১০ মাসে ৯২ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি

আপডেট : ০৭ জুন ২০২১, ২১:৪১

অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ ভাগ বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার

রেজাউল হক কৌশিক

ব্যাংকে আমানত রাখলে যে পরিমাণ সুদ পাওয়া যায়, সঞ্চয়পত্রে তার চেয়ে বেশি লাভ পাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এ খাতেই বেশি ঝুঁকে থাকেন। করোনা মহামারির মধ্যেও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি ঋণ এসেছে ১০ মাসেই। ফলে অর্থবছর শেষে এ খাত থেকে সরকারের ঋণ আরো বাড়বে বলে আশা করছেন সঞ্চয় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

মহামারি ও নানা শর্তের বেড়াজালের পরেও চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস জুলাই থেকে এপ্রিল সময়ে ৯১ হাজার ৯৯০ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে সবশেষ এপ্রিল মাসে এ খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ আসে ১ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। এর আগে মার্চ মাসে নিট ঋণ এসেছিল ৩ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ৩ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা, জানুয়ারিতে ৫ হাজার ২১৫ কোটি টাকা, ডিসেম্বরে ১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা, নভেম্বরে ৩ হাজার ৪০২ কোটি টাকা, অক্টোবরে ৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বরে ৪ হাজার ১৫২ কোটি টাকা, আগস্টে ৩ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা এবং অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৩ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা নিট ঋণ এসেছিল সঞ্চয়পত্র থেকে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪ হাজার ৭২৮ কোটি টাকার বেশি নিট ঋণ করছে সরকার। অথচ গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল আসছে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পেশের সময় চলতি অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটও উপস্থাপন করেন। এ সময় তিনি বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের জন্য ব্যাংক ঋণের লক্ষ্য কমিয়ে সঞ্চয়পত্রের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর কথা বলেন। চলতি অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে ২০ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে সঞ্চয়পত্র থেকে ৩০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এ খাত থেকে সংশোধিত লক্ষ্যের ১৪ দশমিক ৬০ শতাংশ ঋণ করেছে সরকার।

সংশি­ষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে নিট বিক্রি বলা হয়। বিক্রির ঐ অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। এর বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ নিলেও এ ঋণে বেশি সুদ দিতে হয়। তাই সরকার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে জনগণকে নিরুত্সাহিত করতে সময়ে সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। এবারের বাজেটে ২ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র বা পোস্টাল সেভিংস কিনতে হলে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ নিরুত্সাহিত করতে সর্বশেষ ২০১৫ সালের মে মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার গড়ে ২ শতাংশ করে কমানো হয়েছিল। ঐ সুদহারই এখন পর্যন্ত বহাল আছে।

সংশি­ষ্টরা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, ব্যাংকে আমানতের সুদহার কম হওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে সবচেয়ে বেশি ‘নিরাপদ’ মনে করছেন। তাই বিভিন্ন শর্ত পরিপালন করেও সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণ ছাড়াও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ করে থাকে সরকার। তবে সামাজিক সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে সঞ্চয়পত্রে তুলনামূলক বেশি মুনাফা দেয় সরকার। প্রতি মাসের বিক্রি থেকে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর নিট ঋণ হিসাব হয়। এই অর্থ সরকার রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়।

সঞ্চয়পত্র বিক্রির লাগাম টানতে ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে এই খাতের বিনিয়োগে একের পর এক কড়াকড়ি আরোপ করতে থাকে সরকার। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের কড়াকড়ির পরেও কেন বিক্রি বাড়ছে এ বিষয়ে ব্যাংকাররা বলেছেন যে, করনীতি কড়াকড়ি আরোপের পরও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ অনেক বাড়ছে।

বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০১৫ সালের ২৩ মের পর থেকে এই হার কার্যকর রয়েছে। এর আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ছিল ১৩ শতাংশেরও বেশি।