বিশ্বের সুবিধাভোগী যারা

আপডেট : ০৮ জুন ২০২১, ২১:১১

 ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ অনেক পুরোনো একটা বাংলা প্রবচন; কালের ধুলায় সে মোটেই মলিন হয়নি, উলটো অতিব্যবহারে ক্রমাগত উজ্জ্বল ও ধারালো হয়ে উঠেছে। এটি বাজারের কথা। বাজারে যিনি দোকান খুলেছেন, তিনি একজন ব্যবসায়ী, পণ্য বিক্রি করছেন মুনাফার জন্য, তার চেষ্টা ক্রেতাকে যতটা পারা যায় ঠকাবেন, পারলে তেলে ভেজাল মেশাবেন। তার কাজ ও নীতি দুটোই পুঁজিবাদী। পুঁজিবাদ যত শক্তিশালী হয়েছে, ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ নীতি ততই বিস্তৃত ও বলশালী হয়েছে। এখন তো বিশ্বময় তার একচ্ছত্র আধিপত্য। কোথায় সে নেই? যেমন স্বাধীনতার পর শোনা সেই আপাতমর্মস্পর্শী ও জনপ্রিয় গানটি : ‘একসাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না।’ সেখানেও ঐ কেনাবেচার কথা, আসলে যেটা কোনোভাবেই সত্য নয়। শহিদেরা স্বাধীনতা এনেছেন হানাদারদের পরাভূত করে; রক্তের ‘বিনিময়ে’ তারা স্বাধীনতা কিনে এনে আমাদের উপহার দেননি। যুদ্ধটা ছিল জনগণের, তাতে আমরা সবাই ছিলাম, শহিদেরা ছিলেন আমাদেরই অগ্রবর্তী অংশ। যুদ্ধক্ষেত্র দরকষাকষির বাজার নয়, জয়-পরাজয়ের রণক্ষেত্র বটে।

এই বাজারি কারবার এখন বিশ্বের সর্বত্র। আর সে কারণেই বিশ্বের এখন ত্রাহি ত্রাহি দশা। ঐ নীতির বিপরীতে পালটা আওয়াজও আছে। আমাদের এই বাংলাদেশেই উঠেছে সেই আওয়াজ। তুলেছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আওয়াজটা হলো, ‘কেউ খাবে আর কেউ খাবে না, তা হবে না তা হবে না’। এটা পুঁজিবাদের দ্বারা নিপীড়িত বিশ্ববাসী সবারই মনের কথা, বিশ্বজনীন প্রবচনে পরিণত হতে পারত। হয়নি। কারণ বাংলাদেশ একটি প্রান্তিক দেশ এবং অবশ্যই হতদরিদ্র। এখানকার আওয়াজ বিশ্বময় পৌঁছায় না। পুঁজিবাদ তার বিরোধী আওয়াজগুলো শুনতেও চায় না, কণ্ঠ রোধ করে। তবে বাংলাদেশ দরিদ্র বটে, কিন্তু পুঁজিবাদী সে ঠিকই। বিপদে পড়লে অনেক সময় খাঁটি কথা বের হয়ে আসে বৈকি। প্রাণের টানে। মনুষ্যত্ব ও মনুষ্যসমাজ সম্বন্ধে আমরা অতিউচ্চ ধারণা পোষণ করতাম। আমরা বিশ্বের সুবিধাভোগীরা এবং তাদের প্রভাবে পড়ে সুবিধাবঞ্চিতরাও। সত্য হয়ে ফুটে উঠেছে আত্মস্বার্থকেন্দ্রিকতা ও লোলুপতা। ওগুলো অবশ্য ছিল, যতই সভ্য হওয়ার চেষ্টা করুক, মানুষ তো প্রাণীই বটে, প্রাণিজগতেরই এক সদস্য; আত্মস্বার্থকেন্দ্রিকতা ও ভোগলিপ্সা তো তার থাকবেই, আর ওগুলো জয় করেই তো সভ্যতার অগ্রগতি। কিন্তু জয় করা যে মোটেই সম্ভব হয়নি, করোনা এসে এক নিমেষে সেই খাঁটি সত্যটাই উন্মোচিত করে দিল। বলল, বাঁচতে হলে পালাও, গুহার ভেতরে ঢোকো। অন্যের সঙ্গে মিলবে না। দূরে দূরে থাকবে। মনে করবে সবাই তোমার শত্রু। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলো। শারীরিক দূরত্বকে যে সামাজিক দূরত্ব বলা হচ্ছে, এটা নিতান্ত আপতিক নয়, ঘটনা আসলে সামাজিক দূরত্বই।

