ক্ষমতা আছে তার, দিনে দিনে তা আরো স্পষ্ট করে বুঝেছি।
প্রায়ই অবসরমতো তার অফিসে চলে যেতাম। তার ঘরে সব সময়েই মানুষজনের ভিড় লেগে থাকত। তার মাধ্যমেই আলাপ হলো ষাটের দশকের কবিদের সঙ্গে—রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, রবিউল হোসাইন।
বুড়িগঙ্গায় নৌকোয় বসে ভোজ হয়। নানা স্বাদের মাছ, অসামান্য রান্না। একদিন সেখান থেকে খাইয়ে আনলেন। দৈনিক বাংলা অফিসে নিয়ে গেলেন কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে পরিচয় করাতে। ওখানে তখন ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন তিনি। তখনো অতিখ্যাত না হলেও ‘শঙ্খনীল কারাগার’ আর ‘নন্দিত নরক’-এর জন্য খ্যাত হয়েছেন তখন। আবার অন্যদিন বেলালদা নিয়ে গেলেন ‘ইত্তেফাক’ অফিসে নির্মলেন্দু গুণের কাছে। ‘রোববার’-এর দপ্তরে রফিক আজাদ সমীপে। মোট কথা আমাকে নিয়ে কর্মধারার অন্ত ছিল না তার।
ভারতীয় টাকা পালটে বাংলাদেশি টাকায় পরিণত করতে হবে, মুহূর্তে সমাধান করে দিলেন বেলালদা। ভিসা বাড়াতে হবে, বেলালদা আছেন কী করতে? সেজন্য ছবি লাগবে, তা কোনো সমস্যা? মনে রাখতে হবে, মোবাইল ফোনের যুগ তখন দূর অস্ত, ডিজিটাল ক্যামেরার নাম শোনেনি কেউ। পুরান ঢাকায় নিয়ে গিয়ে আদিম পদ্ধতিতে ছবি তুলিয়ে আনলেন।
আমার ওপর বেলালদার অতিরিক্ত দুর্বলতার একটি কারণ ছিল। কৃত্তিবাসের অন্যতম কবি দেবারতি মিত্রের বোন আমার স্ত্রী। খুব অল্প বয়সেই দেবারতিদি কৃত্তিবাস পুরস্কার পান। বেলালদা আমাকে বলেছিলেন, দোবারতিদির প্রাইভেট টিউটর সদ্য বিএ পাঠরতা দেবারতির কবিতার খাতা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে নিয়ে গিয়ে পড়তে দেন। বেলালদা ছিলেন সে সময়। মাস্টারমশাই চলে যেতে তাচ্ছিল্য আর পরিহাস নিয়ে কবিতা পড়তে গিয়ে বিস্মিত হয়ে যান সুনীল এবং অচিরেই কৃত্তিবাসে স্থান পান দেবারতি। কৃত্তিবাস গোষ্ঠীতে মহিলা কবি খুব বেশি ছিলেন না। শরত্ কুমার মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী বিজয়া, কবিতা সিংহ এবং দেবারতি মিত্র। বয়সে দেবারতি এদের চেয়ে কমবেশি এক দশকের ছোট।
তবে আমার প্রতিই তো নন কেবল তিনি, প্রসন্ন তো দেখেছি সকলের প্রতি, তা সে নাসির আহমেদের মতো কবিই হোন, নান্টু রায়ের মতো তরুণ তুর্কি, মধুমিতা চক্রবর্তীর মতো কলেজ অধ্যক্ষা অথবা যে কোনো সদ্য কবিতা লিখছে এমন কেউ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার আত্মজীবনী ‘অর্ধেক জীবন’-এ বেলালদার মেজাজটা যথার্থ ধরেছেন।
বেলালদার কলকাতাবাসের পরে ‘সুবর্ণরেখা’ প্রকাশনার মালিক ইন্দ্রনাথ মজুমদারের সঙ্গে সখ্য ছিল তার। ইন্দ্রনাথ ছিলেন পুরোনো বইয়ের কারবারি। কাছাকাছি মুলুক থেকে তিনি পুরোনো বই সংগ্রহ করতেন। কখনো মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া, জলপাইগুড়ি। বেলালদা সঙ্গে থাকতেন। বই সংগ্রহও যে কত রোমহর্ষক হতে পারে, বেলালদার মুখে তার গল্প শুনেছি। আর বই সংগ্রহের অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা গল্পও আছে। বেলালদার উল্লেখযোগ্য দিক এটা।
সুনীলদার মৃত্যুর খবর শুনে দুদিন পরেই ঢাকা থেকে চলে এসেছিলেন তিনি। সুনীলদার ছেলে আমেরিকা থেকে আসতে দেরি হওয়ায় দিনতিনেক পরে শেষকৃত্য হয় তার। বেলালদা উদ্ভ্রান্তের মতো কালীঘাট শ্মশানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, হাতে ঢাকা থেকে প্রকাশিত গতদিনের প্রায় সব বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা। দেখা হতেই বললেন, আমার কাছে কলকাতা শূন্য এখন থেকে। সত্যিই তাই। সুনীলদার মৃত্যুর পর কলকাতায় তিনি খুব কম আসতেন। সেদিন ইলেকট্রিক চুল্লিতে দাহ হচ্ছে সুনীলদার। অন্যদিকে নবনীতা দেবসেন আর বেলালদার কাছে শুনে চলেছি সুনীলদাকে নিয়ে তাদের স্মৃতিচারণ। তারপর তো তারা দুজনও চলে গেলেন!
n লেখক : ভারতীয় লেখক
