বৃষ্টি হলে আর পানি পড়বে না অন্যা-অন্বেষাদের ঘরে

আপডেট : ২৩ জুন ২০২১, ০৯:৫৭

দুই বোন অন্যা আর অন্বেষার আনন্দ যেন উপচে পড়ছিল চোখেমুখে। তাদের বাবা পানের দোকানে কাজ করা গণেশ চন্দ্র বর্মণ প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের ঘর পেয়েছেন। তাদের আর আগের ভাঙাচোরা ভাড়া বাড়িতে থাকতে হবে না; যে বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না, যাওয়ার ভালো রাস্তা ছিল না। আর বৃষ্টি হলেই পানি পড়ত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাদের যে ঘর দিয়েছেন, সেই ঘর সুন্দর, বিদ্যুৎ আছে, বৃষ্টি হলেও আর ঘর দিয়ে পানি পড়বে না। অন্যা আর অন্বেষার আনন্দের উপলক্ষ ছিল এটিই।

সম্প্রতি সরেজমিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের জাঙ্গাল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, উপহারের পাওয়া ঘরের জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে অন্যা আর অন্বেষা। সারাক্ষণ শুধু হাসছিল। জিজ্ঞেস করতেই অন্বেষা বলল, এত সুন্দর ঘরে থাকব কোনোদিন ভাবি নাই। পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল তাদের মা রাধিকা রানি বর্মণ। মেয়েদের মতো মা-ও খুশি। রাধিকা বলেন, মেয়েরা বড় হচ্ছে। তাই তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। কিন্তু এখন ঘর পেয়ে দুশ্চিন্তা কেটে গেছে। শুধু তাই নয়, মেয়েদের নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। জানালেন, স্থানীয় রামকানাই একাডেমিতে বড় মেয়ে অন্যা ১০ম শ্রেণিতে ও ছোট অন্বেষা ৫ম শ্রেণিতে পড়ে। রাধিকা বলেন, মেয়েদের আরও পড়াব। নিজের পায়ে দাঁড় করাব।

No description available.

এই গ্রামে শুধু অন্যা আর অন্বেষারাই নয়, তাদের মতো আরও ২০টি দরিদ্র পরিবার ঘর পেয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে, চা-বিক্রেতা ৫৮ বছরের জীবন মালাকার, অটোরিকশাচালক শফিক, প্রতিবন্ধী দুলাল, নির্মাণ শ্রমিক ডালিয়া বেগম, রিকশাচালক রতন মিয়াও। তারা সবাই ঘর পেয়ে নিজের স্বপ্নকে যেন হাতের মুঠোয় পেয়েছেন।

নির্মাণ শ্রমিক ডালিয়া বেগম বলেন, আগে সময়মতো ঘর ভাড়া দিতে না পারলে বাড়িওয়ালার কাছে গালমন্দ শুনতে হতো। কিন্তু এখন নিজেরই একটা পাকা বাড়ি হয়েছে, এটা যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না। তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

কৃতজ্ঞতা জানান অটোরিকশাচালক শফিকও। তিনি বলেন, আগে অন্যের জায়গায় থাকতাম। সাত ছেলেমেয়ে নিয়ে কষ্টে দিন পার করতাম। কিন্তু এখন মাথার ওপরের ছাদ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। প্রধানমন্ত্রী আমাদের ঘরের পাশাপাশি পানি, বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এখন শান্তিতে থাকতে পারব।

‘মুজিববর্ষে দেশের এক জন মানুষও গৃহহীন থাকবে না’—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিনা মূল্যে অসহায়, দরিদ্র মানুষকে এই ঘর দেওয়া হচ্ছে। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ঘর পাচ্ছে ৫৩ হাজার ৩৪০ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার। এর আগে এই প্রকল্পে প্রথম পর্যায়ে ৬৯ হাজার ৯০৪টি ঘর দেওয়া হয়েছে।

No description available.

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দুই শতক জায়গার ওপরে বারান্দাসহ দুই কক্ষের একটি সুদৃশ্য বাড়ি তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। নীল, লাল ও সবুজ টিনশেডের প্রতিটি ঘর ইটের দেওয়াল, কংক্রিটের মেঝে এবং টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। দুটি করে শোয়ার ঘর, একটি রান্নাঘর, টয়লেট এবং সামনে খোলা বারান্দা রয়েছে। এতে ব্যয় হচ্ছে ২ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু বাসস্থানই নয়, পুনর্বাসিত পরিবারের জন্য পানি, বিদ্যুৎ ও রাস্তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এছাড়া তাদের কর্মসংস্থানের জন্য ঋণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলা হচ্ছে।

No description available.

এ প্রসঙ্গে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মাহবুব হোসেন বলেন, অসহায় গৃহহীন মানুষ যারা এতদিন স্বপ্ন দেখতে ভয় পেত, এখন তারা জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে। তিনি বলেন, অসহায় আশ্রয়হীন মানুষকে শুধু সেমিপাকা বাড়িই দেওয়া হচ্ছে না, সঙ্গে সঙ্গে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের যৌথ নামে জমির মালিকানাসহ সারা জীবনের জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীবনযাত্রার মানে পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নও হবে।

চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ১ লাখ পরিবারকে ঘর দেওয়া হবে বলে তিনি জানান। ১৯৯৭ সালে শুরু হওয়া এই আশ্রয় প্রকল্পের আওতায় চলতি বছরের মে পর্যন্ত মোট ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৫২৬টি গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

ইত্তেফাক/এমআর