বাংলাদেশ বরাবরই ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হওয়ায় এদেশের সংস্কৃতির অবাধ বিস্তার ঘটেছে। মূলত ১৯ শতকে নবজাগরণের সময় বাংলার সংস্কৃতি বিকাশ লাভ করে। সেই সংস্কৃতির ছোঁয়া রয়েছে তাদের তৈরি নানান স্থাপত্যকর্মে, যা ইতিহাস হিসেবে নতুন প্রজন্মের কাছে দেশের সোনালি অতীত তুলে ধরবে। শুধু আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছেই নয়, প্রতি বছর বাইরের দেশ থেকে আসা হাজারো পর্যটকের কাছে ছোট্ট দেশটি সুনাম কুড়িয়েছে ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে থাকা কিছু স্থাপত্য এবং সেগুলোর অসাধারণ নির্মাণশৈলীর জন্য। কালের সাক্ষী হয়ে থাকা এসব নিদর্শন বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের পরিচিতি ও সুনাম অর্জনে অনেকটাই ভূমিকা রাখবে। কিন্তু তার বিপরীতে সঠিক তদারকি আর তত্ত্বাবধানের অভাবে এসব ঐতিহাসিক স্থাপত্য হারাতে বসেছে তার পুরোনো জৌলুশ।
শিল্পীর তুলিতে আঁকা আমাদের দেশের রয়েছে সোনালি এক অতীত। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে ঢাকার লালবাগের কেল্লা, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ, নওগাঁর সোমপুর বিহার, বগুড়ার মহাস্থানগড়, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পুরোনো আমলের হাজারো স্থাপত্য। যেমন ফেনীর প্রতাপপুর জমিদারবাড়ি, গাজীপুরের শ্রীফলতলী জমিদারবাড়ি, মাদারীপুরের আওলিয়াপুর নিলকুঠি, চুয়াডাঙ্গার আটকবর, নারায়ণগঞ্জের মুড়াপাড়া জমিদারবাড়ি ইত্যাদি। তবে আমাদের দেশে এমন ঐতিহাসিক স্থাপনার সংখ্যা কম না হলেও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্থাপনার সংখ্যা এখনো নিতান্ত কমই রয়ে গেছে। ফলাফল অযত্ন-অবহেলা আর শ্রভাবশালীদের দখলে হারিয়ে যাচ্ছে দেশের অতিমূল্যবান অধিকাংশ স্থাপনা।
প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থান তত্কালীন মানুষের জীবনযাত্রা, সমাজব্যবস্থা, তাদের রুচি, সংস্কৃতির পরিচিতি তুলে ধরে। যেহেতু সব স্থাপনা নির্দিষ্ট এক সময়ে তৈরি হয়নি, সেক্ষেত্রে প্রতিটি স্থাপনাই আলাদা আলাদা শাসনামলের পরিচায়ক। যেমন—প্রাচীন গৌড়ের সোনা মসজিদ সুলতান আলাউদ্দিন শাহ কিংবা সুলতানি আমলের স্থাপত্যশিল্পের এক অনবদ্য নিদর্শন হলেও বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ খান জাহান (রহ)-এর শাসনামলের নিদর্শন। আবার অস্টম শতকের শেষ দিকে নির্মিত পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার পাল বংশের শাসনামলের নিদর্শন। তাই প্রতিটি স্থাপনাই তার কারুকার্যখচিত নির্মাণশৈলীর মাধ্যমে তুলে ধরে তত্কালীন চিত্র। তবে স্থাপনাগুলো যেহেতু অধিকাংশই ১০০ বছর কিংবা তারও বেশি সময়ের পুরোনো, প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন—ঝড়, শিলাবৃষ্টিসহ নানা কারণে স্থাপনগুলোর সংস্করণ অতীব প্রয়োজন। তবে গুটি কতক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্থাপনা ছাড়া দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংস্কারের অভাবে এখন মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। সরকারি কোনো বিধিনিষেধ না থাকায় এমন অনেক স্থাপনা রয়েছে, যেগুলো পরিণত হয়েছে মানুষের বসতিতে। এমনকি লোকচক্ষুর আড়ালে নানা অসামাজিক কাজের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে পুরোনো এসব স্থাপনা। এতে একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে ঐতিহাসিক তাত্পর্যবাহী স্থাপনার সৌন্দর্য, তেমন আবেদন হারাচ্ছে বিদেশি পর্যটকের কাছে।
ব্রিটিশ ভারতের তত্কালীন পূর্ব বাংলার সর্বপ্রথম স্টেশন ছিল ‘জগতি’। বর্তমান কুষ্টিয়া শহরে যার অবস্থান। ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্টেশন। দেড় শ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক এই স্টেশন শুধু সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাবে এখন প্রায় পরিত্যক্ত এবং এর অনেকটাই এখন পাথর ব্যবসায়ীদের দখলে। আবার নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার কাশীমপুর জমিদারবাড়ি নামে ‘জমিদারবাড়ি’ হলেও এখন সেটি স্থানীয়দের গোয়ালঘর হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। পুরোনো স্থাপত্য দেশের মূল্যবান সম্পদ। সেগুলোর ভগ্নদশা কখনোই কাম্য হতে পারে না। ধ্বংসের দ্ধারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এসব স্থাপনা রক্ষায় পদক্ষেপ না নিলে সংস্কৃতমনা জাতি হিসেবে বাঙালির যে সুনাম তা অচিরেই হারিয়ে যাবে। হারাবে বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ত্যাগ আর অর্জনের কথা বলে। সেই ত্যাগের সাক্ষী হিসেবে দেশের নানা প্রান্তে রয়েছে বধ্যভূমি, রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিফলক। তবে সেগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ আর সচেতনতার অভাবে অনেকটাই অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। এমন চলতে থাকলে দেশের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে যেতে আর বেশি দেরি নেই। বীরের জাতি হিসেবে বাঙালি যদি তার ইতিহাস ধরে না রাখতে পারে, সেটি হবে বাঙালির জন্য চরম লজ্জার।
তবে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের তিনটি স্থান, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার ও সুন্দরবন ইউনেস্কো কর্তৃক ‘বিশ্ব ঐতিহাসিক স্থানসমূহের’ মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। যদিও এই সংখ্যা পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় অতি নগণ্য। তবে আশা করা যায়, স্থাপনাগুলোর সঠিক তত্ত্বাবধান এই সংখ্যা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। আবার প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এখনো দেশে অনেক স্থাপনা মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। হয়তো চাপা পড়ে থাকা কোন প্রাচীন স্থাপনা খুলে দিতে পারে দেশের জন্য অপার সম্ভাবনার দুয়ার। তার জন্য প্রয়োজন সঠিক পদক্ষেপ। এসব স্থাপনার দুর্দশার দায়ভার সবার। তাই এসব স্থাপনা সংস্করণে সরকারি নির্দশনার পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা। অন্যায়ভাবে দেশের সম্পদ ভোগদখল কিংবা তার কোনো ধরনের ক্ষতিসাধনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। ভালোবাসতে হবে দেশকে, দেশের সম্পদকে।
দেরিতে হলেও এসব স্থাপনা সংস্করণের কাজে অনেকটা এগিয়েছে দেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। আশা রাখি দেশের সব ঐতিহাসিক স্থাপনা তাদের রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় আসবে। দেশের এসব স্থাপনা আমাদের ঐতিহ্যের বাহক। শুধু যত্নের অভাবে এসব স্থাপত্য যাতে কালের গহবরে বিলীন হয়ে না যায়, তার দায়িত্ব আমাদের সবার।
n লেখক : ইংরেজি সাহিত্য বিভাগ,
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
