ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতালাভের পর আমেরিকান স্বাধীনতাযুদ্ধের মহানায়ক জর্জ ওয়াশিংটন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ১৭৮৯ সালের ৩০ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও সম্পদশালী রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। যেসব রাষ্ট্রনায়কের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অসাধারণ দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার ফলশ্রুতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতাধর ও সম্পদের উচ্চ শিখরে উপনীত হয়েছে, তন্মধ্যে জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিংকন, ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট, থমাস জেফারসন, উড্রো উইলসন, থিয়েডর রুজভেল্ট, হ্যারি এস ট্রুম্যান ও ডি আইসেন আওয়ারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আমেরিকান ইতিহাস গড়ার কারিগর ও আসাধারণ রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে কেনেডি একজন ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব, সুদর্শন ও অনলবর্ষী বক্তা। দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠতম প্রেসিডেন্ট জন ফিটেজরাল্ড কেনেডি, যিনি জন এফ কেনেডি নামে সুপরিচিত।
কেনেডি ১৯১৭ সালের ২৯ মে ম্যাসাচুয়েট্স-এর ব্রুকলিনে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম জোসেফ প্যাট্রিক কেনেডি। তার বাবা প্রখ্যাত ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। তার মায়ের নাম রোস এলিজাবেথ। জন এফ কেনেডি ১৯৪০ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীতে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত লেফটেন্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টর্পেডো স্কোয়াড্রন-২-এর নৌ কমান্ডারের দায়িত্ব সাহসিকতার সঙ্গে পালন করেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে কেনেডি ১৯৪৫ সালে নৌবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে জ্যাকুলিন বোভিয়রের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কেনেডি জানুয়ারি ১৯৪৭ থেকে জানুয়ারি ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ হিসেবে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধিত্ব করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ১৯৫৩ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে ১৯৬০ সালের ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত সিনেটরের দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই প্রথম আইরিশ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। কেনেডি একমাত্র আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, যিনি ‘প্রোফাইল ইন ক্যারেজ’ বই লেখায় সাহিত্যিক হিসেবে পুলিত্জাত পুরস্কারপ্রাপ্ত হন। ১৯৬০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে কেনেডি মনোনয়ন পান। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান। ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে কেনেডি ৩০৩ এবং নিক্সন ২১৯ ভোট পান।
জন এফ কেনেডি ১৯৬১ সালের ২০ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তখন তার বয়স মাত্র ৪৩ বছর। প্রবীণ রাজনীতিবিদদের পর কেনেডির আগমনে হোয়াইট হাউজ যেন তারুণ্যের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে। উদারনৈতিক ও গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন নেতা হওয়া সত্ত্বেও ভিয়েতনাম যুদ্ধের সূচনা ও কিউবার মহান রাষ্ট্রনায়ক ফিদেল ক্যাস্ত্রোর বিরুদ্ধে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের অভিযোগে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। প্রখ্যাত অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর সঙ্গে গভীর সম্পর্কেও গুঞ্জন রয়েছে, তার বিরুদ্ধে।
১৯৬২ সালের ১৪ অক্টোবর সিইআইএর সংগৃহীত তথ্য থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক কিউবায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বসানো হয়। আমেরিকান নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও উপদেষ্টাদের কিউবা আক্রমণের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করেন কেনেডি। তিনি বিশ্বশান্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করেন এবং কিউবার বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ গড়ে তোলেন। অতঃপর সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সেক্রেটারি নিকিতা ক্রুশ্চেভ ও কেনেডির মধ্যে পত্রবিনিময় হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরপূর্বক সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৬২ সালের ২০ নভেম্বর কিউবা থেকে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহার এবং একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ক ও ইতালি থেকে জুপিটার ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহার করে নেয়। উপরোক্ত সমঝোতা চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র, কিউবা, সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা সমগ্র বিশ্বকে একটি অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়, যা কেনেডির অসাধারণ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও কূটনৈতিক সাফল্য বলে বিবেচিত হয়। কিউবা সংকটের শান্তিপূর্ণ পরিসমাপ্তি হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমাবর্ষণের বিভীষিকাময় স্মৃতি, বিশ্বে ৭ কোটি মানুষের ভয়াবহ মৃত্যুর আলোকে কেনেডি হূদয় দিয়ে বিশ্বশান্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৬৩ সালের ৫ আগস্ট মস্কোতে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য পারমাণবিক পরীক্ষা সীমিতকরণ চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকে যে, ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো যাবে, কিন্তু ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে এবং জলরাশির নিচে পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো নিষিদ্ধ করা হয়।
আমেরিকার পূর্ববর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং কেনেডি সরকারের সময় প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়। তত্কালীন সময়ে বেকারত্বের সংখ্যা কমানো সম্ভব হয়নি। ১৯৬৩ সালে মার্কিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে আমেরিকার নাগরিক অধিকার আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোতে থাকে। ১৯৬৩ সালের ১১ জুন, প্রেসিডেন্ট কেনেডি টেলিভিশন ভাষণে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ও ভোটদানের ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ সব নাগরিকের সম-অধিকার সংরক্ষণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। ১৯৬৩ সালের ২৩ আগস্ট, লিংকন মেমোরিয়ালের সামনে কয়েক লাখ লোকের বিশাল জনসভায় ড. মার্টিন লুথার কিং এক ঐতিহাসিক ও হূদয়স্পর্শী ভাষণ দেন, পরে সেটাই পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। প্রেসিডেন্ট কেনেডির আমন্ত্রণে জনসভা সমাপ্ত হওয়ার পরই লুথার কিংসহ নেতৃবৃন্দকে হোয়াইট হাউজে জন এফ কেনেডি স্বাগত জানান এবং তাদের দাবির প্রতি পুনঃ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর টেক্সাসের ডালাসে এক মোটর শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। ডালাসের আকাশে কালো মেঘ, তখন দুপুর ১২:৩০ মিনিট। গাড়ির বহর ডিলে প্লাজা অতিক্রম করছিল। পরপর দুটি গুলি, দ্বিতীয়টি তার মাথায় লাগে। রক্তাক্ত অবস্থায় গাড়িতে লুটিয়ে পড়েন। তাত্ক্ষণিকভাবে পার্কল্যান্ট হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ৩০ মিনিট পর কর্তৃপক্ষ কেনেডিকে মৃত ঘোষণা করেন। উক্ত ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে লি হার্ভে অসওয়াল্ডকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আমেরিকার নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য ছিলেন। ২৪ নভেম্বর পুলিশের হেফাজতে থাকাকালীন একটি নাইট ক্লাবের মালিক জ্যাক রুবির গুলিতে লি হার্ভে অসওয়াল্ড নিহত হন।
আমেরিকান নাগরিক অধিকার আইনের প্রধান রূপকার এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অন্যতম মহানায়ক জন এফ কেনেডির হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত নিষ্ঠুর, বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক। জন এফ কেনেডি যুক্তরাষ্ট্র তথা বিশ্বের ইতিহাসে অম্লান ও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
n লেখক : সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় চার নেতা পরিষদ
