জাতির মুক্তিসনদ ৬ দফা

আপডেট : ০৬ জুন ২০২১, ২১:২২

প্রতি বছর জাতীয় জীবনে ৭ জুন তথা ‘ছয় দফা দিবস’ ফিরে আসে এবং যথাযোগ্য মর্যাদায় আমরা দিনটি পালন করি। এবার ‘করোনা ভাইরাস’ মহামারি আকারে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ’ তথা ‘মুজিববর্ষ’, ‘গণহত্যা দিবস’, ‘স্বাধীনতা দিবস’, ‘বাংলা নববর্ষ’, ‘মুজিবনগর দিবস’ এবং ‘শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস’ উপলক্ষ্যে গৃহীত রাষ্ট্রীয় ও দলীয় অনুষ্ঠানাদি সীমিত করা হয়েছে। আশা করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকার এবং দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণ দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে এই ভয়াবহ দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।

আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে ছয় দফা দাবি আদায়ে ৭ জুনের গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৬৬-এর এই দিনে শহিদদের রক্তে রঞ্জিত হয় জাতির মুক্তিসনদ ছয় দফা। পরে ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনের সূচনালগ্নে ছয় দফা দাড়ি-কমা-সেমিকোলনসমেত এগারো দফায় নির্ধারিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে একসাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। বিচক্ষণ নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার হূদয়ের গভীরে প্রবহমান ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। স্বাধীনতার বাইরে অন্য কোনো চিন্তা তার ছিল না। জেল-জুলম-অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করায় তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।

স্বাধিকার অর্জন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে বাংলার মানুষ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ৭ জুন সর্বব্যাপী হরতাল পালন করেছিল। স্বৈরশাসক আইয়ুব খান বাঙালি জাতিকে গোলামির শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত করতে চেয়েছিল। এর বিরুদ্ধে ’৬৬-এর ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলসমূহের কনভেনশনে ‘বাঙালির মুক্তিসনদ’ খ্যাত ‘ছয় দফা’ উত্থাপন করে তা বিষয়সূচিতে অন্তর্ভুক্তের প্রস্তাব করেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু ১১ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরে ঢাকা বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন। ২০ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ‘ছয় দফা’ দলীয় কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ‘ছয় দফা’র পক্ষে জনমত সংগঠিত করতে বঙ্গবন্ধু ’৬৬-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের জনসভায় ‘ছয় দফা’কে ‘নূতন দিগন্তের নূতন মুক্তিসনদ’ উল্লেখ করে চট্টগ্রামবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘একদিন সমগ্র পাক-ভারতের মধ্যে ব্রিটিশ সরকারের জবরদস্ত শাসনব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে এই চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়েই বীর চট্টলার বীর সন্তানেরা স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন করেছিলেন। আমি চাই, পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চিত মানুষের জন্য দাবি আদায়ে সংগ্রামী পতাকাও চট্টগ্রামবাসী চট্টগ্রামেই প্রথম উড্ডীন করুন।’

চট্টগ্রামের জনসভার পর দলের আসন্ন কাউন্সিল সামনে রেখে ‘ছয় দফা’র যৌক্তিকতা তুলে ধরতে তিনি একের পর এক জনসভা করে জনতার দরবারে বক্তব্য পেশ করেন। ’৬৬-এর ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ ছিল আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন। কাউন্সিল সভায় পুস্তিকাটি বিলি করা হয়। ‘ছয় দফা’র ভিত্তিতে সংশোধিত দলীয় গঠনতন্ত্র অনুমোদিত হয়। ‘ছয় দফা কর্মসূচি’ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পরে ‘ছয় দফা’ এতই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, বাংলার ঘরে ঘরে এই পুস্তিকা সযত্নে রক্ষিত হয়। ‘ছয় দফা’ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু আমাদের বলতেন, ‘সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘ছয় দফার প্রশ্নে কোনো আপস নাই। রাজনীতিতেও কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নাই। নেতৃবৃন্দের ঐক্যের মধ্যেও আওয়ামী লীগ আর আস্থাশীল নয়। নির্দিষ্ট আদর্শ এবং সেই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের ঐক্যেই আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগ নেতার দল নয়, এই প্রতিষ্ঠান কর্মীদের প্রতিষ্ঠান। শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে এই ছয় দফা আদায় করতে হবে। কোনো হুমকিই ছয় দফা আন্দোলনকে প্রতিরোধ করতে পারবে না। ছয় দফা হচ্ছে বাঙালির মুক্তির সনদ।’

