ইরানের হাল কারা ধরবেন?

আপডেট : ০৭ জুন ২০২১, ২১:৩১

মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশ প্রায়ই আলোচনার শীর্ষে থাকে। পশ্চিমাদের সমর্থনপুষ্ট ইসরাইল এবং পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে খবরের শীর্ষে থাকে ইরান। বস্তুত এ দুটি দেশের মধ্যে অহিনকুল সম্পর্ক বিরাজমান। ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে না। সৌদি আরব ও পশ্চিমাদের কঠোর অবরোধ সত্ত্বেও দেশটির অগ্রযাত্রায় বিরতি আসেনি। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও পশ্চিমাদের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হচ্ছে ইরান। তাই শিয়া অধ্যুষিত এই দেশের আসন্ন নির্বাচন বিশ্বরাজনীতিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগামী ১৮ জুন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশটির ১৩তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তাই মিত্র ও শত্রুদের নজর এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশটিতে। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে পশ্চিমাদের সঙ্গে বোঝাপড়ার সমীকরণেও পরিবর্তন আসতে পারে। ইরানের নির্বাচনে দুই ধরনের প্রার্থীরা জনপ্রিয়তায় এগিয়ে থাকেন—রক্ষণশীল ও সংস্কারপন্থি। সংস্কারপন্থিরা তুলনামূলক উদারচিন্তার। আলোচনায় বিরোধ মেটাতে আগ্রহী। অপর পক্ষে রক্ষণশীলরা পশ্চিমাবিরোধী। তারা পশ্চিমাবিরোধী প্রচারণা করে জনসমর্থন আদায় করতে চেষ্টা করেন। এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে ৫৮৫ জন নাম নিবন্ধন করলেও মাত্র সাত জনকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য বলে অনুমোদন দিয়েছে গার্ডিয়ান কাউন্সিল। যাদের পাঁচজনই রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সংস্কারপন্থিরা দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কিন্তু বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ছিলেন মধ্য সংস্কারপন্থি। ২০১৭ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে পশ্চিমাদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। জেনারেল কাসেম সোলেমানি ও মোহসেন ফখরিজাদে হত্যার প্রতিশোধ না নেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞার কবলে ইরানের অর্থনীতি দুর্বল অবস্থানে রেখে যাওয়ায় ইরানিদের কাছে সংস্কারপন্থিদের সমর্থনে কিছুটা ভাটা পড়েছে। যেহেতু সংবিধান অনুযায়ী দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হলেন ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি, তাই তার পছন্দসই প্রার্থী এবারের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। সাত জন প্রার্থীর মধ্যে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন প্রধান বিচারপতি ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ইব্রাহিম রাইসি। তাকে আয়াতুল্লাহ খামেনির ঘনিষ্ঠজন বা পছন্দের প্রার্থী বলা হয়ে থাকে। এবারের নির্বাচনে আর কোনো শক্তিশালী প্রার্থী না থাকায় তার বিজয়ের সম্ভাবনা ঢের। তিনি রক্ষণশীল নীতির এবং আমেরিকা-ইসরাইলবিরোধী। তার চেয়ে পরিচিত ও জনপ্রিয় প্রার্থী ছিলেন ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। কিন্তু অভিভাবক পরিষদ তার প্রার্থিতা বাতিল করে। ২০০৫ সালে আয়াতুল্লাহ খামেনির সমর্থন নিয়েই প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন তিনি; ২০১৭ সালেও তার প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। তিনি রক্ষণশীল হলেও বেশ কিছু কাজ স্বাধীনভাবেই করতেন। তাই ধর্মীয় নেতা ও প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। মনে করা হয়, এজন্যই তাকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আরেক জন প্রার্থী শক্ত অবস্থানে আছেন; সাবেক আইআরজিসির প্রধান মোহসেন রেজায়ি। তিনিও রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির এবং এবারের নির্বাচনে অন্যতম প্রার্থী। তবে বলা হয়ে থাকে, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার মতামত নির্বাচনে বেশ প্রভাব ফেলে। টানা দুই মেয়াদে সংস্কারপন্থিরা ক্ষমতায় ছিল, তাই এবার রক্ষণশীলদের সম্ভাবনা বেশি। ইরানের জনগণের কাছে ধর্মীয় আর রক্ষণশীলতার চাহিদা রয়েছে। শঙ্কা হলো; ইরানের রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এলে আমেরিকা-ইসরাইলের সঙ্গে বিবাদ মিটবে কি? রুহানি প্রশাসন বারবার শর্তপূর্ণ আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে এলেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। ট্রাম্পের সময় পারেনি এবং বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গেও চুক্তিতে আসতে পারেনি তেহরান। সংস্কারপন্থিরা বিরোধ মেটাতে না পারলেও রক্ষণশীলেরা কি পারবে? কট্টরপন্থিরা সাধারণত প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে থাকে। এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উদারপন্থি সরকার ক্ষমতায় থাকলেও ইসরাইলে নেতানিয়াহু প্রশাসন বেশ রক্ষণশীল। নতুন জোটের প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট আরো কট্টরপন্থি এবং প্রচণ্ড আরববিদ্বেষী। ইরান-ইসরাইলে রক্ষণশীল সরকার ক্ষমতায় থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি সৃষ্টির শঙ্কা অনেক। উপসাগরীয় অঞ্চল উত্তাল হয়ে উঠবে। ইসরাইলের বিরোধিতার দরুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা হয়নি। ভিয়েনা বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি। দুই দেশের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বলছে সমঝোতার পথ কণ্টকাকীর্ণ। তবে বাইডেন প্রশাসন চাইলে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব। আমেরিকার উদারতার কাছে ইসরাইলের বিরোধিতা হেরে যাবে। ইরানে রক্ষণশীলদের বিপরীতে সংস্কারপন্থি প্রার্থী আছেন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মেহের আলিজাদে এবং ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুন নাসের হেম্মাতি। ১৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাদেরও দেখা যেতে পারে। কিন্তু রক্ষণশীলদের তুলনায় তারা খুব বেশি পরিচিত মুখ নন। প্রভাবশালী বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডের সাবেক প্রধান মোহসেন রেজায়ি এবং প্রধান বিচারপতি ইব্রাহিম রাইসি জনপ্রিয়তা ও পরিচিতির দিক থেকে এগিয়ে। প্রকৃতপক্ষে ইরানের আগামীর হাল কারা ধরবেন? রক্ষণশীলেরা, নাকি সংস্কারপন্থীরা—তা দেখতে ১৮ জুন ইরানের জনগণের রায়ের দিকে চোখ রাখতে হবে। তবে রক্ষণশীল ও কট্টর পশ্চিমাবিরোধী প্রার্থী ইবরাহিম রাইসি কিংবা রেজায়ি ক্ষমতায় এলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরো ঘনীভূত হবে। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ইরানের বৈরিতা আরো বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়