করোনা একটা ভয়াবহ রোগ, তার হাত থেকে বিশ্বকে বাঁচাতে হবে, সে জন্য সমবায়ী উদ্যোগে টিকা আবিষ্কার চাই। সমবায়ী প্রচেষ্টায় টিকা তৈরির কথা বলা হচ্ছে বটে, কিন্তু এখনো তা হয়নি, বরং কাজটা চলছে বিচ্ছিন্নভাবে এবং কেউ কেউ তা থেকে মুনাফা লোটার মনোবাসনাও পোষণ করছে! আসল ব্যাধি তো করোনা নয়, সেটির নাম তো পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদের যেটা আসল স্বভাব—উন্নত করার নাম করে মানুষকে মারার ব্যবস্থা করা, সেটাই করছে। সে জন্যই বলা দরকার যে ঐক্য চাই কেবল করোনাকে নয়, পুঁজিবাদকে পরাভূত করার লক্ষ্যেও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিপূর্বে (ডব্লিউএইচও) আওয়াজ দিয়েছে যে, বিশ্বের জন্য করোনার চাইতেও বড় বিপদ হচ্ছে করোনাকে মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় নেতৃত্ব ও ঐক্যের অভাব। তাদেরও ঐ একই কথা, ঐক্য চাই টিকা ও চিকিত্সার সুব্যবস্থা করার জন্য। বলবে না, বলতে পারবে না যে, নেতৃত্ব ও ঐক্য চাই কেবল করোনাকে রোখার জন্য নয়, ঐক্য চাই করোনার যে আস্তানা, তাকে ভেঙে ফেলার জন্যই। ডব্লিউএইচও বাড়াবাড়ি করলে অন্য পুঁজিবাদীরাও তার ওপর ঐভাবেই হামলে পড়বে। সব শেয়ালের একই রা।

এই দুনিয়াতে এখন কোটিপতির সংখ্যা ১০০-২০০ নয়,  ৩ হাজারের কাছাকাছি। তাদের মধ্যে সেরাদের একজন হচ্ছেন বিল গেটস। দাতব্যের জন্যও তিনি বিখ্যাত। করোনা মোকাবিলার ব্যাপারে তিনিও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতোই উদ্বিগ্ন। প্রবন্ধ লিখে পরামর্শ দিয়েছেন। তার লেখা দুটি প্রবন্ধ দেখলাম। তিনি মহাজন, তার বক্তব্য তাই বিশ্ব জুড়ে প্রচার পেয়েছে। বিল গেটস সাহেব সুপ্রসিদ্ধ জ্ঞানী, তিনি সবই জানেন। এই মহাসংকটের সময়ে তিনি কেবল পরামর্শই দেননি, চিকিত্সা ও ত্রাণের জন্য দানও করেছেন, যদিও দানের পরিমাণ খুবই সামান্য। তার মোট সম্পদের ১০০ ভাগের এক ভাগও নয়, শূন্য দশমিক ২৮ (০.২৮) শতাংশ মাত্র। আমরা নিশ্চিত নই যে কোনটি অধিক মূল্যবান—তার দান, নাকি তার উপদেশ। অবশ্য উপদেশও একধরনের দান বটে। তবু তিনি যা হোক হাত উপুড় করেছেন, অন্য ধনীরা সেটাও করেননি। কারোনায় আক্রান্ত বিশ্বে মন্দা দেখা দিয়েছে, যেটা স্বাভাবিক। এই মহামন্দার মধ্যেও কিন্তু কোটিপতিদের ধনস্ফীতি বসে থাকেনি; সেটা বরং বাড়ছেই। এটাও স্বাভাবিক। কারণ শ্রম আরও সস্তা হচ্ছে, বিপন্ন মানুষ তাদের সম্পদ বলতে যা আছে তা বিক্রি করে দিচ্ছে, দরকষাকষি যে করবে সেই সক্ষমতাটুকু পুরোপুরি হারিয়ে ফেলছে। সবকিছুই চলে যাচ্ছে এবং যাবে ধনীদের হাতে। এমনকি ওষুধ এবং চিকিত্সাও তাদেরই করতলগত। তারাই শাসক। তাদের থামায় এমন কেউ নেই। আর তারা নিজেরা যদি থামতেই শিখত, তাহলে তো অত বড় ধনকুবেরই হতো না। তাদের স্ফীতি রোখে কে!

মানুষ কিন্তু দিচ্ছে, মেহনতি মানুষের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান যে বস্তু, সেই প্রাণটিই দিয়ে দিচ্ছে। দিতে বাধ্য হচ্ছে। হ্যাঁ, ধনীরাও আক্রান্ত হচ্ছে বৈকি। ব্রাজিলে আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কোনো কিছু চালু আছে কি না জানি না; না থাকলেও স্বৈরশাসন যে রয়েছে, সে নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। করোনায় মৃত ব্রাজিলের মানুষও সাক্ষী দেবে, যদি তাদের ডাক পড়ে, যে তাদের মৃত্যুর জন্য দেশের স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট সাহেবই দায়ী। জার্মানরা মনের শক্তিতে বিলক্ষণ বলীয়ান বলে পরিচিত, কিন্তু জানা গেছে যে তাদের অর্থমন্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন; যা দেখেছেন ও দেখবেন বলে ভয় পেয়েছেন তা সহ্য করতে পারেন নি। সব মৃত্যুই দুঃখজনক ও শোকাবহ। কিন্তু আমরা বিশিষ্টজনদের মৃত্যুর খবরই শুধু জানতে পারি। মেহনতিদের প্রাণত্যাগের খবর কে রাখে? যারা বাঁচছে তারাও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ছে। কিন্তু তারা তো পরিসংখ্যানের অকিঞ্চিতকর সংখ্যামাত্র; সম্পদ বলতে আছে শুধু একটা প্রাণ, আক্রান্ত হয়ে ওটি ত্যাগ করেই কোনোমতে যন্ত্রণামুক্ত হচ্ছে।

