স্বাধীনতার পথে এক অনন্য দলিল

আপডেট : ০৬ জুন ২০২১, ২১:২৩

স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় এশিয়ার রাষ্ট্রসমূহে স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের তুলনায় এক অসাধারণ অবস্থান নিয়ে আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস ঔপনিবেশিক শাসনের জাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট অন্যান্য দেশের ও জাতির ইতিহাস থেকে ভিন্নতার দাবি রাখে। প্রথমত, একটি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম; দ্বিতীয়ত, ভাষাগত দিক থেকে এক অভিন্ন ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তার স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রাম; তৃতীয়ত, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট বহুজাতিক ভারতীয় জাতীয়তা ও ধর্মভিত্তিক পাকিস্তানি জাতীয়তার বিপরীতে নৃতাত্ত্বিকভাবে একক জাতিসত্তার স্বতন্ত্র জাতীয়তার বিকাশ; এবং চতুর্থত, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পথ ধরে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা অন্যান্য উপনিবেশসমূহের স্বাধীনতা অর্জনের পথ থেকে এক স্বতন্ত্র ও অন্যান্য ইতিহাস রচনা করেছে। শুধু এশিয়া নয়, সমগ্র বিশ্বে উপনিবেশসমূহের স্বাধীনতা অর্জনের পথ প্রায় অভিন্ন। হয় এসব দেশ সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, কিংবা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর দখলদারিত্ব ছেড়ে দিয়ে সাম্রাজ্য গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় কোনো কোনো দেশের স্বাধীনতা দান হিসেবে অর্জিত হয়েছে।

উপনিবেশসমূহের স্বাধীনতা অর্জনের এই তিন পথের বাইরে বাংলাদেশই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, যা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও সশস্ত্র যুদ্ধের সমন্বয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ভারতীয় ও পাকিস্তানি জাতীয়তার বিপরীতে বাঙালির স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় সংরক্ষণের যে তাগিদ ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি মানসে চেতনার বিকাশ ঘটায়, তা-ই ১৯৬৬-র ৬-দফা কর্মসূচির মাধ্যমে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের চেতনা বিকাশের পথে এক অসাধারণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৬২ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খান তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রভিত্তিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করে বাংলার ওপর চাপিয়ে দিলে বাংলার মানুষের স্বাধীন বিকাশের পথ একবারেই রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ১৯৬৫ সালে মৌলিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচনে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর বোন মোহতারেমা ফাতেমা জিন্নাহকে প্রার্থী করে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের এজেন্ডা নিয়ে নির্বাচনি যুদ্ধে ব্যাপক জনসমর্থনের ভিত্তিতে এক অভূতপূর্ব আন্দোলনের সূচনা হয়। কিন্তু ফলাফল প্রত্যাশিতভাবেই সামরিক শাসক আইয়ুবের পক্ষে গেলে গণতান্ত্রিক শিবিরে আবারও হতাশা নেমে আসে। এরই প্রেক্ষাপটে পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়। যুদ্ধে পরাজয়ের মুখে রাশিয়ার (তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন) রাষ্ট্রপতি পদগর্নি ও প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের আন্তরিক প্রয়াসে তাসখন্দে পাক-ভারত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের সব মহল এ শান্তিচুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করলেও বাঙালি স্বার্থের প্রতিভূ শেখ মুজিব ও তার দল আওয়ামী লীগ শান্তিচুক্তির পক্ষে বক্তব্য রাখেন। মুজিব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান অরক্ষিত ছিল এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এর প্রতিরক্ষার কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি। সে ফ ভারতের শুভেচ্ছার ওপর এ অঞ্চল যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল। ১৯৬৬-র ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত এ কনভেনশন যুদ্ধের বাস্তবতার আলোকে এবং বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে সমন্বিত করে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কর্মসূচি তুলে ধরার সুযোগ এনে দেয় শেখ মুজিবকে। তিনি এই কনভেনশনে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা হিসেবে ছয়টি দাবি উত্থাপন করেন, যা ঢাকায় এসে ৬-দফা কর্মসূচি হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

লাহোর কনভেনশনে ৬-দফা ঘোষণার সঙ্গে তা পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থ ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরের শক্তির কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ে। আইয়ুব থেকে শুরু করে তার পা-চাটা ফকা চৌধুরী, মোনেম খাঁ, সবুর খাঁ, কাজী মাহাবুদ্দিন প্রমুখ সরকারি নেতা এবং নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান, মমতাজ দৌলতানা, মাহমুদ আলী কাসুরী, জুলফিকার আলি ভুট্টো, মওদুদি ও তার তস্য পদসেবী গো. আযমেরা প্রমুখ বিরোধী বাঙালি-অবাঙালি নেতৃবৃন্দ ৬-দফার বিরোধিতায় মাঠ সরগরম করে তুলল। আইয়ুব বললেন, অস্ত্রের ভাষায় ৬-দফার মোকাবিলা করা হবে। বিরোধীরা বললেন যে, এটা বিচ্ছিন্নতার এক নগ্ন দলিল।

