চট্টগ্রামে বর্ষণে নগরীর বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। চাক্তাই খালসহ বিভিন্ন খালের মুখ বাঁধের কারণে বন্ধ থাকায় বৃষ্টির পানি আটকা পড়ে। এতে নগরীর বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। বাসাবাড়ির নিচতলা ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে। নগরীর প্রধান সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়ে মানুষ। সিটি করপোরেশন জানায়, নগরীর প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। চট্টগ্রামে বজ্রপাতে নারীসহ চার জন মারা গেছে। নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরিয়ে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নিচ্ছে জেলা প্রশাসন।
নগরীর বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, শুলকবহর, বাকলিয়া, ২ নম্বর গেট, বাদুড়তলা, কাপাসগোলা, চকবাজার, হালিশহরসহ আরো কয়েকটি এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এসব এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কর্মজীবী মানুষকে পায়ে হেঁটে ও ভ্যানে করে গন্তব্যস্থলে যেতে হয়েছে। কয়েক দিন আগে বৃষ্টি শুরু হলে নগরীতে জলাবদ্ধতা নিয়ে আশঙ্কা করছিলেন সিটি মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি খালের বিভিন্ন অংশে ও মুখে নির্মিত বাঁধগুলো কেটে দিতে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের বলেছিলেন।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ শহীদুল ইসলাম বলেন, মৌসুমি বায়ুর অগ্রভাগের প্রভাবে চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। সকাল ৮টা থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, খালে বাঁধ এবং হঠাত্ টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের কারণে জলাবদ্ধতা হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নগরীর নিচু এলাকায় আরো জলাবদ্ধাতা সৃষ্টি হবে।’
চট্টগ্রাম নগরীতে জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার প্রকল্প সেনাবাহিনী বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। কাজ করার জন্য খালের বিভিন্ন অংশে বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। এতে চাক্তাই খালসহ অন্যান্য খালে পানি নিষ্কাষণ হতে পারছে না। সিডিএর প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বেশি ছিল। পানি দ্রুত নামতে পারেনি। পানি সাময়িক জমে থেকেছে। তাই এটাকে জলাবদ্ধতা বলা যায় না।
এদিকে জেলার ফটিকছড়ি এলাকায় বজ্রপাতে দুই নারী মারা গেছেন। আহত হয়েছেন আরো কয়েক জন। উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন লাকী দাশ (৩৮) ও ভানু শীল (৪০)। আহতরা হলেন মালতি রানী দাশ (৫০) ও শোভা রানী দাশ (৪৫)। ফটিকছড়ি থানার ওসি মো. রবিউল ইসলাম বলেন, যখন বৃষ্টিপাত শুরু হয়, তখন তারা খেতে ছিলেন। এ সময় বজ্রপাতে তারা আহত হন। পরে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিত্সক লাকী ও ভানুকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত দুজন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন।’
এছাড়া মিরসরাই ও বোয়ালখালী এলাকায় বজ্রপাতে আরো দুজন মারা গেছে। এদের মধ্যে এক জন শিক্ষার্থী, আরেক জন দিনমজুর। জানা যায়, মিরসরাই শহরখালী ইউনিয়নের পূর্ব ডোমখালী ওয়ার্ডে বাবার সঙ্গে খেতে কাজ করছিলেন দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন (১৬)। এ সময় তার বাবা মোশারফ হোসেনও আহত হন। এদিকে বোয়ালখালী উপজেলায় বজ্রপাতে মো. জাহাঙ্গীর (৩৯) নামে এক দিনমজুর মারা গেছেন। উপজেলার জ্যৈষ্ঠপুরা পাহাড়ের গরজংগিয়া এলাকায় লেবুবাগানে কাজ করার সময় এ ঘটনা ঘটে। পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে নিচ্ছে জেলা প্রশাসন।
নগরীর বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে শত শত পরিবার বসবাস করছে। সরকারি ও বেসরকারি পাহাড়ে অসংখ্য অবৈধ বসতি রয়েছে। বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার পর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির পরিবারগুলোকে সরিয়ে নিতে কাজ করছেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। সরিয়ে নেওয়া পরিবারগুলোকে রাখার জন্য ৩০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তাদের খাবারও তৈরি করে রাখা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. নাজমুল আহসান ইত্তেফাককে বলেন, ‘ঈদের পর থেকে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে উচ্ছেদ কার্যক্রম চালাচ্ছি। এখন বৃষ্টির মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির মানুষদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আমাদের ১৮টি টিম কাজ করছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১০০ পরিবারকে সরিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন ১৮টি পাহাড়ে জেলা প্রশাসনের টিম কাজ করছে। আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
জেলা প্রশাসনের করা তালিকায় ১৭টি পাহাড়ের মধ্যে ১০টি ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং সাতটি সরকারি বিভিন্ন সংস্থার। সরকারি সংস্থার মধ্যে রয়েছে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, গণপূর্ত বিভাগ, রেলওয়ে ও জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। সরকারি ও বেসরকারি এসব পাহাড়ে ৮৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ বসতি চিহ্নিত করে তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। এদের মধ্যে গত বছর কয়েক শ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হলেও পরে তারা আবার ফিরে গিয়ে বসবাস করছে। আবার কিছু পাহাড়ে বসতি উচ্ছেদ নিয়ে আদালতে মামলা রয়েছে।
ধসে পড়ল ম্যুরালসহ দেওয়াল
ভারী বর্ষণে নগরীর ঐতিহাসিক লালদীঘি মাঠের সীমানাপ্রাচীর ধসে পড়েছে। এতে ২০ ফুট আয়তনের তিনটি টেরাকোটার ম্যুরাল নষ্ট হয়েছে। গতকাল রবিবার সীমানাপ্রাচীরের অংশ-বিশেষ ধসে পড়ে।
ঐতিহাসিক লালদীঘির মাঠের চারপাশে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। মাঠের দক্ষিণ পাশে পাহাড়সংলগ্ন দেওয়ালের নিচের একাংশ ধসে পড়ে। সিএমপির পাহাড়ে বহুতল ভবন নির্মাণের পাইলিংয়ের কাজ করা হয়েছে। এতে সীমানাপ্রাচীর কিছুটা দুর্বল হয়ে যায়। ধসে পড়া দেওয়ালটি অনেক পুরোনো, যা গণপূর্ত অধিদপ্তর নির্মাণ করেছিল।
এ ব্যাপারে লালদীঘি মাঠ ৬-দফা মঞ্চ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের পরিচালক ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জালাল উদ্দিন জানান। সীমানাপ্রাচীরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ প্রকল্পের আওতায় সংস্কার করা হবে।