বলা হচ্ছে, করোনা ভাইরাস প্রকৃতির সৃষ্টি, মানুষের নয়। আমরা মেনে নিলাম যে রোগটি এসেছে প্রকৃতি থেকেই। কিন্তু প্রকৃতির কেন হঠাত্ এমন দুর্বুদ্ধি হলো যে, সে বেরিয়ে পড়ল মানুষ মারার মিশন নিয়ে? প্রকৃতির তো এটা স্বাভাবিক কাজ নয়। তার জন্য স্বাভাবিক কাজ হচ্ছে নিজে বেঁচে থাকা। তাহলে? আসলে প্রকৃতির এই অস্বাভাবিক কাজের জন্য প্রকৃতি নিজে দায়ী নয়, দায়ী মানুষই। সব মানুষ নয়, পুঁজিবাদী মানুষ, প্রকৃতিকে যারা উত্ত্যক্ত করেছে সর্বক্ষণ। প্রকৃতি তার নিজস্ব প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। জানানোটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতিরও তো প্রাণ আছে; প্রাণ বাঁচানোর দায় আছে। প্রাণের ওপর আঘাত করলে প্রত্যাঘাত তো সে করবেই। ধরে নিতে পারি যে জীবাণুটা ছড়িয়েছে বাদুড়ের দেহ থেকেই। বাদুড়ের দেহে ঐ জীবাণু তৈরি হওয়াটা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়; কিন্তু সেটা কেন মানুষের দেহে চলে আসবে? এসেছে এ কারণে যে বাদুড়কে টেনে আনা হয়েছে বাজারে। বন্য প্রাণীর বাজার বসেছিল চীনের উহান শহরে, যেমন হামেশাই বসে থাকে। সেখান থেকেই সংক্রমণ। তা বাদুড় তো থাকবে বাদুড়ের জায়গাতেই, তাকে বাজারে নিয়ে আসাটা কেন ঘটল? কারণ হচ্ছে পুঁজিবাদী ভোগলিপ্সা। চীনে একসময় বাদুড় খাওয়ার প্রচলন ছিল। চীন তখন দরিদ্র ছিল; দরিদ্র মানুষ অনেক কিছুই খায়, খেতে বাধ্য হয়; বাছবিচার করতে পারে না। কিন্তু এখন তো চীন আর দরিদ্র নেই। তাহলে বাদুড়কে কেন খাঁচায় পুরে বাজারে নিয়ে আসা? কারণ হচ্ছে, খাঁচা থেকে বাদুড় যাবে খাবারের টেবিলে। বাদুড় এখন আর গরিব মানুষের খাদ্য নয়; খায় ধনীরা। বাদুড়েরা তাই ধরা পড়েছে, পশু বিক্রির বাজারে চলে এসেছে, বিক্রি হয়েছে এবং নিজেদের গাত্রে উত্পন্ন জীবাণু মানুষের দেহে ছড়িয়ে দিয়েছে। সবটাই ঘটল একদিকে ভোগবিলাসিতা, অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও চিকিত্সাসহ মানুষের নিরাপত্তার দিকে যথোপযুক্ত মনোযোগ না দেওয়া—এ দুই কারণে।

একসময় মহামারি প্লেগও মনুষ্যদেহে এসেছিল প্রাণিদেহ থেকেই। প্রচলিত গল্পটা এই রকমের :এক পাদ্রি তার বক্তৃতায় ভক্তদের জোরেশোরে বলেছিলেন যে শয়তান নানা রূপ ধারণ করে থাকে। তবে শয়তানের প্রিয় রূপটি হচ্ছে বিড়াল। সেই কথা শুনে বিড়াল হত্যার ধুম পড়ে যায়। পাদ্রি অবশ্য কালো বিড়ালের কথা বলেছিলেন, কিন্তু কালো-ধলো সব বিড়ালেরই নিধন চলে। বিড়াল মারা পড়ায় সুবিধা হয় ইঁদুরদের, তারা নিরাপদে বংশবৃদ্ধি ঘটাতে থাকে। ইঁদুরেরা নোংরা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় থাকতে পছন্দ করে; সেরকম পরিবেশে থাকতে থাকতে তাদের গায়ে প্লেগের ভাইরাস জমে। একেকটির গায়ে হাজার হাজার ভাইরাস। ইঁদুরের স্বভাব যেখানে-সেখানে মুখ দেওয়া। তাদের মুখস্পর্শ থেকে প্লেগের ভাইরাস চলে যায় মানুষের দেহে। এভাবে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে এবং মহামারির আকার ধারণ করে। এবার চীনে করোনা হয়তো বাজারে আনা বাদুড় থেকে চলে গেছে আরেক ছোট প্রাণী প্যাঙ্গোলিনের দেহে এবং সেখান থেকে মানুষের দেহে ঢুকেছে।

n লেখক :শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক