মোরশেদা ইয়াসমিন পিউ
করোনা মহামারির মধ্যে আরেকটি বাজেট উপস্থাপন হলো। আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ১ লাখ ৭ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু করোনা মহামারিতে নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়া মানুষদের বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। মহামারির আগে দেশের দারিদ্র্যের হারের হিসাবটি উল্লেখ করেই অর্থমন্ত্রী তার বাজেট উপস্থাপন করেছেন। ২০১৯ সালের হিসাবে দেশে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ দারিদ্র্যের হিসাব উল্লেখ করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। কিন্তু করোনার কারণে আয় হারিয়ে যে মানুষগুলো নতুন করে দরিদ্র হয়েছে সে হিসাব উঠে আসেনি।
সরকারিভাবে হিসাব না করা হলেও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দাবি করোনার কারণে নতুন করে আরো ২০ শতাংশ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক যৌথ সমীক্ষায় সম্প্রতি বলা হয়েছে, করোনার প্রভাবে দেশে নতুন করে ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়েছে। অবশ্য অনেকেই বলছেন নতুন দারিদ্র্যের এই হার সাময়িক। কিন্তু করোনার প্রভাব যত দীর্ঘায়িত হবে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও তত স্থায়ী হবে।
যাদের নিম্ন-মধ্যবিত্ত বলা হয়, তাদের বেশির ভাগ করোনা মহামারিতে চাকরি অথবা কাজ হারিয়ে, বেতন কমে দরিদ্র অবস্থানে এসে পড়েছেন। তাদের কারো কাছে চেয়ে কিংবা হাত পেতে নেওয়ার অভ্যেস নেই। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে অনেকে পরিবারের অন্য সদস্যদের গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন, কেউ বা ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছেন, কিংবা পরিবারের সবাই মিলে কাজে নেমেছেন। পাশাপাশি সন্তানের স্কুল বন্ধ হয়েছে, পুষ্টিকর কিংবা ভালো খাবারে টান পড়েছে। চাকরি হারা, বেতন কমে যাওয়া, সঞ্চয় ভেঙে খাওয়া, সেসব শহুরে নিম্ন আয়ের মানুষদের কয়েক জনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।
মাহবুবা আক্তার ও রাসেল আহমেদ দম্পতির পাঁচ সদস্যের পরিবার। থাকেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। মাহবুবা আক্তার বলেন, ‘করোনাকালে আমার হাসব্যান্ডের চাকরি চলে গেছে। এখন সঞ্চয় ভেঙে খেতে হচ্ছে। গত এক বছরে কোথাও চাকরি হয়নি তার। এখন বাধ্য হয়ে সঞ্চয় ভেঙে ছোটখাটো ব্যবসা করার চেষ্টা করছেন। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ, কিন্তু বেতন প্রতিমাসে ঠিকই দিতে হচ্ছে। স্কুলের বেতন কিন্তু কমেনি। এছাড়া বাসাভাড়া কমেনি। এ অবস্থা চলতে থাকলে হয়তো গ্রামে চলে যেতে হবে। অথবা সন্তানদের স্কুল বন্ধ করে দিতে হবে। এ বাজেট ধনীদের জন্য আমাদের জন্য নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের কথা মাথায় রেখে বাজেট হলে বাড়িভাড়া কমত, স্কুলের বেতন মওকুফ হতো, নিত্যপণ্যের দাম কমত।’
শ্যামলী-৩ নম্বর সড়কের সিকিউরিটি গার্ড হায়দার আলী বলেন, ‘আগে খাবার খরচ রেখে বাকি টাকা গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতাম। সেখানে মা-বাবা ও এক সন্তান আছে। যা টাকা পাঠাতাম, তা দিয়ে সংসার মোটামুটি চলত। ছেলের স্কুলের খরচ চলত। কিন্তু এখন আমার খাবার খরচ বাবদ টাকা বেশি লাগে। যে কারণে বাড়িতে কম টাকা পাঠাতে পারি। আর যে টাকা গ্রামে পরিবারের কাছে পাঠাই, তা দিয়েও তাদের চলে না। কারণ গ্রামেও সবকিছুর দাম বেড়েছে। ছেলের স্কুলে বেতন না দেওয়ার কারণে নাম কাটা গেছে, আবার স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাতে পারব কি-না জানি না। আমার বেতন আগের চেয়ে করোনাকালে ২ হাজার টাকা কমেছে।’
একজন মুদি দোকানদার আজহার মিয়া বলেন, ‘সামান্য আলু, চাল, পেঁয়াজের দামই বেশি। যা খেয়ে গরিব বাঁচে, তারা সেসব কিনতে পারছে না।’ এই দোকানি বলেন, ‘আমার দোকানের বিস্কুট, চিপস, চানাচুর যেভাবে কাস্টমার কিনত, এখন সেভাবে তা বিক্রি হয় না। যে পরিবারটি একবারে ১০ কেজি চাল কিনত, তারা এখন পাঁচ কেজি করে কেনে। কম দামের চালগুলো কেনে।’ এই দোকানি আরো বলেন, ‘আমি নিজেও বাসাভাড়া দোকান ভাড়া দিয়ে চলি। এখন কোনো মাসে এই টাকা দোকান থেকে আসে, কখনো আসে না। বাজারে আম-লিচু উঠেছে, কিন্তু সন্তানদের কিনে খাওয়াতে পারি না। আমাদের জন্য বাজেটে কী থাকে? সেটা আমরা জানি না।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এ সরকার বড় লোকের, তারা বাজেট নিয়ে ভাবুক।’
সিঙ্গেল মাদার রিয়া আফরোজ বলেন, ‘করোনাকালে আমার সিক্সে পড়ুয়া মেয়ের স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ আমি কুলিয়ে উঠতে পারছি না। ঘরভাড়া বেশি, খাওয়া খরচ বেশি। এরমধ্যে বার বার চাকরি চলে যায়। জমানো টাকা ভেঙে চলছি। আমাদের জন্য সরকারের কোনো বরাদ্দ নাই। তাহলে এই বাজেট দিয়ে আমাদের কী হবে! আমরা জানি, কাজ করলে খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারব, আর কাজ না থাকলে না খেয়ে মরতে হবে।’
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকার প্রতি বছর বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে চলছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যে বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে তা মোট বাজেটের ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং জিডিপির ৩ দশমিক ১১ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের যে বরাদ্দ হয়েছে সেখানে সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন, সঞ্চয়পত্রে সুদ এসব মিলিয়ে হিসাব করা হচ্ছে। জিডিপির অঙ্কে যে বরাদ্দ সেটির বড় অংশ সমাজের তুলনামূলক এগিয়ে থাকা মানুষের কল্যাণে যাচ্ছে। ফলে দরিদ্র ও অতিদরিদ্র মানুষের জন্য সরাসরি সহায়তা দেওয়ার দাবি তাদের।
