বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতেই ব্যবসায়ীদের করছাড়

আপডেট : ০৪ জুন ২০২১, ২২:১৪

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ব্যবসায়ীরাই দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এ জন্য ব্যবসায়ীদের করছাড়সহ বাজেটে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়বে। বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়বে। বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। প্রথা অনুযায়ী, বাজেট উপস্থাপনের পর দিন এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় গতকাল শুক্রবার বিকালে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

এ সময় অর্থমন্ত্রী ছাড়াও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, অর্থ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবির, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ২০২১-২২ প্রস্তাবিত বাজেটে করের হার কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব আদায় বাড়বে। সরকারের লক্ষ্য শুধু কর আদায় করাই নয়। বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানও বাড়াতে হবে। আমরা যদি কর প্রদান সহজ করতে পারি, করদাতাদের আরো সম্পৃক্ত করতে পারি, তাহলে রাজস্ব আদায় অনেক বাড়বে। উন্নত দেশের কর কাঠামোর মতো দেশের কর কাঠামো আরো সহজ করা হবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এক সময় আমেরিকাতেও ৭৫ শতাংশ কর দিতে হতো, সেটা এখন নেই। আমরা মনে করি, যদি আমরা করহার আস্তে আস্তে কমাই, তাহলে আমাদের             

আদায়ের পরিমাণও বাড়বে।

করহার স্থির করে দেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক সময় মানুষের চাহিদার পরিবর্তন হয়। চাহিদা পূরণে ব্যবসায়ীদেরও পরিবর্তন আসে। তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্যও পরিবর্তন আসে। সুতরাং এটা কখনো ফিক্সড রাখা যাবে না। আমাদের পরিস্থিতি কী, বিশ্ব পরিস্থিতি কী করছে সেটি দেখতে হবে। উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার করোনা মহামারির প্রকোপের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের তৃতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ শিরোনামে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন তিনি।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় কম হয়েছে বলে যে সমালোচনা হচ্ছে তা সঠিক নয় উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, স্বাস্থ্য সরকারের অগ্রাধিকার খাত। এই খাতে যত টাকা প্রয়োজন হবে, ততই পাওয়া যাবে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ নিয়ে সন্তুষ্টি জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, এই খাতে দেশীয় উত্পাদনকে উত্সাহিত করতে কর সুবিধা প্রদান কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় সরকারের অগ্রাধিকারমূলক অবস্থানের প্রতিফলন। ক্রমান্বয়ে কৃষি খাত দেশের বড় একটি রপ্তানি খাতে পরিণত হবে বলেও আশাবাদ জানান তিনি। মাংস আমদানিতে শুল্ক আরোপ বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশীয় উত্পাদনকে উত্সাহিত করছে সরকার। কৃষিকাজে ব্যবহূত যে কোনো কাঁচামাল আমদানিতে কর কমানো হয়েছে। অর্থাত্ যারা এখানে কৃষি উত্পাদন করবেন, তাদের প্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানো হয়েছে, যারা সরাসরি আমদানি করতে চায়, তাদের জন্য বাড়ানো হয়েছে। আমরা এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছাতে চাই যে, ভবিষ্যতে বিদেশ থেকে আর মাংস আমদানি করতে হবে না। তাছাড়া সরকারের নীতি হলো ক্রমান্বয়ে আমদানি বন্ধ করে ধীরে ধীরে বিদেশে রফতানি করা। শুধু তৈরি পোশাক না, কৃষি হবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় একটি খাত।

