জাতীয় পরিচয়পত্র :নতুন অভিভাবকত্ব

আপডেট : ০৮ জুন ২০২১, ২১:১১

চটজলদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমরা সিদ্ধহস্ত। হুকুম হলেই হামলে পড়ি হুকুম তামিলের। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধি পাওয়া যায় কতটুকু তার বিচারের ভার ফেলে রাখি ভবিতব্যের হাতে। যা পাই তার চর্চাও করি না ঠিক মতো।

সেই কবে ১৮৭৩ সালে অবিভক্ত বাংলায় প্রচলন হয়েছিল জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের। আমরা যদি এই আইনের প্রতি ন্যূনতম আগ্রহ দেখাতাম তাহলে ১৫০ বছরের একটা সমৃদ্ধ তথ্যভান্ডার থাকতে পারত আমাদের হাতে। প্রায় অচর্চিত এই আইন বাস্তবায়নের বাস্তব কর্তৃপক্ষ না থাকাতেই কাজির গরু শুধু কেতাবেই ছিল।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তুলেছে ইউনিসেফ (ইউনাইটেড নেশনস চিলড্রেনস এমারজেন্সি ফান্ড)। ইউনিসেফ এই প্রয়োজনীয়তার কথা বারংবার তুলে ধরে সফল হয়েছিল বাংলাদেশেও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে।  তারই ফলে ১৮৭৩ সালের আইন বাতিল হয়ে বাংলাদেশে ২০০৪ সালে নতুন করে আইন জারি হয়, ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪’। তাতে ১৮(৩) ধারায় বলা ছিল, অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, নিম্নবর্ণিত বিষয়াদির ক্ষেত্রে বয়স প্রমাণের জন্য এই আইনের অধীন প্রদত্ত জন্মসনদ ব্যবহার করিতে হইবে (ক) পাসপোর্ট ইস্যু; (খ) বিবাহ নিবন্ধন; (গ) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি; (ঘ) সরকারি, বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দান; (ঙ) ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু; (চ) ভোটার তালিকা প্রণয়ন; (ছ) জমি রেজিস্ট্রেশন এবং (জ) বিধি দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো ক্ষেত্রে?

এম এ আজিজ নির্বাচন কমিশনের সময় ভোটার তালিকায় বিপুলসংখ্যক ভুয়া ভোটার যুক্ত হওয়ায় দেশে জনপ্রিয় দাবি হয়ে উঠল ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা। ১/১১ সরকার এই জনপ্রিয় দাবিকে বাস্তবায়ন করতে শুরু করলেন এক মহাযজ্ঞ। আবারও এগিয়ে এলো আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ডিএফআইডি (ইউকে ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট) এবং ইউএনডিপি (ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম)। বরাদ্দ হলো বিপুল পরিমাণ অর্থ। সেনাপ্রাধান্য সরকারের কালে কেউ ক্ষীণকণ্ঠেও তুলে ধরেনি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইনের কথা। একই বিষয়ে একটা সহায়ক আইন থাকা সত্ত্বেও কোনো আইনের বিধান ছাড়াই ২০০৮ সালে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা তৈরি হয়ে যায়। তার পর ছবিযুক্ত ভোটার তালিকাই রূপান্তরিত হয়ে যায় জাতীয় পরিচয়পত্রে। জাতীয় পরিচয়পত্র আইন জারি হয় ২০১০ সালে।

জাতীয় পরিচয় পত্র আইনের ১১(১) ধারা অনুসারে সরকার, সরকারি গেজেটে এবং তদতিরিক্ত ঐচ্ছিকভাবে ইলেকট্রনিক গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, উহাতে উল্লিখিত যে কোনো সেবা বা নাগরিকসুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে, নাগরিকগণকে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদর্শন ও উহার অনুলিপি দাখিলের ব্যবস্থা চালু করিতে পারিবে। ফলে দেখা যাচ্ছে নাগরিকগণ একই ধরনের সুবিধা নেওয়ার জন্য আইনানুগভাবে দুইটি সমান্তরাল আইনের সুযোগ গ্রহণ করতে পারছেন। যদিও জাতীয় পরিচয়পত্রই অধিকতর জনপ্রিয়।

