তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে একদিকে যেমন আমাদের জীবনযাত্রায় গতি ও পরিবর্তন আসিয়াছে, তেমনই পরিবর্তন আসিয়াছে ব্যবসায়-বাণিজ্য, প্রচার-প্রচারণা আর কমিউনিকেশনের বেলাতেও। ইন্টারনেটের এই দুনিয়ায় অধিকাংশ মানুষের নির্ভরতা বাড়িতেছে অনলাইনভিত্তিক যে কোনো কার্যক্রম, সেবা কিংবা যোগাযোগে। মানুষের ইন্টারনেট কিংবা অনলাইন-নির্ভরতায় পরিবর্তন আসিয়াছে ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রচার-প্রচারণা আর বিজ্ঞাপনের কাঠামোতেও। একসময় পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেল বিজ্ঞাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করিয়া থাকিলেও সাম্প্রতিক কালে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন সার্ভিস সেই জায়গা দখল করিয়া লইতেছে। যেই হেতু অধিকাংশ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার, বিনোদন কিংবা ব্যক্তিগত ও পেশাগত যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করিতেছে, সেই হেতু বিভিন্ন ব্যবসায়প্রতিষ্ঠান অনলাইন প্ল্যাটফরমকেই বাছিয়া লইতেছে বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যম হিসাবে। ইহার ফলে গুগল, অ্যামাজন ফেসবুক, ইমো, ইউটিউবের ন্যায় অনলাইনভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি বিরাট অঙ্কের রেভিনিউ কামাইয়া লইতেছে। দুঃখের বিষয় হইল, ইটারনেটভিত্তিক এই সকল বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন প্রচার করিয়া বিপুল লাভবান হইলেও তাহাদের উপর সরকারি নজরদারি না থাকিবার কারণে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হইতে বঞ্চিত হইতেছে সরকার। প্রতি বত্সর হাজার হাজার কোটি টাকা চলিয়া যাইতেছে বিদেশে, অথচ এই সকল রেভিনিউ বাবদ যেই রাজস্ব সরকারের কোষাগারে জমা হইবার কথা, তাহা হইতেছে না।
বিশ্বায়নের এই যুগে সমগ্র পৃথিবীটাই এক বিরাট বাজারে পরিণত হইয়াছে। বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী থাকায় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের বিশেষ গুরুত্ব রহিয়াছে। গত কয়েক বত্সরে তাই দেশে ইন্টারনেটভিত্তিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়াছে। বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানিসহ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে কয়েক হাজার বিজ্ঞাপনদাতা বহুজাতিক ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞাপন প্রচার করিয়া গত কয়েক বত্সরে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাঠাইয়াছে। এই সকল অর্থের উপর যদি ভ্যাট আদায় করা সম্ভব হইত, তাহা হইলে সরকারের কোষাগারেও বিপুল অর্থ জমা পড়িত। কিন্তু এই সকল প্রতিষ্ঠানের লেনদেন ও মুনাফার তথ্য সরকারের নিকট না থাকিবার কারণে রাজস্ববঞ্চিত হইতে হইয়াছে। এই সকল অনলাইন প্ল্যাটফরম-নির্ভর প্রতিষ্ঠান হইতে রাজস্ব আদায় করিতে হইলে তাহাদের ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় লইয়া আসা জরুরি। ইহার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলি কী পরিমাণ ভ্যাট প্রদান করিতেছে, ব্যাংক কোন প্রতিষ্ঠান হইতে কত টাকা ভ্যাট লইয়াছে এই সকল তথ্যও সংরক্ষণ করিতে হইবে। প্রতিষ্ঠানগুলি কোন প্রক্রিয়ায় কিংবা কীভাবে করজালে আসিবে সেই পলিসিও ঠিক করিতে হইবে। তবে প্রশ্ন থাকিয়া যায়, বহুজাতিক এই সকল ইন্টারনেটনির্ভর প্রতিষ্ঠানসমূহের ভ্যাট-ট্যাক্সের পরিমাণ দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলির ন্যায়ই হইবে কি না, কিংবা তাহাদের উপর অতিরিক্ত করপোরেট ট্যাক্সও আরোপ করা হইবে কি না। তবে একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখিতে হইবে, যেই হেতু ইন্টারভিত্তিক এই সকল প্ল্যাটফরমে দেশীয় অনেক প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ বিজ্ঞাপন প্রচার করিয়া থাকে, তাই ভ্যাট-ট্যাক্সের পলিসি এমনভাবে করিতে হইবে, যেন তাহা রা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সম্প্রতি উন্নত দেশগুলির জোট জি-৭ টেক জায়ান্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচার ও আয়ের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়াছে। আশার কথা হইল, সরকার বিলম্বে হইলেও এই সকল ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওয়ায় নিয়া আসিবার কার্যক্রম শুরু করিয়াছে। ইতিমধ্যে দুইটি বড় প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধন করিয়াছে। অন্য বড় প্রতিষ্ঠানগুলিকেও দ্রুত ব্যবসায় নিবন্ধন নম্বর বা বিআইএন লইবার জন্য চাপ প্রদান করা হইয়াছে। আমরা আশা রাখি, সরকার উন্নত দেশসমূহের ন্যায় অনলাইন প্ল্যাটফরমভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে ভ্যাট-ট্যাক্সের আওয়ায় আনিবে।
