বাজেটে জীবন-জীবিকার স্বচ্ছ রূপরেখা নেই

আপডেট : ০৪ জুন ২০২১, ২২:২৯

প্রস্তাবিত বাজেটে যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। অধিকাংশ সূচক অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। অর্থমন্ত্রণালয় যে পরিসংখ্যান ব্যবহার করছে, সেগুলো সিরিয়াসলি তৈরি করা হয়নি। বাজেট বক্তৃতায় করোনার কথা বলা হলেও বরাদ্দের দিক থেকে বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। করোনার ভ্যাকসিন কেনায় এবারের বাজেটে কত টাকা দেওয়া হয়েছে, সেটিও অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় নেই। বিভিন্নখাতে কর ছাড়ের কথা বলা হয়েছে, এটি ইতিবাচক। কিন্তু কীভাবে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হবে, তা বলা হয়নি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর কথা বলা হলেও সুস্পষ্ট কোনো নিদের্শনা নেই। বাজেটে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও ব্যয়ের সক্ষমতা ও গুনগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। ফলে এই বাজেট বাস্তবায়ন করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। বেসরকারি গবেষনা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যায়নে এসব কথা বলা হয়। শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই মূল্যায়ন প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর  রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। এবারের বাজেটের শিরোনাম ছিল ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ।’ অথচ বাজেট পেশের পরদিনই সিপিডি জানাল, প্রস্তাবিত বাজেটে জীবন-জীবিকার স্বচ্ছ কোনো রূপরেখা নেই।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, এবারের বাজেটে সামষ্টিক অর্থনীতির অধিকাংশ সূচকে, যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার চেয়ে বেশি। এর মধ্যে জিডিপির অনুপাতে ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অষ্টম বার্ষিকী পরিকল্পনায় ২০২২ সালে এই লক্ষ্যমাত্রা ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ। অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে লক্ষ্য ধরা হয়েছে, তা পরিস্কার নয়। এ ব্যাপারে সরকারি সংস্থা বিবিএসের কাছে তথ্য চাইলেও পাওয়া যায় না। এছাড়া বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রবৃদ্ধির যে পুর্বাভাস প্রকাশ করেছে, এটি তার চেয়ে অনেক বেশি। অপরদিকে বর্তমানে রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধি রয়েছে। কিন্তু নতুন করে মানুষ বিদেশ যাচ্ছে না। ফলে আগামীতে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ধরা রাখা নিয়ে সংশয় রয়েছে। করোনা মোকাবিলায় প্রণোদনার কথা বলা হলেও তার ৮০ ভাগই ঋণ নির্ভর।

কালো টাকা সাদা করার বিষয়ে সিপিডির পর্যালোচনায় বলা হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে ঢালাওভাবে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ না দেয়া হলেও কয়েকটি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ থাকার বিষয়টি বৈষম্য তৈরি করবে।

তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, অর্থমন্ত্রনালয়ের ডকুমেন্টে জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, এটি তাদের অনুমান বা চিন্তা। এর সঙ্গে পরিসংখ্যান ব্যুরোর কোনো সম্পর্ক নেই। আর এই পরিসংখ্যানের বিষয়টিকে মন্ত্রণালয় সিরিয়াসলি নেয়নি। তিনি আরো বলেন, আমরা রাজস্ব আয় নিয়ে, যত বেশি চিন্তিত, তার চেয়ে বেশি চিন্তিত সরকারি ব্যয় নিয়ে। লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে সরকারি ব্যয় করা যাবে কিনা, আর ব্যয় করতে পারলেও তার গুনমান ঠিক থাকবে কিনা সেটি দুঃচিন্তার কারণ। এখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, স্বচ্ছতা, জবাবহিদিতা এবং দুর্নীতিমুক্ত ব্যয়ের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটের অনুমিতি দুর্বল। কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়েই বাজেট তৈরি করা হয়েছে। সংশোধিত বাজেটের ওপর রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি ধরে বাজেট তৈরি করা হয়েছে, বাস্তবে সে লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়বে। তিনি বলেন, আগেই থেকেই দেশে আয় বৈষম্য ছিল। কিন্তু করোনায় সেটি আরও ঘনীভুত হয়েছে।

ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের কৃষিখাতে বিভিন্ন কর কমানো হয়েছে। এটি ইতিবাচক। তবে কৃষকের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি। করোনা পরিস্থিতিতে অর্থ ছাড় ও ব্যয় আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল।

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বরাদ্দের ক্ষেত্রে নিম্ম ও মধ্যবিত্তদের প্রতি খুব বেশি নজর নেই। খুলনার কয়রার মানুষ একটি বাঁধের জন্য আন্দোলন করছে। সেখানে বরাদ্দ নেই। কিন্তু মেগাপ্রকল্পের টাকা খরচ হয় না, তবুও সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়। অর্থাত্ গরিব মানুষের পক্ষে কথা বলার লোক সংসদে নেই। তিনি বলেন, কর ছাড় দিলে বিনিয়োগ বাড়বে কিনা তা নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে টাকা গেলে, তারা খরচ করবে এতে অর্থনীতিতে গতি আসবে। ফলে করমুক্ত আয় সীমা আরও বাড়ানো উচিত।