‘হাতের মুঠোয় ভূমিসেবা’র সহজীকরণ সহজ নহে

আপডেট : ০৮ জুন ২০২১, ২১:০৯

দেশে ভূমিসংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমা ও হয়রানি ব্যাপক মাত্রায় রহিয়াছে। ইহার অবসান চাহিতেছে সরকার। ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করিবার মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছাইয়া দেওয়ার উদ্যোগ আরো তিন বত্সর পূর্বেই গ্রহণ করিয়াছে সরকার। ইতিমধ্যে অনলাইনভিত্তিক ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার পাইলটিং কার্যক্রম উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশের ৬১টি জেলার ৪৮২টি পৌর বা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের এক বা একাধিক মৌজায় অনলাইনে কর প্রদানের ব্যবস্থাও চালু হইয়াছে। বলা হইতেছে, সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে ‘হাতের মুঠোয় ভূমিসেবা’ দেওয়া হইবে। এইভাবে উপমহাদেশে কালেক্টরেট ব্যবস্থার গোড়াপত্তনের প্রায় ২৪৭ বত্সর পর ভূমি উন্নয়ন কর তথা জমির খাজনা গ্রহণের সিস্টেমও বদলাইয়া যাইবে।

আমাদের দেশে জায়গার তুলনায় মানুষের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত অধিক। সেই কারণে বাংলাদেশে যত মামলা হয় তাহার সিংহভাগই ভূমিসংক্রান্ত। এই সকল দেওয়ানি মামলা সহজ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য গত বত্সরই ‘সিভিল স্যুট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ স্থাপনের উদ্যোগ লওয়া হইয়াছে। এমনকি ভূমির শ্রেণি ১ হাজার ১২৪টি হইতে কমাইয়া মাত্র ১৬টি করা হইয়াছে, যাহাতে ভূমির শ্রেণি-জটিলতার জন্য মানুষকে হয়রানির শিকার হইতে না হয়। এই সংক্রান্ত পরিপত্রও জারি হইয়াছে ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি। বর্তমানে ‘জমি যার রেকর্ড তার’—এমন সহজীকরণের জন্য ডিজিটাইলাইজেশনের কাজ দ্রুত গতিতে আগাইয়া যাইতেছে। অনলাইনে জমির দাগ, খতিয়ান উল্লেখ করিলেই মালিকের তথ্য চলিয়া আসিবে। সবচাইতে বড় পরিবর্তন হইতেছে—সকল ধরনের সেবা অনলাইনেই পাওয়া যাইবে। সরকার আশা করিতেছে, ইহার মাধ্যমে ভূমি অফিসের অবৈধ লেনদেনের বদনাম ঘুচিবে এবং বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিক পৃথিবীর যে কোনো স্থান হইতে ভূমিকর প্রদান করিতে পারিবেন। এমনকি জমির ক্রয়-বিক্রয়ের সর্বশেষ অবস্থা জানিতে পারিবেন। তাহার জমির নামজারি ঠিক আছে কি না—তাহাও দেখিতে পারিবেন। সরকার নূতন সকল নামজারির তথ্য সংগ্রহ করিতেছে। ইতিমধ্যে ৪ কোটি ৭৬ লক্ষ পর্চার তথ্য সংগ্রহে রহিয়াছে।

সরকারের এই উদ্যোগের প্রশংসা করিতেই হয়। জমি বেচাকিনা, রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, জমির খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, খাস বা পরিত্যক্ত জমি, পুকুর বা হাটবাজারের ইজারা, ওয়ারিশান জমি হস্তান্তর, জমি বন্ধক—কোনো কিছুতেই সত্যিই তো সরকারের ভাষ্যমতো আর ভোগান্তি না থাকে—তবে তাহা সরকারি সেবা কার্যক্রমে সবচাইতে বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসিবে নিঃসন্দেহে। তবে আমাদের দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো অশিক্ষিত বিধায় তাহাদের নিকট ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থা কতখানি সহজে সেবাবান্ধব করা যাইবে—ইহার উপর সর্বাগ্রে গুরুত্বারোপ করিতে হইবে। ডিজিটাল করা হইল, কিংবা প্রক্রিয়া জটিল রহিয়া গেল—এমনটি হইলে ভূমিসেবা প্রক্রিয়া তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের জন্য আরো কঠিন হইয়া যাইতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল—ভূমি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভূমি জরিপ ও নিবন্ধন ডিজিটালকরণের যেই সকল প্রকল্প নেওয়া হইয়াছে, ইহাতে ভূমি-সংক্রান্ত অনিয়ম-দুর্নীতি পুরাপুরি হ্রাস পাইবে না। কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে জমির পুরাতন কাগুজে রেকর্ডপত্র স্ক্যান করিয়া রাখিলেই সার্বিকভাবে ইহার সুফল জনগণ পাইবে না। এই ক্ষেত্রে, ডিজিটাল পদ্ধতির সুফল পাইতে হইলে ভূমির রেকর্ডপত্রসহ সকল ধরনের তথ্যাদি কম্পিউটারাইজড করিতে হইবে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরিয়া চলমান ভূমির রেকর্ডপত্র সংরক্ষণ, রেজিস্ট্রেশন, নকশা প্রণয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে জাল-জালিয়াতির ফলে ভূমি লইয়া হরেক ধরনের বিরোধ রহিয়াছে। তাহা বৃদ্ধিও পাইতেছে প্রতিনিয়ত। আর এই সকল বিরোধের জের ধরিয়াই চলে এই খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি। মনে রাখিতে হইবে, সাধারণ মানুষের নিকট অসম্ভব মূল্যবান তাহার একখণ্ড জমি। সাধারণ মানুষের বিপুল একটি অংশের যেহেতু কম্পিউটার-সংক্রান্ত ব্যাবহারিক জ্ঞান নাই বলিলেই চলে, সুতরাং এই সেবা এমনই সহজ ও ব্যবহারবান্ধব করিতে হইবে, যাহাতে ইহার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত না হয়।