মর্যাদাসম্পন্ন কান চলচ্চিত্র উৎসবে আয়োজকদের স্বীকৃত কয়েকটি প্যারালাল বিভাগ থাকে। এরমধ্যে ‘ত্যু লে সিনেমাস দ্যু মন্দ’ (অল দ্য সিনেমাস অব দ্য ওয়ার্ল্ড) পরিচালনা করে ফ্রান্স সরকারের ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট। প্রতি বছর কান উৎসব চলাকালে ‘লে সিনেমাস দ্যু মন্দ’ প্যাভিলিয়নে ‘লা ফেব্রিক সিনেমা’ (দ্য সিনেমা ফ্যাক্টরি) আয়োজন করে ইনস্টিটিউটটি।
কানের বাণিজ্যিক শাখা মার্শে দ্যু ফিল্মে অংশ নেওয়া চলচ্চিত্র পরিবেশক ও এজেন্টদের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের উদীয়মান তরুণ নির্মাতাদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়াই এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য।
৭৪তম কান চলচ্চিত্র উৎসবের অংশ হিসেবে ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউটের লা ফেব্রিক সিনেমায় নির্বাচিত হয়েছে বিভিন্ন দেশের সম্ভাবনাময় মোট ১০টি ছবির চিত্রনাট্য। এরমধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত ও ফ্রান্সের যৌথ প্রযোজনা ‘একা’। এর ইংরেজি নাম ‘সলো’। এটি বাংলাদেশ থেকে প্রযোজনা করবেন গুপি বাঘা প্রোডাকশনসের আরিফুর রহমান। ফলে প্রযোজক হিসেবে কান উৎসবের লালগালিচায় হাঁটবেন তিনি। তার পাশে থাকবেন ছবিটির আরেক প্রযোজক ফ্রান্সের ডিডব্লিউ প্রোডাকশনসের ডমিনিক ওয়েলিনস্কি এবং কলকাতার পরিচালক সুমন সেন। 
আরিফুর রহমান ও সুমন সেন। ছবি: সংগৃহীত
প্রযোজক আরিফুর রহমান বলেন, “আমরা তিনজন একসঙ্গে অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছি। এখন অডিশনের মাধ্যমে কলাকুশলী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। বিভিন্ন দেশের চমৎকার অভিনয়শিল্পী ও ক্রু সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করছি আমরা। ২০২২ সালের মাঝামাঝি কলকাতায় এর শুটিং শুরু হবে। ছবিটির অংশ হতে পেরে আমি খুব আনন্দিত। সব ঠিক থাকলে কানে ‘একা’ উপস্থাপন করতে যাচ্ছি।”
‘একা’র মাধ্যমে পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ করবেন সুমন সেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘‘আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সমাজের পতনের কারণ নিজেদের অতীতের বোঝা। বাবার চোখ দিয়ে আমি এই পৃথিবী দেখি। তাদের প্রজন্ম আমাদের পুরোপুরি ব্যর্থ করে দিয়েছে। সমাজ ও জাতির প্রতি তাদের উদাসীনতার কারণে আমরা মানসিকভাবে দেউলিয়া, মনের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন এবং রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়েছি। গত কয়েক বছর ধরে যে ধরনের ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা ও সহিংস সময় কাটাচ্ছি; তার প্রতিফলন থাকবে আমার প্রথম ছবিতে।’’
পরিচালক প্রসঙ্গে ডমিনিক ওয়েলিনস্কির মূল্যায়ন, “সুমন সেনের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের পর থেকেই আমার মনে বিশ্বাস জন্মায়, ভারতীয় মুক্ত চলচ্চিত্রে সতেজ ও নতুন ধ্বনি ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। তার স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি ‘দ্য সাইলেন্ট ইকো’ দেখেই টের পেয়েছি তার অনুভবশক্তি ও রাজনৈতিক জ্ঞান। ‘একা’ নামের নতুন রোমাঞ্চের অংশ হতে পেরে আমি ধন্য।”
২০১৯ সালে এনএফডিসি ফিল্ম বাজারের কো-প্রোডাকশন মার্কেটে অংশ নিয়েছে ‘একা’। গত বছর টরিনো ফিল্ম ল্যাব নেক্সটে নির্বাচিত হয় এটি। এবার লা ফেব্রিক সিনেমায় জায়গা করে নিলো চিত্রনাট্যটি। কলকাতার প্রেক্ষাপটে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় তৈরি হবে এই ছবি। যৌথভাবে ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছেন সুমন সেন ও অনির্বাণ ভট্টাচার্য। 
কানের লালগালিচায় (ডান থেকে দ্বিতীয়) মেহদি হাসান। ছবি: সংগৃহীত
ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউটের লা ফেব্রিক সিনেমায় নির্বাচিত অন্য নয়টি প্রকল্প হলো- আফ্রিকার ‘ফ্রেসকোস অব দ্য ফরগটেন’, দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ফ্লেশ অব মাই ফ্লেশ’, আর্জেন্টিনার ‘এলডার সান’, কলম্বিয়ার ‘অ্যালিস’, কোস্টারিকার ‘ইফ উই ডোন্ট বার্ন, হাউ ডু উই লাইট আপ দ্য নাইট’, কিউবার ‘ফলেন’, ফিলিপাইনের ‘ড্যান্সিং দ্য টাইডস’, আফগানিস্তানের ‘কাবুল মেলোডি’ এবং মিসরের ‘দ্য মিসিং প্লানেট’। এগুলো হবে সংশ্লিষ্ট নির্মাতাদের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় ছবি।
লা ফেব্রিক সিনেমায় বাংলাদেশ নতুন নয়। ২০১৪ সালে পরিচালক কামার আহমাদ সাইমন ও প্রযোজক সার আফরীনের ‘শঙ্খধ্বনি’ (পরে নাম বদলে হয়েছে ‘শিকলবাহা’) এবং ২০১৯ সালে পরিচালক মেহদী হাসান ও প্রযোজক রুবাইয়াত হাসানের ‘স্যান্ড সিটি’ ছবির পাণ্ডুলিপি নির্বাচিত হয় এই কার্যক্রমে। ফলে বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র পরিবেশক ও এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের পাশাপাশি তারা হেঁটেছেন কানের লালগালিচায়।
২০১১ সাল থেকে আরিফুর রহমান ও বিজন ইমতিয়াজের প্রতিষ্ঠান গুপি বাঘা প্রোডাকশনস বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, আফগানিস্তান, কোরিয়া ও জাপানে পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি ও প্রামাণ্যচিত্র প্রযোজনা করেছে। এগুলোর প্রদর্শনী হয়েছে বার্লিন, ভেনিস, রটারডাম, বুসান, সিয়াটল, সিঙ্গাপুর, সাংহাই, স্টকহোম, সিনেকোয়েস্ট ও শেফিল্ডসহ অনেক আন্তর্জাতিক উৎসবে।
ইত্তেফাক/এসজেড
