করোনায় আক্রান্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওযায় স্বাভাবিক কারণেই এই হাসপাতালে করোনা রোগী আগের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় ভর্তি হতে আসছে। তবে শয্যা সংকট ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে সব রোগীকে ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। এখানকার চিকিত্সকরা বলছেন, শুধু অক্সিজেনের স্যাচুরেশন যাদের কম কেবল তারাই হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন। তারপর এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ১০ জন রোগী মারা যাচ্ছেন। গত এক সপ্তাহে এখানকার করোনা ইউনিটে ৬০ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ জনের করোনা পজিটিভ ও বাকিদের উপসর্গ ছিল। আর গত রবিবার সকাল থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ইউনিটে আরো সাত জনের মৃত্যু হয়েছে যাদের সবাই করোনায় আক্রান্ত ছিলেন।
চিকিত্সকরা আরো বলছেন, অনেক সময় ভর্তি করিয়ে চিকিত্সা শুরুর পরপরই রোগীরা মারা যাচ্ছে। রোগীকে অক্সিজেন দিয়েও লাভ হচ্ছে না। কোনো কোনো রোগীর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) যাওয়ার মতো সৌভাগ্য হলেও বাঁচতে পারছেন না। কয়েক দিনে রামেক হাসপাতালের আইসিইউতে মারা গেছেন অন্তত ১৫ জন। তারা সবাই তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন।
হাসপাতালটির নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) প্রধান অধ্যাপক ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘রোগী ভর্তির তো একটা লিমিট আছে! জায়গা নেই, চিকিত্সার উপকরণ নেই, রোগী ভর্তি করে কী হবে? মহামারি যাতে না ছড়ায় সে জন্য সবার আগে প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রয়োজন। লকডাউন যদি না দিতে পারে, রোগীর সংখ্যা না কমাতে পারলে লাভ হবে না। পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে।’
রামেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস জানান, গতকাল সোমবার সকাল পর্যন্ত এ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ২৩২ জন করোনা রোগী। এর মধ্যে আইসিউতে ১৮ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হয়েছেন আরো ২০ জন। এর মধ্যে রাজশাহীর ১৬, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৩ ও নওগাঁর ১ জন।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, রামেক হাসপাতাল ছাড়া রাজশাহীতে আর কোনো হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা নেই। তাই সব রোগীর চাপ রামেক হাসপাতালে। রাজশাহী বিভাগ ছাড়াও খুলনা বিভাগের রোগীরাও এখানে আসছেন চিকিত্সা নিতে। এখানে জায়গা সংকুলানই বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, রামেক হাসপাতালে করোনা চিকিত্সার শয্যা বাড়লেও সংকুচিত হচ্ছে অক্সিজেনসহ অন্য জটিল রোগীর সেবা। তাই সদর হাসপাতাল চালু করা গেলে রামেক হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ড সেখানে স্থানান্তর করা যাবে। তখন রামেক হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ড আরো সম্প্রসারণ করা যাবে। এ অবস্থায় রামেক হাসপাতালে ২০ হাজার লিটার লিকুইড অক্সিজেন ধারণক্ষমতার আরেকটি অক্সিজেন সিলিন্ডার বসানোর প্রস্তুতি চলছে।
প্রসঙ্গত, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে রাজশাহীতে প্রতিদিন বিকাল ৫টার মধ্যে শহরের সব দোকানপাট, শপিংমল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এমনকি ফুটপাতের দোকানও বন্ধ করে দিয়ে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তবে চিকিত্সক ও স্থানীয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর জোট ১৪ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দ জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো রাজশাহীতেও কঠোর লকডাউন দাবি করেছিলেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষের কথা বিবেচনা করে কঠোর লকডাউন দেওয়া হয়নি বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন রাজশাহী সিটি মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। তিনি বলেছেন, জীবনের যেমন প্রয়োজন, জীবীকারও তেমনি প্রয়োজন রয়েছে।
উল্লেখ্য, করোনার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে চাঁপাইনবাবগঞ্জে দুই সপ্তাহের আঞ্চলিক লকডাউন চলছে। সীমান্তবর্তী এই জেলায় শনাক্ত করোনা রোগীদের ৯৩ শতাংশই ভারতীয় ধরন বহন করছে। ঝুঁকিতে থাকা নওগাঁয়ও আঞ্চলিক লকডাউন শুরু হয়েছে।
