টাকা পাচারকারীদের তালিকা দিন :সংসদে অর্থমন্ত্রী

আপডেট : ০৭ জুন ২০২১, ২১:৪৭

দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ এবং বিএনপির এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। গতকাল সোমবার সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় এবং সম্পূরক বাজেট বিল পাশের প্রক্রিয়ায় তারা একথা বলেন। জবাবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ‘আমি নিজে জানি কীভাবে এগুলো হয়, কারা করে জানি না। অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, ইনএফেকটিভ ম্যানেজমেন্টের জন্য এগুলো হয়। কারা অর্থ পাচার করে, সেই তালিকা আমার কাছে নেই। নামগুলো যদি আপনারা জানেন যে এরা-এরা অর্থ পাচার করেন, আমাদের দিন। তাহলে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমাদের পক্ষে সহজ হবে। দেশের মানুষের কষ্টার্জিত টাকা বিদেশে চলে যাবে, আপনাদের যেমন খারাপ লাগে, আমারও লাগে। আমি অনিয়ম, বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে। এগুলো বন্ধ করতে হবে। বন্ধ হচ্ছেও। অনেকেই জেলে আছেন। বিচার হচ্ছে। আগে যেমন ঢালাওভাবে চলে যেত, এখন তেমন নেই।’

উদাহরণ দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আগে সিমেন্টের নাম করে বালু আসত। একটার নাম করে আসত আরেকটা। আন্ডারইনভয়েসিং, ওভারইনভয়েসিং আগের মতো হয় না। একদম বন্ধ হয়ে গেছে বলা যাবে না। তবে পত্রপত্রিকায় আগের মতো দেখতে পাওয়া যায় না।’

সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা এবং সম্পূরক বাজেট পাশের প্রক্রিয়া হলেও সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যরা মূলত কথা বলেছেন বিদেশে টাকা পাচার এবং পুঁজিবাজার, আর্থিক ও স্বাস্থ্য খাতের নানা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা নিয়ে। জাপার ফখরুল ইমাম, মুজিবুল হক চুন্নু, কাজী ফিরোজ রশীদ, শামীম হায়দার পাটোয়ারী, লিয়াকত হোসেন খোকা ও রওশন আরা মান্নান, বিএনপির হারুনুর রশীদ, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও মোশারফ হোসেন এবং গণফোরামের          মোকাব্বির খান ও স্বতন্ত্র সদস্য রেজাউল করিম বাবলু ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর কথা বলতে গিয়ে বলেছেন বিদেশে টাকা পাচার এবং আর্থিক ও স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম নিয়ে। গতকাল আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দলের অনেকেই ঐতিহাসিক ৬ দফা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ নিয়েই বেশি কথা বলেছেন। ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু ১৩ মিনিটের মধ্যে দুই মিনিটের মতো কথা বলেছেন বাজেট নিয়ে। বাকি ১১ মিনিটের আলোচনায় ছিল ৬০-এর দশক। বিএনপির হারুনুর রশীদকে প্রথম দফায় দুই মিনিট সময় দেওয়া হলে তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা তো মাত্র কয়েক জন। সময় একটু বেশি দেওয়া হোক।’ বিএনপির ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকেও প্রথম দফায় দুই মিনিট সময় দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এটা বেইনসাফি হয়ে যায়। দুটা মিনিট বাড়িয়ে দিন।’ স্পিকার অবশ্য দুই জনকেই দুই মিনিট করে সময় বাড়িয়ে দেন।

আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এক বছরের মধ্যে ১৫টি আইন হবে : অর্থমন্ত্রী

সম্পূরক বাজেট পাশের প্রক্রিয়ার সময় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে ১৫টি আইন দেখতে পারবেন। যাতে এগুলো বন্ধ হয়। আমরা সংস্কারমুখী কাজ করব। নতুন-নতুন আইন করব। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে দায় নিয়ে কাজ করতে পারে, সেব্যবস্থা করে দেব। কোনো টলারেন্স নেই এখানে। টাকা এখন দেশে আসে।

বিদেশে টাকা পাচার, পুঁজিবাজারের অব্যবস্থাপনাসহ বিরোধী দলের সদস্যদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ১২ বছরে ঋণের সুদহার ১২ দশমিক ১ ভাগ থেকে কমে ৭ দশমিক ৩ ভাগ। এখন ব্যাংকের শাখা দ্বিগুণ হয়েছে। চাহিদা বেড়ে গেছে। গ্রামে গ্রামে শাখা হয়েছে। দেশের মানুষ সেবা পাচ্ছে। ২০০৬ সালে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এখন আট শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০৬ সালে টোটাল লোন আউটস্ট্যাডিং ছিল ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা, যা এখন আটগুণ বেড়ে ১১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা হয়েছে।

পুঁজিবাজার কেমন করে বসে গেল: অর্থমন্ত্রী

পুঁজিবাজার নিয়ে সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজার কেমন করে বসে গেল? পুঁজিবাজারে হয়তো লেনদেন নেই। পুঁজিবাজার সম্পর্কে তথ্য রাখেন না, হয়তো সেজন্য আপনারা বলছেন। যদি ডাটা দেখি, যখন ক্ষমতায় আসি তখন পুঁজিবাজারে লেনদেন ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ছিল। তা এখন পাঁচগুণ বেড়েছে। গড় লেনদেন ছিল দৈনিক ২৮ কোটি টাকা, যা এখন ৩০ গুণ বেড়েছে। তাহলে ধসে গেল কেমন করে?

