পৃথিবীতে মানুষ নামের প্রাণীটি অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা। তার শারীরিক কিছু কর্ম—যেমন আহার-নিদ্রা, জৈবিক চাহিদা ও প্রকৃতির ডাক ইত্যাদি ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে মিলটা চোখে পড়ে। কিন্তু চিন্তার ক্ষেত্রে প্রাণীটি বুদ্ধিদীপ্ত-বিচার-বিবেচনাসম্পন্ন। ভীষণ কল্পনাপ্রবণ। যা কল্পনা করে তা-ই সে করে। সৃজনশীল। এই প্রাণীর মধ্যে কারো গুণের যেমন শেষ নেই, তেমনি আবার কারো দোষেরও যেন শেষ নেই। প্রাণীটি ভীষণ আত্মগর্বী। নিজের আধিপত্য ও বড়োত্ব বিস্তারে সর্বদা সচেষ্ট। অসম প্রতিযোগিতায় কেউ পড়ে থাকে নিচে, কেউ যায় উপরে। এভাবেই এদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টির ধারা সতত প্রবহমান। অন্য প্রাণীর মধ্যে এরকম কিছু নেই। এর ভালো-মন্দের দুটি সংজ্ঞা আছে। ভালো সে ফেরেশতার চেয়েও ভালো। মন্দ সে নিকৃষ্টের চেয়েও নিকৃষ্ট। সংখ্যাধিক্যে এই নিকৃষ্টজনরা সর্বদা অপকর্মে লিপ্ত থাকে। পাপে পাপে ছয়লাপ এদের অন্তর। এরা আর ‘মানুষ’ থাকে না।
এসব মানুষকে ‘মানুষ’ করার ব্রত বা দায় কার? ঈশ্বরই এসব পাপীজনের পাপাচার থেকে পৃথিবীকে মুক্ত করতে যুগে যুগে দূত পাঠিয়ে থাকেন। প্রেরিত এই দূতগণ মানুষকে ‘মানুষ’ করার ব্রত গ্রহণ করেন। কিন্তু এসব মানুষের অন্তরের বিদ্বেষবিষ কি দূর হয় সহসা? হয় না। অন্তরে বিষবাষ্প থেকেই যায়। আর এদের পাপাচারেই ভরে ওঠে পৃথিবী। দয়াহীন আর মায়াহীন হয়ে পড়ে জগত্-সংসার। মানুষে মানুষে দৃশ্যমান হয় কষ্টদায়ক প্রভেদ। নিজেকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে তার কৌশলের যেন শেষ নেই। পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র—সর্বক্ষেত্রে তার এই কৌশল। অপকৌশল। এজন্যে কত তার ষড়যন্ত্র। তার মধ্যে আত্মোত্থানের ভয়ংকর বিমূর্ত চিন্তা তাকে সবসময় তাড়িত করে। নৈতিক-অনৈতিক বলে কিছু থাকে না তার। সমমর্যাদার কথা সে কখনো ভাবে না। এভাবে পৃথিবীতে শতাব্দী শতাব্দীকাল পাড়ি দিয়ে চলেছে ‘মানুষ’ নামের এই প্রাণীকুল।
শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সুন্দর মনের মানুষেরা বিস্ময়ভরা মনে পৃথিবীর এই অনাসৃষ্টিকাণ্ডগুলো দেখে যারপরনাই হতাশ হয়ে পড়ে। শান্তিপ্রিয় এই মানুষেরা এ-নিয়ে সততই ভাবতে থাকে। তারা ভাবে, পৃথিবীটা সব মানুষের কেন হয় না? কেন এত ভেদরেখা টানা হয়? কেন এত বৈষম্যের শিকার সমগোত্রীয় এই বিপুল সংখ্যক মানুষ? পৃথিবীর শাসকদল কেন পরিশুদ্ধ মনের হয় না? দেশে দেশে যুদ্ধবিগ্রহ কেন লেগেই থাকে? কালস্রোতে তো সবই ভেসে যায়। তবু কেন এই অশুভ আয়োজন মানুষের মনে? প্রকৃতির মধ্যে সাম্যের বহু নিদর্শন বিদ্যমান। কিন্তু জীবনযাপনে সে-উপলব্ধি আমাদের কোথায়? বিজ্ঞানের ধ্বংসাত্মক উদ্ভাবন পৃথিবীর স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে নিরন্তর। কল্যাণ-আবহকে ধারণ করে বিজ্ঞানের জয়যাত্রাটা চলমান থাকুক; এটাই যৌক্তিক। পৃথিবীর সুস্থতা এখানেই। মনুষ্যনিধনে দেশে দেশে ভয়ংকর যুদ্ধাস্ত্র কেন? এর ভয়াবহরূপ কেন যুগে যুগে আমরা প্রত্যক্ষ করি?
অস্থায়ী জীবনের এই মানুষেরা যদি একটু সমঝে চলে, তাহলেই তো পৃথিবী নিরাপদ থাকে। জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক বিকাশে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি হয় না। সুস্থ-সুন্দর থাকার নিয়ামক শক্তি অর্জনের এটাই পথ। ভালো মানুষ হওয়ার যে-বাণী দেবদূতগণ যুগে যুগে পৃথিবীতে এনেছেন তা গ্রহণ বাঞ্ছনীয়। সামষ্টিক কল্যাণই তাতে নিহিত। ব্যষ্টির উন্নয়ন মানেই বৈষম্য সৃষ্টির অপকৌশল। সর্বব্যাপী বলদর্পী ও আত্মগর্বী আস্ফাালন অবসানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘তুমি যারে নিচে ফেল, সে তোমারে বাঁধিবে যে নিচে,/পশ্চাতে ফেলিছ যারে, সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।’ বাণীটির বিশালত্বের বিমূর্ত ভাবের অবগাহন মনকে আপ্লুত করে বৈকি। অনিষ্ট চিন্তা নিজের অনিষ্ট সাধনে কাজ করে। স্থায়িত্বহীন জীবনের পৃথিবীতে সুখ-দুঃখ সমভাগ করে চলাই মনুষ্যত্ব ও ধর্ম। ভীতিকর জনারণ্য নয়, বিপুল সংখ্যক ভালো মানুষই জগত্কল্যাণের প্রতিভূ। স্রষ্টার কাছে প্রিয়।
