সময়ের প্রয়োজনে সবকিছুই হইবে

আপডেট : ০৬ জুন ২০২১, ২১:১৯

সস্তার নাকি তিন অবস্থা! এই কারণেই কি আমাদের এইখানে ইন্টানেটের মূল্য বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের তুলনায় অনেকটাই বেশি? যদিও বলা হইয়া থাকে, দেশ যত উন্নত হইবে, ইন্টারনেটের মূল্য তত কম হইবে এবং গতি তত বেশি হইবে। সম্প্রতি সারা দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের একই মূল্য নির্ধারণ করিয়া দিতেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। রাজধানী ঢাকা হউক, আর দেশের কোনো ইউনিয়ন হউক—ইন্টারনেট সেবাদাতাদের একই মূল্যে সংযোগ দিতে হইবে। বিটিআরসি এই কর্মসূচির নাম দিয়াছে ‘এক দেশ, এক রেট’। এই কর্মসূচির আওতায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের জন্য তিনটি প্যাকেজ থাকিবে। প্রথম প্যাকেজের মূল্য মাসে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা, গতি হইবে ৫ এমবিপিএস। দ্বিতীয় প্যাকেজের মূল্য মাসিক ৮০০ টাকার মধ্যে এবং গতি হইবে ১০ এমবিপিএস এবং তৃতীয় প্যাকেজের গতি ২০ এমবিপিএস এবং মূল্য হইতে পারে মাসিক ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে। নিঃসন্দেহে ইহা সময়োপযোগী উদ্যোগ।

অনেকে অবশ্য সমালোচনা করিয়া বলিতে পারেন—ভালো উদ্যোগ বটে, তবে আরো আগেই এই উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমরা ভুলিয়া যাই কী করিয়া, কয়েক দশক পূর্বেও আমরা তথ্যপ্রযুক্তির এই বিপ্লব কল্পনাও করিতে পারি নাই। গ্রামে, ইউনিয়নে, উপজেলায় পর্যায়ে ইন্টারনেট পাওয়া তো দূরের কথা, জেলা শহরেও উহা সামান্যই পাওয়া যাইত। যেইটুকু-বা পাওয়া যাইত, উহার গতি শামুকের চাইতেও শ্লথ। বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব ঘটিয়াছে, আমরাও বিশ্বগ্রামের অংশ বলিয়া সেই বিপ্লবের ঢেউ আমাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হইতেছে। আমরা তৃতীয় বিশ্বে থাকি বলিয়া ঢেউয়ের মাত্রা একটু কম। তবে ঢেউ যে আছে, তাহা অস্বীকার করা যাইবে না। সুতরাং পরিবর্তন একটু আগে ঘটিতেছে নাকি একটু পরে—তাহা গুরুত্বপূর্ণ নহে। গ্রামেও এখন যখন ব্রডব্যান্ডের ক্যাবল জাল বিছায়, তখন তাহা বাংলাদেশের ডিজিটাল উন্নয়নের ইঙ্গিত বহন করে নিশ্চয়ই। মনে রাখিতে হইবে, প্রথম প্রথম যে কোনো কিছুর মূল্য একটু বাড়তি থাকে। সময়ের ব্যবধানে তাহা স্বাভাবিক হইয়া যায়। এত অস্থির হইতে নাই। সুতরাং ‘ইন্টারনেটের মূল্য অধিক, কিন্তু গতি কম’—এই ধরনের অভিযোগের চাইতেও বড় কথা হইল—১০ বত্সর আগে যাহা কল্পনাও করা যাইত না, তাহা আজ আমাদের দোরগোড়ায়! গ্লাসের অর্ধেক ‘খালি’ না দেখিয়া গ্লাসটির অর্ধেক যে ‘ভরা’—সেই ইতিবাচক দিকটি অনুধাবন করিতে হইবে।

করোনার কারণে সারা বিশ্বেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালাইয়া যাইতেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরিয়া বন্ধ থাকিবার কারণে অনেক শিক্ষার্থীই এখন মফস্সলে চলিয়া গিয়াছেন। এইদিকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রমও চালাইয়া যাইতেছে। সুতরাং এই সময়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ‘এক দেশ, এক রেটের’ গুরুত্ব অপরিসীম। ইহার পাশাপাশি আমরা আশা করিব, ক্রমান্বয়ে মোবাইল ইন্টারনেটের প্যাকেজও যতটা সম্ভব সাশ্রয়ী করা হইবে। অনেকেই বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতে একসময় মোবাইল ইন্টারনেটের প্যাকেজ আমাদের মতোই উচ্চ মূল্যে ক্রয় করিতে হইত। কিন্তু ‘জিয়ো’ আসিয়া সেইখানে সাশ্রয়ী মূল্যে মোবাইল ইন্টারনেটের প্যাকেজের বিপ্লব ঘটাইয়াছে। এখন সেইখানে অপারেটরভেদে মাসে ৬০ জিবি ইন্টারনেট, আনলিমিটেড ফ্রি ভয়েজ কল ও এসএমএসের মূল্য দুই শত হইতে আড়াই শত রুপির কাছাকাছি। বাংলাদেশি মুদ্রায় মাত্র আড়াই শত হইতে তিন শত টাকা। এই মূল্যের প্যাকেজ অপারেটরভেদে বাংলাদেশে চার হইতে ১০ গুণ বেশি। অন্যদিকে, প্রথম বিশ্বে ফ্রি হটস্পট থাকে বলিয়া মোবাইল ডেটা ব্যবহার করিতেই হয় না। সুতরাং উন্নয়নের মহিসোপানে ডানা মেলিতে হইলে সকল ধরনের ইন্টারনেটের সাশ্রয়ী মূল্য ও গতিই এখন সবচাইতে বড় জ্বালানি। করোনা আসিয়া বলিয়া দিতেছে, ইন্টারনেট এখন বিলাসিতা নহে, বরং বিশ্বের উন্মুক্ত জ্ঞানভান্ডারে প্রবেশপথের চাবিকাঠি। সেই চাবিকাঠি যদি দুর্লভ হয়, তাহা হইলে আমরা নিজেদের পায়ে নিজেরাই শিকল পরাইয়া রাখিব। সময়ের প্রয়োজন অস্বীকার করা যাইবে না।