নিবন্ধকার জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক থাকাকালে একাধিকবার বিভিন্ন ফোরামে মন্তব্য করেছেন জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র একই ছাতার নিচে নিয়ে আসা হোক; কিন্তু তা অরণ্যে রোদনই হয়েছে। এখন হঠাত্ করে লোহা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ১৩ বছর ধরে নির্বাচন কমিশনের যত্নে থাকা জাতীয় পরিচয়পত্রের মালিকানা বদলের কথা চাউর হয়ে গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন জাতীয় পরিচয়পত্রের অভিভাবক হতে যাচ্ছে।

জাতীয় পরিচয়পত্রের অভিভাবকত্ব নানান দেশে নানান মন্ত্রণালয়ে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়—তা যে নামেই চিহ্নিত হোক না কেন, অনেক দেশে তারাই জাতীয় পরিচয়পত্রের অভিভাবক। আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সে কারণে অভিভাবকত্ব চাইতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্র লাগে পাসপোর্ট পেতে, পাসপোর্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতায়। পাসপোর্ট লাগে ব্যাংকে হিসাব খুলতে, বিয়ে করতে, চাকরিতে নিয়োগ পেতে, জমি কিনতে ও বিক্রি করতে, ভোট দিতে এবং নানা রকমের নাগরিকসুবিধা পেতে—যার কোনোটাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক্তিয়ারে না। তাহলে কি জাতীয় পরিচয়পত্রের অধিকতর নিরাপত্তার জন্য, যা নির্বাচন কমিশন নির্বাহ করতে পারছে না? ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র বা ভুলভাল তথ্যের কথা যেমন মাঝেমধ্যে প্রকাশিত হয় তেমনি মাঝেমধ্যে এটাও রটে যে, কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের পরেও রোহিঙ্গারাও পাসপোর্ট পেয়ে যায়। অর্থাত্ নিরাপত্তার দাবিতে জাতীয় পরিচয়পত্রের অভিভাবকত্ব পরিবর্তনে ধোপে টিকবে না। বরঞ্চ অন্যের হাতে মালিকানা থাকলে আর সেখানে কোনো তঞ্চকতা হলে আইনানুগ কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা তদন্ত করে অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনতে পারে।

অভিভাবকত্ব পরিবর্তনের বিষয়টি যখন উঠেছে তখন বিষয়টি নিবিড়ভাবে বিবেচনা করা দরকার। বিশ্ব জুড়ে এখন সিআরভিএসের (সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস) হাওয়া প্রবল। মানুষের জন্ম, মৃত্যু, মৃত্যুর কারণ, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, জীবনক্রমের প্রভৃতি দিক নিবন্ধিত হবে এই সিআরভিএসের আওতায়। সিআরভিএসের বিষয়াদি আমাদের দেশে পরিসংখ্যান ব্যুরোর আওতাধীন। জনগণনা, জনতথ্য সংরক্ষণ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নিত্য দায়িত্ব। তাই যদি জাতীয় পরিচয়পত্রের অভিভাবকত্ব বদলাতেই হয় তাহলে অভিভাবক হিসেবে সবচেয়ে ভালো হতে পারে পরিসংখ্যান ব্যুরো। শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র নয়— জাতীয় পরিচয়পত্র এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম উভয়ের অভিভাবকত্বই দেওয়া যেতে পারে পরিসংখ্যান ব্যুরোকে। প্রকৃতপক্ষে যে কাজের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ পরিসংখ্যান ব্যুরো করেই থাকে। এখন কাজ দুটোর অভিভাবকত্ব এক কর্তৃপক্ষের আওতায় এলে রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যয় হ্রাস পাবে, সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও একই ধরনের কাজের জন্য দুটো আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার ধকল পোহাতে হতো না। এটাও ভাবা যেতে পারে।

n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব