ফরিদুর রহমান
বাড়িটা ছাড়া দরকার হয়ে পড়েছিল। মেয়ের স্কুল কাছে বলে এতোদিন ছাড়ার কথা ভাবিনি। এখন আর নিচের তলায় স্যাঁতসেঁতে আলো-বাতাসহীন অন্ধকারে থাকতে চাই না। মেয়ের পরীক্ষা শেষ হবার সাথে সাথেই অফিসের কবির হোসেনকে বলে রেখেছি। কবির চাকরির সাথে বাড়ির দালালিও করে। সে দুটো বাড়ি দেখিয়েছে, একটাও পছন্দ হয়নি।
নতুন বাসা পুরোনো ঢাকার দিকে হলেই ভালো। আমার অফিস একটু দূরে হলেও স্ত্রী যে কলেজে পড়ায় সেটা কাছে হবে। এবারে কবির নতুন যে বাড়ির খবর এনেছে সেটি নাজিমউদ্দিন রোডে জেলখানার কাছাকাছি। ছয়তলা আধুনিক ফ্লাট, লিফট আছে। কবিরের টেলিফোন পেয়েও ইতস্তত করছিলাম। শখ করে কেন্দ্রীয় কারাগারের কাছে থাকা মানে প্রতিদিন চোর-ছ্যাঁচ্চড় বা দাগি আসামিদের সাথে দেখা-সাক্ষাত্ হয়ে যেতে পারে। গাড়ি ভরে বন্দিদের আদালতে নিয়ে যাওয়া-আসা তো চলতেই থাকে প্রতিদিন। মাঝে মধ্যে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হলে জেলখানার রাস্তার ভিড় লেগে যায়।
আমার আপত্তি থাকলেও স্ত্রী বলল, ‘দেখে আসতে তো ক্ষতি নেই, পছন্দ হয়েও যেতে পারে।’
অফিসের গাড়ি নিয়ে জ্যাম ঠেলে ঠিকানামতো পৌঁছলাম। ড্রাইভার পথে বিরক্ত হলেও নতুন বাড়িতে গাড়ি রাখার জায়গা আছে দেখে খুশি হলো। আগে বাসায় গাড়ি রাখতে হতো রাস্তায়।
বাড়ির মালিক ঢাকার আদি বাসিন্দা। পৈত্রিক একতলা বাড়ি ভেঙে নতুন অ্যাপার্টমেন্ট তুলেছেন সম্প্রতি। তাঁর নাম সফর আলী হলেও জীবনে সফর তো দূরে থাক, ঢাকা শহরের বাইরে কখনো যাননি। এমন মানুষ এখনো এই শহরে আছে ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল। প্রসঙ্গক্রমে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না?’
‘নিয়ত করছি একবার আল্লা-রাসুলের দেশ থিকা ঘুইর্যা আসুম। দেখি হালায় আল্লায় যুদি নেয়।’ সফর আলীর উত্তর।
বাড়ির শুধু ঘর-দরজা নয়, ছাদে উঠে দেখলাম অসংখ্য দালানকোঠার ফাঁকে বুড়িগঙ্গা দেখা যায়। ইচ্ছে করলে হেঁটেই যাওয়া যাবে নদীর তীরে। জেলাখানার ভেতরটাও বেশ চোখে পড়ে। দূর থেকে পোশাকের পার্থক্য ছাড়া বন্দিদের চলাফেরায় সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা করা যায় না। আমার মনে হলো, ভালোই তো! বিকেলে তেমন কাজ না থাকলে সন্ধ্যায় লক-আপের আগে পর্যন্ত কয়েদিদের জীবন যাপনের খানিকটা দেখে নেয়া যাবে। আর সকালে দিন শুরুর আগে দেখা যাবে প্রবহমান নদীর দৃশ্যাবলি।
‘নতুন বাড়ি, ভাড়া বহুত কম রাখছি। তাও দেহেন দুই মাস পইড়া রইছে, মাইনষে লইতে চায় না।’
‘কেন সমস্যাটা কী? আপনার বাড়ি তো মোটেও খারাপ বলা যাবে না।’
‘ডরায়, বোঝলেন না, জেলখানার কাছে থাকবার সাহসে কুলায় না। কী জানি হালায় কে কুনদিন আবার ধইরা জেলখানায় ভইরা দেয়।’
‘না না অকারণে কাউকে ধরে জেলখানায় ভরে দেবে কেন!’ ‘মাইনষে যেমতে বোঝে আর কী, আমারে কয় বাড়িয়ালা! আবে হালায়, আমি কিয়ের বাড়িয়ালা! আইজ বাদে কাল আজিমপুরে ফালাইয়া থুইয়া আইলে হাড়হাড্ডির খবর থাকবো না।’
আমি তাঁর কথার কোনো উত্তর দিই না। সফর আলী বলতে থাকেন, ‘আসল বাড়িয়ালা হইলো গিয়া সেই একজন। হের লগে কুনু ভোগলাবাজি চলতো না।’ সফর আলী কথার সাথে উপরের দিকে আঙুল তুলে দেখান। ছাদ থেকে নেমে আমরা ছয়তলায় লিফটের সামনে এসে দাঁড়াই। সফর আলী তাঁর শেষ কথাটা বলেন নিচে নেমে।
‘ডরাইয়া লাভ নাই, আসলে আমরা ভি একখান জেলখানার মইধ্যে আছি। এই দুইন্যাডাই হালায় বড় এউগগা জেলখানা।’
পুরোনো ঢাকার সফর আলীর মুখে দার্শনিকের মতো কথা শুনে আমি চমত্কৃত হই। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। গাড়িতে উঠেই কবির হোসেনকে ফোন করে জানিয়ে দিই, বাড়িটা পছন্দ হয়েছে।
