কৃষিতে সম্ভাবনাময় হাইড্রোপোনিক্স

আপডেট : ০৭ জুন ২০২১, ২১:৩০

পানিতে খনিজ পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করে শাকসবজি, ঔষধি গাছ উত্পাদনের বৈজ্ঞানিক এক পদ্ধতি দিনকে দিন জনপ্রিয় হচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। হাইড্রোপোনিক্স হিসেবে সুপরিচিত আধুনিক এ কৃষিব্যবস্থায় মাটির প্লটের প্রয়োজন হয় না বলে নগরায়ণের এ ক্রান্তিলগ্নে সম্ভব হবে দেশব্যাপী বৃহত্ পরিসরে কৃষি উত্পাদন। এছাড়া বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উচ্চমাত্রার লবণাক্ততার কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলার মানুষের ফসলি জমি ব্যবহার করে খাদ্য উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে খাদ্য অনিশ্চয়তার কারণে অন্যান্য জেলার ওপর খাদ্যনির্ভরতা এবং প্রতি বছর নগরীর বস্তিগুলোতে ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’র ভিড় বাড়ছে।

আবার সারা বিশ্বেই কৃষিজমি বৃহত্ পরিসরে অকৃষি কাজে ব্যবহূত হওয়ায়, খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে দেখা দিচ্ছে সংশয়। ফলে ফসলি জমির নিশ্চয়তার এ চ্যালেঞ্জিং সময়ে হাইড্রোপোনিক্স বাড়ির আঙিনা, বারান্দা, ছাদ ও পতিত জায়গায় কৃষি উত্পাদনের সুযোগ সৃষ্টি করছে। সাধারণত হাইড্রো-কালচারের উপসেট হিসেবে ব্যবহার করা এ পদ্ধতি সীমিত জমি বা যে জমি প্রচুর দূষিত হয়ে আছে কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে অথবা যেখানে একেবারেই মাটির অস্তিত্ব নেই সেখানে প্রয়োগ করা যেতে পারে। দরকার হবে শুধু হাইড্রোপোনিক্স সেটটি স্থাপন করার জন্য খোলা জায়গা। হাইড্রোপোনিক্স পদ্ধতিতে প্রয়োজনীয় বেড তৈরিতে পরপর ইটের ওপর প্রথমে পলিথিন বিছিয়ে নিতে হবে। এর পর বেডের নিচের দিকে প্রথমে কোকোমাস দিয়ে খুব আঁটোসাঁটোভাবে পূর্ণ করে ওপরে কোকোডাস্ট দিতে হবে। এ সময়ই প্রয়োজনীয় সব সার নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে দিতে হবে। সার মেশানোর চার থেকে পাচ দিন পর বীজ বোনার উপযুক্ত হয়। বোতল বা টবে একই পদ্ধতি অনুসরণ করে মৌসুম নির্বিশেষে বছরের পর বছর ধরে ফল বা শাকসবজি চাষের সুযোগ দেয় হাইড্রোপোনিক্স। এই পদ্ধতির কৃপায় অনায়াসেই আমরা গ্রীষ্মে, শীতে বা শরত্কালে বর্ষার মৌসুমি ফসল পেতে পারি।

হাইড্রোপোনিক্স উত্পাদকরা তাপমাত্রা, তীব্রতা, আর্দ্রতা, বাতাসের হালকা সংমিশ্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনগুলোর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন। ফলে মড়ক বা অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টির ওপর ব্যবসায়ের লাভ অর্জন নির্ভর করে না। হাইড্রোপোনিক্সের আরেকটি সুবিধা হলো—গাছটি বাড়তে খুব কম পানির প্রয়োজন হয়। উদ্ভিদ সিস্টেম থেকে যেটুকু পানি শোষণ করে, শক্তি তৈরিতে ব্যয়িত অংশটি ব্যতীত বাকিটা সেটআপ মিডিয়ামে ফিরে আসে। গবেষকরা বলেছেন, এ পরিমাণ প্রচলিত পদ্ধতির মাত্র ১০ শতাংশ। এ পদ্ধতিতে কৃষি উত্পাদনে কৃষকদের এটি সেরা পছন্দ হওয়ার আরো একটি কারণ স্বল্পব্যয়ে খাদ্যপ্রাপ্তি। এ পদ্ধতিতে প্রদত্ত আদর্শ সিস্টেমের কারণে, উদ্ভিদ সরবরাহকৃত পুষ্টির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। তাদের মাটিতে স্বল্পপুষ্টি উপাদান সন্ধানে মূল্যবান শক্তি অপচয় করার দরকার নেই। তাছাড়া উদ্ভিদের শক্তি তৈরির রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মাটির অপরিহার্যতার উল্লেখ নেই। এই কারণে উদ্ভিদ তার সমস্ত ফোকাস কেবল ফল বাড়ানোর এবং উত্পাদনের দিকে চালিত করতে পারে। যেহেতু সমস্ত খনিজ এই পদ্ধতিতে পানিতে থাকে তাই আমরা মাটির তুলনায় জলের মিশ্রণের পিএইচ স্তরকে খুব সহজেই পরিমাপ করতে এবং সামঞ্জস্য করতে পারি। এটি উদ্ভিদের অনুকূল পুষ্টি অনুমান নিশ্চিত করে। পরোক্ষভাবে এটি আমাদের পুষ্টি সরবরাহের ব্যয়কে হ্রাস করতে সহায়তা করে। তারা তাদের শক্তিশালী শিকড়ব্যবস্থা গঠন করতে পারায় পোকামাকড় দ্বারা কম আক্রান্ত হয়। ফলে আমাদের পরিষ্কার এবং স্বাস্থ্যকর খাবার পেতে সহায়তা করে। আগাছা ও কীটপতঙ্গ নিরোধ, জল দেওয়া, নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরিচর্যার মতো কাজ না করেও অধিক ফলনপ্রাপ্তি শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলে হাইড্রোপোনিক্সকে একটি শখ হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।

শখ হিসেবে এই পদ্ধতিটি বেছে নেওয়ার আর একটি কারণ হলো—প্রকৃতির সংস্পর্শে থাকার আগ্রহ পূরণ করার জন্য এটি একটি প্রযুক্তিভিত্তিক ধূলিমুক্ত প্রক্রিয়া। হাইড্রোপোনিক্স পদ্ধতিতে বাগান করা একঘেয়ে জীবনকে করে তুলতে পারে রঙিন। সেই সঙ্গে তাজা সুস্বাদু ফল, ফুল এবং ব্যালকনিতে ছোট্ট সবুজ জায়গা এনে দিবে মানসিক প্রশান্তি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়