নারায়ণগঞ্জে বেহাল হয়ে পড়েছে চিকিৎসাসেবা। সর্বসাধারণের চিকিৎসায় স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে নারায়ণগঞ্জে রয়েছে দুটি সরকারি হাসপাতাল। এর মধ্যে একটি হলো ১০০ শয্যাবিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল। অপরটি ৩০০ শয্যাবিশিষ্ট বিশেষায়িত হাসপাতাল। দেশে করোনা মহামারি প্রায় দেড় বছর হতে চললেও এখনো এই দুই হাসপাতাল চলে সিলিন্ডার অক্সিজেনে। সেন্ট্রাল অক্সিজেনের কোন ব্যবস্থা নেই। এছাড়া ডাক্তার-নার্সসহ জনবল সংকট এবং নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আছে ওই দুই হাসপাতালে।
ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি রবিবার (৪ জুলাই) সরেজমিনে গিয়ে হাসপাতাল দুটির চিকিৎসা সেবার বেহাল দশা দেখতে পান। দুটি হাসপাতালের অভ্যন্তরেই যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা পড়ে আছে। এসব থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় টেকা যায় না। এ অবস্থার মধ্যেই জরুরি, বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে রোগীদের চিকিত্সা নিতে হচ্ছে। সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা না থাকায় করোনা রোগীদের যেতে হচ্ছে রাজধানীর হাসপাতালে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, রাজধানীর পাশেই নারায়ণগঞ্জে স্বাস্থ্য সেবার এই বেহাল দশা থাকলে, সারাদেশে কী অবস্থা সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সঠিকভাবে মনিটরিং করলে মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্য সেবার এমন বেহাল অবস্থা হতো না। অধিদপ্তরের পরিচালকরা মাঠ পর্যায়ে কোন ধরনের তদারকি করেন না। নানাভাবে তদ্বির করে পরিচালক পদে বসেন ঠিকই, কিন্তু দায়িত্ব পালন করেন না। অফিসে গেলে দেখা যায় তারা খুবই ব্যস্ত, যেন যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।

ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি রবিবার (৪ জুলাই) বেলা দেড়টায় নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে যান। এ সময় ১০ বছরের শিশু হাসান পা কেটে এসেছে। ওয়ার্ডবয় ওয়াজকুরুনি ড্রেসিংসহ চিকিত্সা সেবা দিচ্ছেন। ব্রাদার্স নার্স তখন টাকা গুনছিলেন আর ড্রয়ারে রাখছিলেন। ভিতরে ছিলেন ইমার্জেন্সি অফিসার। তিনি চিকিত্সা দেন। ইমার্জেন্সিতেও নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ছিল। পরে ২০৯ নম্বর রুমে গিয়ে কথা হয় আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, এই হাসপাতালে আইসিইউ নেই। প্রতিদিন হাসপাতালে ২ হাজারের মতো রোগী আসেন। এখন একটু কম আসেন। আর ইমার্জেন্সিতে ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী হাসপাতালে আসেন চিকিত্সা সেবা নিতে। জনবলের সংকট আছে। সিভিল সার্জন এই হাসপাতালের সার্বিক তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা, কেবিনের সামনে, বারান্দায়, বাথরুমসহ সর্বত্র যেন ময়লার ভাগাড়। পরিচ্ছন্নতা কর্মী সংকট আছে। প্রাচীনতম এই হাসপাতালের কোন উন্নতি হয়নি। শুধু উন্নতি হয়েছে যারা দায়িত্ব পালন করেন তাদের। হাসপাতালে কনসালটেন্টের সংখ্যা কিছুটা কম আছে। কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট নেই। কিডনি রোগীদের কোন ধরনের চিকিত্সা হয় না। ইসিজি পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে, কিন্তু হৃদরোগীদের জন্য আলাদা কোন ইউনিট নেই। হাসপাতালে কর্মরত আউটসোর্সিংয়ের লোকেরা ১৭ মাস ধরে বেতন পান না। আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত কয়েকজন ইত্তেফাককে বলেন, চাকরিতে প্রবেশ করতে হয় টাকা দিয়ে। আবার ১৭ মাস ধরে বেতন বন্ধ। লাভবান হন হাসপাতালের এক শ্রেণির কর্মকর্তা এবং কনট্রাক্টর, আর সার্ভিস দেই আমরা।
নারায়ণগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট ও আইসিইউ চালু করতে টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। দ্রুত কাজ শুরু করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নোংরা ও অপরিচ্ছন্নতার বিষয়টি আমি দেখছি।

পরে ইত্তেফাকের প্রতিনিধি নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট বিশেষায়িত হাসপাতালে সরেজমিন গিয়ে দেখেন, সেখানেও নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এই হাসপাতালকে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা দিয়ে করোনা রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। এই হাসপাতালের অভ্যন্তরে আইসোলেশন ওয়ার্ড ও সাধারণ ওয়ার্ড, বারান্দা ও বাথরুমে ময়লা-আবর্জনা ও নোংরা দেখা যায়। সিলিন্ডারের মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে এই হাসপাতালেও। সেন্ট্রাল অক্সিজেনের কোন ব্যবস্থা নেই। তবে সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি চলছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে নারায়ণগঞ্জে আক্রান্ত হন ব্যাপক সংখ্যক রোগী। তারপরও সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা চালু হয়নি। রোগীরা চিকিত্সা সেবা পেতে রাজধানীতে ছুটেছেন।
মন্ত্রণালয় থেকে একটি কোম্পানিকে এই হাপসাতালে লিকুইড অক্সিজেন দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আজ দেবো, কাল দেবো বলে এক বছর পার করেছে, কিন্তু দেয়নি। আদৌ ওই কোম্পানির দেওয়ার সক্ষমতা আছে কিনা সেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে বর্তমানে এই হাসপাতালে ১০ বেডের আইসিইউ আছে। গতকাল সেখানে ৮ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। করোনা পজেটিভ ৪৬ জন রোগী এই হাসপাতালে ভর্তি আছেন। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এমএ বাশার বলেন, হাসপাতালে অক্সিজেনের চাহিদা বেশি। সিলিন্ডারের মাধ্যমে সেই চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। হাসপাতালে কর্তব্যরত দুই জন চিকিৎসক বলেন, সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা চালু থাকলে অনেক রোগীকে বাঁচানো যেতো।
নারায়ণগঞ্জ স্টাফ রিপোর্টার হাবিবুর রহমান বাদল জানান, গত বছরের এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালটিকে কোভিড ডেডিকেটেড ঘোষণা করে সরকার। এক বছরেরও বেশি সময় যাবত্ এই হাসপাতালটিতে কোভিড আক্রান্ত ও উপসর্গ থাকা রোগীদের চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। গত মে মাসে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সংযোগ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল চত্বরে অক্সিজেন মজুদ রাখার ট্যাংকও স্থাপন করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তরল অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়নি। শুরুতে ১০টি আইসিইউ ও ৪০টি আইসোলেশন শয্যা নিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও পরবর্তীতে আইসোলেশন শয্যা ১০০ তে উন্নীত করা হয়। তবে দীর্ঘ এক বছর সময় অতিবাহিত হলেও হাসপাতালটিতে কেন্দ্রীয় (সেন্ট্রাল) অক্সিজেন সেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ইত্তেফাক/এসজেড