কানাডা, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় দুদকের অফিস খুলুন: ফিরোজ রশীদ।

জাপার কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, এক ব্যাংকের পরিচালক আরেক ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। হুন্ডির মাধ্যমেও বিদেশে টাকা পাঠানো হচ্ছে। আদালত একটি তালিকা চেয়েছিলেন কারা বিদেশে বাড়ি বানিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এখনো তা দিতে পারেনি। কানাডা, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এসব দেশে দুদকের একটি করে অফিস খুলুন। তাহলেই দেখা যাবে কে কত টাকা নিয়েছে। পি কে হালদার এত টাকা নিল! ৯ মিনিটের জন্য পি কে হালদারকে ধরতে পারেননি। তাহলে কেন ৯ ঘণ্টা আগে ধরলেন না?

ছাঁটাই প্রস্তাব তোলার সময় ফিরোজ রশীদ বলেন, আর্থিক খাতে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্ব সঠিক, কর্তৃত্ব দুর্বল। ব্যাংকে কর্তৃত্ব নেই। কর্তৃত্ব না থাকলে অবাধে এসব হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক অডিট করলে চুরি করার সুযোগ থাকে না। অর্থমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ে বসে কী করবেন? দোষ হয় মন্ত্রীর। অডিট করলে টাকা পাচার হয় না। জাপার রওশন আরা মান্নান বলেন, ব্যাংকিং খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান নির্যাতিত এতিমদের মতো। দেখার কেউ নেই। লুটপাট হচ্ছে। দুর্নীতি হচ্ছে। কিছুই হয় না। শাস্তি হয় না।

বছরে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি পাচার হয়: রুমিন ফারহানা

বিএনপির এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, আমজনতার আমানতের টাকা থাকে ব্যাংকে। এ থেকে এমনভাবে টাকা নিয়ে যায় একশ্রেণির লোক, নেওয়ার সময়ই তারা জানেন যে টাকা ফেরত দিতে হবে না। বছরে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি পাচার হয়ে যায় বিদেশে। এগুলো যায় ওভারইনভয়েসিং ও আন্ডারইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। এর বাইরে হুন্ডির পরিমাণ ধরলে কত যায় আল্লাহ মাবুদই জানেন।

ছাঁটাই প্রস্তাব তোলার সময় রুমিন ফারহানা বলেন, যখনই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে, শেয়ারবাজার শুয়ে পড়ে। ’৯৬ সালে, ২০০৯ সালে শুয়ে পড়ল। তত্কালীন অর্থমন্ত্রী বললেন—তিনি শেয়ারবাজার বোঝেন না। শেয়ারবাজার ফটকা বাজার। সেই অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট কথা বলতেন, দলের বিপক্ষে গেলেও বলতেন। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে পরিবারের হাতে ব্যাংক তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জনগণের টাকা হরিলুট হচ্ছে। সংসদে ঋণ খেলাপির তালিকা দেওয়া হল, ৩০০ জন। তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো?

নিম্নমানের বিটুমিন আসছে, সরষের বীজের নামে এসেছে কফির বীজ: বিএনপির হারুন।

অর্থমন্ত্রীর জবাবের পর বিএনপির এমপি হারুনুর রশীদ বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সিল লাগানো নিম্নমানের বিটুমিন আসার তথ্য পেয়েছি। সরষের বীজের নামে এসেছে কফির বীজ। এছাড়া চীন থেকে এসেছে পাথরবোঝাই কনটেইনার। এ ধরনের আরো ঘটনা রয়েছে।

ছাঁটাই প্রস্তাব তোলার সময় হারুন বলেন, স্কুলে অঙ্কে ভালো ছাত্র ছিলাম। শিক্ষকরা আদর করতেন। কিন্তু বাজেটের অঙ্কের হিসাব মেলাতে পারছি না। ঘাটতি কোথায়? কোথা থেকে টাকা আনবে? প্রবৃদ্ধির কথা বলছি। করোনাকালীন সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে করোনা নিয়ন্ত্রণে। না হলে প্রবাস আয়, গার্মেন্ট খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রবৃদ্ধির জন্য লাফাচ্ছি। সূচের ফুঁটো দিলে বেলুনের মতো চুপসে যাবে। করোনা নিয়ন্ত্রণ না করলে ভয়ানক ধস নামবে।