৬-দফাকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এক স্বতন্ত্র স্বাধীন বাঙালি আবাসভূমির আকাঙ্ক্ষার রূপ নিতে থাকে। প্রথম থেকেই সাধারণ্যে না এলেও ৬-দফা যে এক দফার পথে যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ তা ৬-দফাপন্থিদের মাঝে ব্যাপকভাবে আলোচিত হতে থাকে। এজন্যই দেখা যায়, পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে যারা সম্ভব মনে করেছিলেন, আওয়ামী লীগের সেই সব নেতা আব্দুস সালাম খান, মাওলানা তর্কবাগীশ (পরবর্তী সময় মূল দলে ফিরে আসেন সত্তরের নির্বাচনের আগেই), আবুল মনসুর আহমেদ, যশোরের মশিউরি রহমান (পরবর্তী সময় মূল আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধের সময় যশোরে শহিদ হন পাকিস্তানিদের হাতে), রংপুরের মতিউর রহমান (পরবর্তী সময় ঢাকা চেম্বারের সভাপতি, সত্তরের নির্বাচনের আগে মূল দলে ফিরে আসেন এবং স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হন), বগুড়া ও রাজশাহীর মুজিবুর রহমান প্রমুখ ৬-দফা প্রশ্নে ভিন্নমত পোষণ করে স্বতন্ত্র আট দফাপন্থি বা পিডিএম-পন্থিরা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন। এদিকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মিজানুর রহমান চৌধুরী, এম এ আজিজ, জহুর আহমেদ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, মোল্লা জালালউদ্দিন আহমেদ, আব্দুল মোমেন, মালেক উকিল প্রমুখ শেখ সাহেবের পাশে থেকে ৬-দফার সংগ্রাম তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে বেগবান করার দায়িত্ব নিলেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ। তাদের নেতৃত্বে সারা দেশের ছাত্র-যুবকরা বাঙালির স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬-দফা আন্দোলনকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য কাজ করে যেতে থাকলেন। ৬-দফা যে কার্যত এক দফা বা স্বাধীনতারই প্রাথমিক পদক্ষেপ—এ কথা, এ প্রচার ক্রমান্বয়ে তীব্রতা লাভ করতে লাগল।

বস্তুত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাধারণ সূত্র অনুযায়ী ৬-দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে পাকিস্তানে ফেডারেল রাষ্ট্র গঠন কোনো অবাস্তব বা অস্বাভাবিক প্রস্তাব না হলেও কোনো ফেডারেল রাষ্ট্রের গঠনই ৬-দফানুগ নয়। ষাটের দশকে এ ধরনের ফেডারেল রাষ্ট্র গঠনের কয়েকটি প্রচেষ্টাই মধ্যপ্রাচ্যে ভেস্তে যায়। প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের, হাফেজ আল আসাদ ও মোয়াম্মের গাদ্দাফির এ ধরনের ফেডারেশন গঠন প্রক্রিয়া বারবারই ব্যর্থ হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র বা যুগোস্লোভিয়ায় ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামো থাকলেও একমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত অন্য দুটি ফেডারেশন যে ক্ষণভঙ্গুর ছিল তা ইতিহাসের শিক্ষায় আজ প্রমাণিত। মার্কিনিদের রয়েছে এক ভাষা ও সংস্কৃতি, ধর্মবোধ ও স্বাধীনতাসংগ্রামের ঐতিহ্য। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা একটি কার্যকর গণতন্ত্রও স্থাপন করতে সক্ষম হয়। ভারতীয় ফেডারেশন যে এখনো এক আছে তার প্রধান কারণ হচ্ছে দুটি। প্রথমত, ভারতবর্ষ বহুজাতিক বহুভাষিক দেশ হলেও তার রয়েছে কয়েক হাজার বছরের পুরোনো অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং দ্বিতীয়ত, ইতিমধ্যে ভারতীয়রা ত্রুটিপূর্ণ হলেও একটি কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।

সুতরাং পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, ৬-দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে প্রস্তাবিত পাকিস্তান ফেডারেশন বাস্তবে শান্তিপূর্ণ পথে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথ বই আর কিছু নয়। পাকিস্তানিদের সঙ্গে এক ছাদের নিচে বসবাস করা যে বাঙালির পক্ষে অসম্ভব ও অপ্রয়োজনীয়—এ কথা ষাটের দশকে বাঙালি স্বার্থের একক মুখপাত্র হিসেবে দাঁড়ানো শেখ মুজিব জানতেন ও বুঝতেন। তার এই রাজনৈতিক দর্শনকে বাঙালির স্বাধীনতার লক্ষ্যে পরিচালিত করার জন্যই তিনি ৬-দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেছিলেন। অতএব, আমাদের আলোচনার সারমর্ম আমরা এভাবে টানতে পারি যে, সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথে দফা কর্মসূচি এক মূল্যবান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। তাই পাকিস্তানিরা ৬-দফাকে বিচ্ছিন্নভাবে দলিল বললেও আমরা বলব ৬-দফা ছিল বাঙালির ম্যাগনাকার্টা ও স্বাধীনতা অর্জনের পথে এক প্রামাণ্য দলিল ও অনুঘটক।

লেখক :পঁচাত্তর-পরবর্তী প্রতিরোধ যোদ্ধা, সংসদ সদস্য এবং সম্পাদক, মত ও পথ