বয়ঃসন্ধি মানবজীবনচক্রের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এটি শৈশব থেকে যৌবনে পদার্পণের মধ্যবর্তী পর্যায়। এই ধাপে একটি শিশুসত্তা অপরিপক্বতা থেকে পরিণত পর্যায়ে পৌঁছে। সাধারণত ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সকে বয়ঃসন্ধিকাল বা Adolecence ধরা হয়। এই বয়সটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই বয়সেই একজন কিশোর বা কিশোরীর ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়, যা পরবর্তীকালে তার ভবিষ্যত্ গঠনে ভূমিকা রাখে।
বয়ঃসন্ধিকালকে বলা হয় ‘ঝড়ঝাপটা’র বয়স। এই সময় বিভিন্ন শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রকট হয়ে উঠে নানা ধরনের মানসিক পরিবর্তন। নানা ধরনের হরমোনের নিঃসরণ এসব পরিবর্তনের জন্য প্রধানত দায়ী। বয়ঃসন্ধির আগ পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় থাকা হাইপোথ্যালামাস এই সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন হরমোনের নিঃসারণ ঘটায়। যেমন— টেস্টোস্টেরন, ইস্ট্রোজেন, ডোপামিন ইত্যাদি। বয়ঃসন্ধিকালে বিভিন্ন শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি বিভিন্ন আবেগিক পরিবর্তন লক্ষণীয়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তন হলো হতাশা, বিষণ্নতা, আড়াল করার প্রবণতা, একগুঁয়েমি, আসক্তি, মা বাবার সঙ্গে খারাপ ব্যাবহার করা ইত্যাদি। আকস্মিক এসব পরিবর্তন যদি সময়মতো নিয়ন্ত্রণ না করা যায় তবে তা দীর্ঘস্থায়ী রূপ লাভ করতে পারে, যা একজনের ভবিষ্যতের ওপর ফেলতে পারে মারাত্মক প্রভাব।
বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের মধ্যে আবেগ খুব তীব্রভাবে কাজ করে। ছোটোখাটো যে কোনো বিষয়েই তারা হতাশ হয়ে পড়ে। ফলে তারা বিভিন্ন ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। অনেক সময় কিছু ভুল সিদ্ধান্ত গোছানো জীবনকে এলোমেলো করে দেয়। কখনো তা জীবন হরণকারীও হতে পারে। অতিরিক্ত হতাশা ও বিষণ্নতা তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতার জন্ম দেয়। ফলে তারা অনেক সময় নিজের ক্ষতি করে। এই বয়সি ছেলেমেয়েদের মধ্যে সবকিছু আড়াল করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তারা তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে এসময় বেশি প্রাধান্য দেয়। সবকিছু তারা তাদের নিজেদের মধ্যে রাখতে চায়। মা-বাবার চেয়ে বন্ধুবান্ধবকে তারা এই সময় বেশি আপন মনে করে। বন্ধুবান্ধবের কাছে তারা সব বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। মা-বাবা বা বড় ভাইবোনের কাছ থেকে সবকিছু লুকাতে চায় তারা। উপদেশ তাদের কাছে এই সময়ে অসহনীয় মনে হয়। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তারা সহজে মেনে নিতে পারে না।
এই সময় কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে একগুঁয়েমির প্রবৃত্তি দেখা যায়। অজানা জিনিসের প্রতি তাদের বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়। তাদের যেই কাজটি করতে নিষেধ করা হয়, তারা সেটিই বেশি করতে চায়। বন্ধুমহলের প্রতি এই সময় বিশেষ ঝোঁক তৈরি হয়। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের মধ্যে নানা ধরনের আসক্তি পরিলক্ষিত হয়। এর মধ্যে ইন্টারনেট আসক্তি এবং মাদকাসক্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রায়ই তাদের মধ্যে মা-বাবাকে লুকিয়ে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে দেখা যায় এবং তা আসক্তিতে পরিণত হয়। এছাড়া এই বয়সি ছেলেমেয়েরা অসত্ সঙ্গের প্ররোচনায় মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে।
কিশোর-কিশোরীদের সবচেয়ে আপন জায়গা হলো তাদের পরিবার। তাদের সুস্থ মানসিক বিকাশে মা-বাবার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কৈশোরকালীন এই পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে নিবিড়ভাবে জানতে হবে এবং সেই অনুযায়ী আচরণ করতে হবে। এই সময়ে তাদের উচিত তাদের সন্তানদের সঙ্গে বেশি সময় কাটানো। তাদের মানসিক অবস্থা বিবেচনায় তাদের সঙ্গে বন্ধুক্তপূূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে যেন তারা তাদের সুবিধা-অসুবিধার কথা অকপটে বলতে পারে। এতে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে। এই বয়সি সন্তানদের বন্ধুমহল সম্পর্কে খোঁজ রাখতে হবে। এই বয়সে ভুল করাটা খুবই স্বাভাবিক। আজকের কিশোর-কিশোরীরাই আগামীদিনে দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তাই তাদের সুস্থ বিকাশে পরিবার, সমাজ সর্বোপরি দেশের রয়েছে অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