এক প্রশ্নের জবাবে অর্থ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, বাজেট সম্প্রসারণমূলক করা হয়েছে। এ জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর মাধ্যমেও কর্মসংস্থান বাড়বে। তাছাড়া করপোরেট কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগের উদ্দেশ্যেই এই ছাড় দেওয়া হয়েছে। যদি করোনা পরিস্থিতি দ্রুত ভালো হয় সেক্ষেত্রে পাঁচ মাস লাগবে না, তার আগেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেতে শুরু করবে বলে তিনি মনে করেন। প্রণোদনা বাস্তবায়ন কতদিন চলবে—এমন প্রশ্নের জবাবে রউফ তালুকদার বলেন, সরকার যে ২৩টি প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সেগুলোর বাস্তবায়ন চলবে। যতদিন প্রয়োজন ততদিন চলবে। ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ছয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ৯০ হাজার কোটি টাকার যে ঋণ কার্যক্রম চলছে সেখানে বছরে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লাগবে সুদ ভর্তুকিতে। এটাও বাজেটের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। টিকা ক্রয়ে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হলে সেটি দেওয়া হবে। আগামী অর্থবছরের শুরুতে দেশের সব হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ঘাটতি নিরূপণ করে সেই অনুসারে সরঞ্জাম কেনা হবে।

রিজার্ভ থেকে ধার দেওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০১৯ সালে বলেছিলাম আমরা ঋণ নেব না, একসময় দেব। এখন সে অবস্থা চলে এসেছে। আমাদের যে অবস্থান সেটি শুধু এশিয়া মহাদেশে নয়, সারা বিশ্বে আলোচনার বিষয়। আমাদের জিডিপির তুলনায় বৈদেশিক ঋণ এখনো ৪০ শতাংশের নিচে। চীনে এই হার ১০০ শতংশের কাছাকাছি। ২০১৯ সালের ৩০ জুন আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এখন রিজার্ভের আকার দাঁড়িয়েছে ৪৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ আমাদের সক্ষমতা আছে। আমাদের এখন ঋণ দেওয়ার সময় এসে গেছে, আমরা সেই সময়ের খুব কাছাকাছি আছি।

বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় চাপ হবে না আশা প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ভারতেও কিন্তু বাজেটের ঘাটতি জিডিপির ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির আকার ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। আমরা আশাবাদী, মানুষের জীবন ও জীবিকা যদি আমরা রক্ষা করতে পারি, আমরা সঠিকভাবে আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারি, আমরা নিশ্চয় সফল হব। আমরা এই বাজেটের ঘাটতি মোকাবিলা করতে পারব, ধীরে ধীরে বাজেট ঘাটতিও কমিয়ে আনব।

বাজেট বক্তব্যে বলা হয়েছে, প্রতি মাসে ২৫ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। এভাবে ভ্যাক্সিন দিলে চার বছর সময় লাগবে, এ রকম প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রী বলেন, শুরুর দিকে মাইকিং করেও টিকা দেওয়ার লোক পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে পর্যায়ক্রমে সবাইকেই ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

কালোটাকা সাদা করার সুযোগের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এটা কালোটাকা নয়, অপ্রদর্শিত আয়। আমি এর আগে কালোটাকার বিষয়ে বলিনি, অপ্রদর্শিত আয়ের কথা বলেছি। কালোটাকা হলো—অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ। আর অপ্রদর্শিত আয় হলো—যেটা প্রদর্শন করা হয় না। আমাদের সিস্টেমের কারণে অপ্রদর্শিত আয় হয়। এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের অভিমত রয়েছে। কেউ বলছেন, এ সুযোগ থাকা উচিত নয়, আবার কেউ বলছেন এটির পক্ষে সুযোগ রাখা উচিত। তাই এ মুহূর্তে কিছু বলছি না। আরো কিছু দিন পর ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত দেব।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, যারা বেশি আয় করবে তারা বেশি কর দেবে, অথচ এটা উলটো হওয়ার কথা। যারা বেশি আয় করে বেশি ট্যাক্স দেবে, এটা হওয়া উচিত না। এজন্য বাজেট সার্বজনীন করার চেষ্টা করেছি। বাজেটে বৈদেশিক ঋণের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, আমরা বিদেশিদের কাছে ধার নিলেও নিয়মিতভাবে পরিশোধ করছি। ঋণ পরিশোধের রেকর্ডও আমাদের ভালো।

ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বর্তমানে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ কোটি টাকার বেশি। বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ৭৬ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হলেও ব্যাংক খাতে এর প্রভাব পড়বে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।