হাড়ভাঙা পরিশ্রমে সাজানো ঘরগুলো মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপ

আপডেট : ০৭ জুন ২০২১, ২১:৫৫

দিনের পর দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের টাকায় সাজানো ঘর হারিয়ে রফিকুল এখন নির্বাক। কোথায় থাকবেন, সন্তানদের মুখে কীভাবে খাবার তুলে দেবেন, এমন সব চিন্তা তাকে ঘিরে ধরেছে। ঘরে নগদ পাঁচ হাজার টাকা ছিল। তা-ও পুড়ে ছাই। হাতে একটি পয়সা না থাকায় কিছুই ভাবতে পারছেন না রংপুরের রফিকুল। আগুনে পুড়ে গেছে মহাখালীর সাততলা বস্তির বাসিন্দা রিকশাচালক রফিকুল ইসলামের ভাড়া করা ঘর। যে ঘরে ছিল একটি খাট, একটি টিভি, একটি ফ্রিজসহ সংসারের আরো অনেক কিছু। আগুন যখন দাউ দাউ করে জ্বলছিল, তখন চিত্কার শুনে ঘুম থেকে উঠে পড়েন তিনি। একমুহূর্ত দেরি না করে দুই ছেলে সুমন আর সজীব এবং স্ত্রীকে নিয়ে দৌঁড়ে চলে যান রাস্তায়। ঘণ্টা তিনেক পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে ঘরের সামনে এসে দেখেন সবকিছু পুড়ে ছাই। রফিকুল বলেন, ‘আমার ঘরের একটা জিনিসও নিতে পারিনি। গায়ে একটা গেঞ্জি ছিল। সে অবস্থায় বেরিয়ে গেছি। রিকশা চালিয়ে যা জিনিস কিনছিলাম, সব পুড়ে ছাই।

শুধু রফিকুল নয়, তার মতো সাততলা বস্তির আরো বহু মানুষ তিন ঘণ্টার ব্যবধানে পথে বসে গেছেন। মহাখালীর সাততলা বস্তিতে আগুন লাগে গতকাল সোমবার ভোর রাত ৪টায়। ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট চেষ্টা চালিয়ে ৭টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে কেউ মারা না গেলেও পুড়েছে কয়েক শ ঘর। ভোর রাতে আগুন থেকে বাঁচতে যে যেভাবে পেরেছেন ঘর ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। আবার যখন আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে, তখন ছুটে আসেন নিজের ঘরটি কী অবস্থায় আছে তা দেখতে। আগুনে এতটাই পুড়েছে যে, অনেকে তার নিজের ঘরও চিনতে পারছিলেন না। সেখানে ছিল শুধুই আহাজারি।

পোড়া ঘরে বই খুঁজছে স্মৃতি :অনেক চেষ্টা করেও আগুন থেকে নিজের পাঠ্যবই রক্ষা করতে পারেনি সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার স্মৃতি। আগুনে পুড়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খুঁজছে সে তার প্রিয় বই-খাতার পোড়া অংশ। স্মৃতি সাততলা বস্তির বাসিন্দা। মা-বাবা ও দুই ভাইবোনের সঙ্গে বস্তির একটি ঘরে থাকত স্মৃতি। তার বাবা শহিদুল ইসলাম একজন হকার। রবিবার রাতেও পড়াশোনা শেষে বইগুলো যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছিল সে। আগুনের লেলিহান শিখা প্রথম চোখে পড়ে স্মৃতির বাবার।  

ফাতেমা আক্তার স্মৃতির সঙ্গে কথা হলে সে জানায়, পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়েছিল। বর্তমানে মহাখালী আমতলী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে সে। স্মৃতির বাবা শহিদুল ইসলাম জানান, তিনি আগে রিকশা চালাতেন। এখন হকার। গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধায়। পরিবারে পাঁচ সদস্য। বড় মেয়ে স্মৃতি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। স্মৃতির ছোট একটা বোন আছে। নাম সোহাগি আক্তার। বয়স ৯ বছর। সেও তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।  

অবলা পাখি দুটির মৃত্যুতে আক্ষেপ সালমার :সকাল সাড়ে ৭টার দিকে শহিদুল ইসলাম নিজের ঘরে এসে দেখেন, সব পুড়ে গেছে। ঘরে ছিল স্ত্রীর কানের দুল, হাতের বালা। পোড়া ঘরের জিনিসপত্রের ভেতর সেগুলো খুঁজছিলেন। হঠাত্ করে তার চোখ যায় পোষা পাখির খাঁচার দিকে। আগুন লাগলে নিজেরা বের হয়ে গেলেও পাখির কথা ভুলে গিয়েছিলেন। শহিদুল দেখতে পান, পাখি দুটি আগুনে পুড়ে গেছে। শহিদুলের স্ত্রী সালমা খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের সবকিছু তো আগুনে পুড়ে গেছে। অবলা পাখি দুটিও মারা গেল।’

‘নাতি দুইডারে বাঁচাইতে গিয়া কিছু লইতে পারি নাই, সব ছাই হইয়া গেছে’ : ‘ধার কইরা ৪০ হাজার টাকার মাল (কাপড়) কিনছিলাম। সব পুইড়া গেছে। ঘরে ২০ হাজার টাকা, কাপড়, আমার, বউয়ের (ছেলের বউ) সোনার গয়না, ঘরের মালপত্র সব আগুনে পুইড়া গেছে। নাতি দুইডারে বাঁচাইতে গিয়ে কিছুই লইতে পারি নাই। আমার আর কিছুই নাই। এহন আমি কী করমু, কীভাবে দিন যাইব?’ সোমবার দুপুরে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন বৃদ্ধা রানী বেগম। রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তিতে লাগা ভয়াবহ আগুনে তার সব সম্বল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে গোছানো অর্থ ও প্রয়োজনীয় মালামাল ছাই করে দিয়েছে আগুন। 

কেন বারবার আগুন লাগে এই সাততলা বস্তিতে :গতকাল সরেজমিনে ঐ বস্তিতে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাস্থ্য বিভাগের এই জমি যখন যে ক্ষমতায় থাকে, তারা দখল করে ভাড়া দেয়। এর সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও আছেন। দখলের হাতবদলের জন্যও মাঝে মধ্যে পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত বিদ্যুত্ ও গ্যাসের সংযোগের কারণেও আগুন লাগে।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ১৮টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে। বস্তিতে অবৈধভাবে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। গ্যাস সংযোগ থেকেই এবার আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্তের বাইরে স্পষ্ট করে বলা যাবে না।

ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটি :সাততলা বস্তির আগুনের ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক নুর হাসানকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা সবকিছু তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেবেন। এক প্রশ্নের জবাবে ফায়ারের ডিজি বলেন, প্রায় শতাধিক ঘর পুড়ে গেছে। দুয়েক জন সামান্য আহত হলেও বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে বস্তিবাসীর দাবি, অন্তত হাজার খানেক ঘর পুড়ে গেছে। ঘরের আসবাব কেউ নিয়ে বের হতে পারেনি। সব পুড়ে ছাই হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ৫ হাজার টাকা ও খাবার দেবে ডিএনসিসি :আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক পরিবারের জন্য নগদ ৫ হাজার করে টাকা, তিন বেলা খাবার, ঢেউটিন এবং প্রায় ২ হাজার টাকার শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। গতকাল সোমবার দুপুরে সরেজমিনে পরিদর্শনকালে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কেউই অভুক্ত থাকবে না, তাদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।