সফলভাবে সমাপ্ত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের পর বঙ্গবন্ধু সারা দেশে ৩৫ দিনে মোট ৩২টি জনসভায় বক্তৃতা করেন। লাগাতার জনসভায় প্রদত্ত বক্তৃতায় ‘ছয় দফা’র সপক্ষে জনমত প্রবল হয়ে ওঠে। ফলে বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের ওপর নেমে আসে নির্মম গ্রেফতার-নির্যাতন। প্রতিটি জেলা থেকে জারি করা ওয়ারেন্টের বলে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের প্রক্রিয়া চলতে থাকে। ‘ছয় দফা’ প্রচারকালে মাত্র আড়াই মাসে বঙ্গবন্ধুকে সর্বমোট আট বার গ্রেফতার করা হয়। সর্বশেষ ‘মে দিবস’ স্মরণে নারায়ণগঞ্জে শ্রমিক-জনতার মহাসমাবেশে ভাষণদান শেষে ৮ মে রাত ১টায় বাসায় ফিরলে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। ‘ছয় দফা’ দেওয়াকে অপরাধ গণ্য করে স্বৈরশাসক আইয়ুব বঙ্গবন্ধুকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে অভিহিত করে এবং দেশরক্ষা আইনে আওয়ামী লীগের ওপর গ্রেফতার-নির্যাতন চালায়। প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের আহ্বানে ১৩ মে সমগ্র প্রদেশে ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালিত হয়। প্রতিবাদ দিবসের জনসভায় ‘ছয় দফা’র প্রতি গণমানুষের বিপুল সমর্থন প্রকাশ পায়। নেতৃবৃন্দের গ্রেফতার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ২০ মে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ‘৭ জুন’ সর্বব্যাপী হরতাল আহ্বান করা হয়। ৭ জুনের হরতালে পূর্ব বাংলার বিক্ষুব্ধ মানুষ স্বাধিকার এবং বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়।

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ছাত্রলীগের সার্বক্ষণিক কর্মী, ইকবাল হল (বর্তমানে শহিদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি। সর্বজনাব শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, সৈয়দ মাজহারুল হক বাকী, আব্দুর রাজ্জাক, আমীর হোসেন আমু, আব্দুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, নূরে আলম সিদ্দিকীসহ আরো অনেকে সেদিন হরতাল কর্মসূচি পালনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। সেদিনের হরতাল কর্মসূচিতে ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য সরকারের নির্দেশে পুলিশ বাহিনী নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে তেজগাঁওয়ে শ্রমিক মনু মিয়া, আদমজিতে মুজিবুল্লাহসহ ১১ জন শহিদ হন এবং প্রায় ৮০০ লোককে গ্রেফতার করা হয়। তেজগাঁ শিল্পাঞ্চলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সফল হরতাল পালন করেন। প্রকৃতপক্ষে ৭ জুন ছিল স্বাধিকার থেকে পূর্ণ স্বাধীনতার সূচনাবিন্দু। আমাদের স্বাধীনতার চেতনার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল এই দিনে। ছয় দফা দাবি আদায় প্রসঙ্গে কারান্তরালে বসে ৫ জুন ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগের কর্মীরা যথেষ্ট নির্যাতন ভোগ করেছে। ছয় দফা দাবি যখন তারা দেশের কাছে পেশ করেছে, তখনই প্রস্তুত হয়ে গেছে যে তাদের দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হবে। এটা ক্ষমতা দখলের সংগ্রাম নয়, জনগণকে শোষণের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য সংগ্রাম।’

৭ জুনের সফল হরতালে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান ভীত-সন্ত্রস্ত হয়। ছয় দফা সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দেয়। ‘ছয় দফা’র পক্ষে জনমত তৈরিতে দৈনিক ইত্তেফাকের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ হয়ে ’৬৬-এর ১৬ জুন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেফতার এবং দ্য নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করে। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের ফলে দৈনিক ইত্তেফাক এবং বাজেয়াপ্তকৃত নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস ফেরত প্রদানে স্বৈরশাসক বাধ্য হয়। ৭ জুনের অনেক স্মৃতি মানসপটে ভেসে ওঠে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি গভীরভাবে অনুভূত হয়। বঙ্গবন্ধুর স্নেহে আমার জীবন ধন্য। ৭ জুনের চেতনাবহ এই দিন জাতীয় জীবনে অম্লান হয়ে আছে। ৭ জুন যেসব শহিদ ভাই বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বাংলার মানুষের মুক্তির পথকে প্রশস্ত করে গিয়েছেন, আজ তাদের পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। তাদের অমর প্রাণের বিনিময়ে সংগ্রামপরম্পরায় একসাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ কায়েম হয়েছে। শহিদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে মুজিবাদর্শের ভিত্তিতে আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের নবদিগন্তের সূচনা হয়েছে। ৭ জুন, আমাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চেতনার দিন। ঐতিহাসিক এই দিনে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন কর্তব্য বলে মনে করি।

n লেখক :আওয়ামী লীগের নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি