পলিমাটিতে মোড়া বাংলাদেশের মানুষের মনও কি সেই মাটিতে গড়া যা এক প্লাবনের পলিস্তর তার সব দুঃখ-কষ্ট, ভাঙন-সৃজনসহ একেবারে ঢাকা পড়ে যাবে আরেক প্লাবনের পলিতে?
না, বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের মন বারবার অভিষিক্ত হয়েছে নানা আন্দোলন আর অকাতরে রক্ত ঢালার ইতিহাসে। তার ইতিহাস সাহসিকতার ইতিহাস। বাঙালির রাষ্ট্রিক স্বাধীনতা অর্জনের আন্দোলনের ইতিহাস, সেখানে চিরস্থায়ী হয়ে আছে যে নামটি—সে নাম চিরভাস্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
আজকের এই করোনা অতিমারির প্রকোপ ক্লিষ্ট বিপন্ন সময়ে, শতধা বিভক্ত সমাজমানসে, এই দুঃখ জর্জর, বঞ্চনা-পীড়িত অশক্ত সমাজে বঙ্গবন্ধুকে যথাযথভাবে স্মরণ করতে ইতিহাসের পুনর্পাঠ একান্ত প্রয়োজন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ৬ দফার আন্দোলন। ৬ দফার আন্দোলন কেন করতে হয়েছিল? পিছন ফিরে তাকানো যাক।
১৯৬৬ সাল ছিল হতাশা ও অন্ধকারে আচ্ছন্ন। এর সূচনা ১৯৫৮ সালে যখন জারি হয় আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, নিষিদ্ধ হয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। রুদ্ধ হয় বাক-স্বাধীনতা। সেই সময় উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে চলে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই। তবে সাফল্য বিশেষ মেলে না। আন্দোলন জোর খুঁজে পায় না প্রবীণ নেতাদের ভীরুতা ও আপসকামিতার কারণে। এই পটভূমিকায় ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন শেখ মুজিব। এর পরপরই ঘটে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সমাজ বিনষ্টের আয়োজন। এর বিরুদ্ধে জাগে বাঙালি সমাজের প্রতিরোধ। সংবাদপত্রে ছাপা হয় সমবেত আহ্বান ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও।’ দাঙ্গা প্রতিরোধে শহরময় ছুটে বেড়ান শেখ মুজিব। এদিকে চলতে থাকে আইয়ুবের শাসন পাকাপাকি করার আয়োজন। তাঁর প্রণীত শাসনতন্ত্র অনুযায়ী ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রির ভোটে নিজেকে তথাকথিত নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট করার ব্যবস্থা। ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে আইয়ুব খান সদম্ভে ঘোষণা করেন ২০ বছর অব্যাহত থাকবে তাঁর শাসনতন্ত্র।
নেমে আসে ঘোর তমসা। এই দুর্দিনে কবি সিকান্দার আবু জাফর লিখেছিলেন কবিতা ‘জনতার সংগ্রাম চলবে আমাদের সংগ্রাম চলবে...’; ছাপা হয় দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় পাতায়। ক্রমেই শেখ মুজিবের মনে দানা বাঁধতে থাকে বাঙালির মুক্তির পথরেখা। ১৯৬৬ সাল ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলের রাজনৈতিক কনভেনশনে শেখ মুজিব তাঁর ৬ দফা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার দাবি তোলেন। প্রস্তাব অগ্রাহ্য হলে সভা ত্যাগ করে তিনি সংবাদ সম্মেলনে পেশ করেন ৬ দফা। ঢাকার দেওয়াল ছেয়ে যায় ৬ দফার পোস্টারে।
৬ দফার প্রথমেই রয়েছে গণতন্ত্রের দাবি। তারপর ৩, ৪ ও ৫ নম্বর দফায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে অর্থনীতির অধিকার। এ দেশের হাতে থাকবে কর আরোপ, বৈদেশিক বাণিজ্য ও সাহায্য, পরিকল্পনা ও ইত্যাদি অধিকার। প্রয়োজনে দুই প্রদেশে থাকবে দুই মুদ্রা। ৬ নম্বর দফায় বলা হয়েছে সামরিক অধিকারের কথা।
৬ দফার দাবিতে ৭ জুন শেখ মুজিবের ডাকে মনু মিয়াসহ বহু শ্রমিক ঢেলে দিলেন বুকের রক্ত। বাংলার মানুষ তৈরি করে ইতিহাস। ৬ দফা বাঙালির বাঁচার দাবি, মুক্তির সনদ। সে আন্দোলন জন্ম দিয়েছিল নতুন চেতনা। এটি বাঙালির ইতিহাসে এক মাইলফলক। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুরু হয় অভিযাত্রা—স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা।
গতকাল ৭ জুন রাত ৮টায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর তাদের ফেসবুক পাতায় মুজিব শতবর্ষে ৬-দফা দিবস উপলক্ষ্যে অনলাইনে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে ‘বঙ্গবন্ধু ও ৬ দফার সংগ্রাম/অন্ধকার থেকে আলোয়/৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ জুন ১৯৬৬’ শিরোনামে। ৬ দফাকে কেন্দ্র করে প্রচুর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রদর্শনীটি ৬ দফা সংগ্রামের একটি সামগ্রিক গবেষণার সারবস্তু হিসেবে রয়ে যাবে। খুব স্বচ্ছ ভাষায় চমত্কার উপস্থাপনায় ৬ দফার পটভূমিসহ ইতিহাস তুলে ধরার নৈপুণ্যের কৃতিত্ব মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের। প্রদর্শনীটির পরিকল্পনা বিন্যাস করেছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি মফিদুল হক ও আর্কিভিস্ট আমেনা খাতুন। গবেষণাজাত এই তথ্যচিত্রে ইতিহাস অত্যন্ত সহজভাবে প্রকাশিত। বিশেষ করে স্কুলের শিক্ষার্থী যারা ইতিহাসের জটিল জায়গায় পৌঁছতে ক্লান্তিবোধ করে তাদের জন্য এটি ঐতিহাসিক ৬ দফার আন্দোলন কী ও কেন তা জানতে আগ্রহ সৃষ্টি করবে সন্দেহ নেই। তরুণসমাজের কাছে সহজ করে ইতিহাস তুলে ধরা গেলে তারা ইতিহাস বিমুখ হবে না। এটাই এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সে গুরুদায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে নিষ্ঠার সঙ্গে।
প্রাণঢালা অভিনন্দন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে।
