কান চলচ্চিত্র উৎসবের বেশকিছু দিকে এবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেগুলো অন্যদিন লিখবো। তবে আগের মতোই উদ্বোধনী দিনে মধ্যাহ্নভোজের পর মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বিচারকরা সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এবার তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমেরিকান পরিচালক স্পাইক লি। এবারই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ কাউকে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে বিচারকদের সভাপতির আসনে দেখা যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছেন তিনি।
অস্কারজয়ী স্পাইক লি’র সাক্ষাৎ পেতে পালে দে ফেস্টিভাল ভবনের তৃতীয় তলার সংবাদ সম্মেলন কক্ষ কানায় কানায় পূর্ণ। মঞ্চের সামনে জটলা। দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট) কান উৎসবের পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমো কক্ষে ঢুকে হাততালির মাধ্যমে বিচারকদের স্বাগত জানালেন। সংবাদকর্মীদের মধ্যে হুররে টাইপ রোল পড়ে গেলো। বিচারকরা নিজ নিজ আসনের সামনে দাঁড়িয়ে। ক্যামেরায় একের পর এক ক্লিক পড়ছেই। মিনিট দুই চললো।

মঞ্চে ৭৪তম কান উৎসবের অফিসিয়াল পোস্টার। তবে তাতে শুধু চারটি পাম গাছ দেখা যাচ্ছে। অফিসিয়াল পোস্টারে স্থান পাওয়া স্পাইক লি’র আধো মুখ সংবাদ সম্মেলন কক্ষের দুই দিকে দুটি আলাদা পোস্টারে রাখা।
সাধারণত মে মাসে কান উৎসব হয়ে থাকে। কিন্তু মহামারির কারণে সাধারণ সময়ের চেয়ে দুই মাস বেশি সময় নিয়েছেন আয়োজকরা। তাও দুই বছরেরও বেশি সময় পর কান বসেছে। গত বছর কান উৎসবের ৭৩তম আসরে মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে বিচারকদের নেতৃত্ব দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন স্পাইক লি। কিন্তু কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের কারণে সেই আয়োজন বাতিল করতে হয়েছিলো। এরপর থেকে অনিশ্চয়তায় কেটেছে সবার।

এখনো মহামারির আশঙ্কা কাটেনি। এ কারণে বিচারকরা পুরো সংবাদ সম্মেলনে মুখে মাস্ক রেখেছেন। তবে শুরুতে মাস্ক ছাড়া ঢুকে অনেকক্ষণ সেভাবেই ছিলেন স্পাইক লি। পরে অবশ্য তিনিও মাস্ক তুলে নেন মুখে। কানে আগেও তাকে দেখেছি। তবে এবার ৬২ বছর বয়সী এই নির্মাতার কাঁধে স্বর্ণ পাম জয়ী ছবি নির্বাচনের গুরুদায়িত্ব। আগামী ১৭ জুলাই সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনিই তুলে দেবেন সম্মানজনক পুরস্কারটি।
মনে পড়ছে, ২০১৯ সালের কান উৎসবে লালগালিচায় দুই হাতের আঙুলে ‘লাভ’ (ভালোবাসা) ও ‘হেট’ (ঘৃণা) শব্দ লেখা আংটি পরে হাজির হয়ে আলোচনার জন্ম দেন স্পাইক লি। তার কাজে ও চলাফেরায় যেন চিরন্তন কিশোরের প্রতিফলন পাওয়া যায়। স্নিকার ও ক্যাপ ছাড়া কখনও তাকে দেখা যায়নি জনসমক্ষে।

আজ স্নিকারের সঙ্গে একটি টি-শার্ট ও যথারীতি ক্যাপ মাথায় সংবাদ সম্মেলনে হাজির স্পাইক লি। টি-শার্ট জুড়ে প্যারিস লেখা। মাথার টুপিতে উল্লেখ আছে ১৬১৯! সংখ্যাটিতে একটি বার্তা আছে। ১৬১৯ সালের আগস্টে একটি জাহাজে ২০ জনের বেশি আফ্রিকানকে দাসত্বের জন্য ভার্জিনিয়ার ইংরেজ কলোনিতে পৌঁছায়। আমেরিকা তখনো আমেরিকা হয়নি। কিন্তু সেটাই ছিলো আমেরিকায় দাসপ্রথার শুরু।
মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের বাকি আট বিচারকের পাঁচজনই নারী। তারা হলেন সেনেগাল-ফরাসি পরিচালক মাতি দিওপ, কানাডিয়ান-ফরাসি সংগীতশিল্পী মিলেন ফারমা, আমেরিকান অভিনেত্রী ম্যাগি জিলেনহাল, অস্ট্রিয়ার পরিচালক জেসিকা হাউসনা, ফরাসি অভিনেত্রী মেলানি ল্যঁহো। এছাড়া আছেন ব্রাজিলিয়ান পরিচালক ক্লেবার মেনদোনচা ফিলো, ফরাসি অভিনেতা তাহের রহিম এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অভিনেতা সঙ কাঙ-হো।

নেটফ্লিক্সের মতো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর ছবি কানের প্রতিযোগিতায় ঢুকতে পারে না। কারণ এগুলো ফরাসি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির শর্ত মেনে চলে না। গত বছর স্পাইক লি’র ‘ডা ফাইভ ব্লাডস’ মুক্তি পায় নেটফ্লিক্সে। সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি জবাবে বলেন, প্রেক্ষাগৃহ ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম একসঙ্গে চলতে পারে। একসময় মনে হতো, সিনেমাকে মেরে ফেলবে টেলিভিশন। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মও ব্যতিক্রম নয়। এগুলো সাইকেলের মতো।’
সংবাদ সম্মেলন শেষে অটোগ্রাফ চাইতেই সানন্দে দিয়ে দিলেন। এরপর সেলফিও তুললেন। বিভিন্ন দেশের কয়েকজন সংবাদকর্মী তাকে আরও কিছুক্ষণ আটকে রাখলেন আলাপে, সেলফি তোলার আবদারে। এত বিখ্যাত মানুষ, অথচ কত সাদাসিধে!
আফ্রিকান-আমেরিকান পরিচালকদের ওপর স্পাইক লি’র প্রভাব ব্যাপক। তাকে এক্ষেত্রে বলা যায় পথিকৃৎ। তার গড়ে দেওয়া পথ ধরে চলচ্চিত্র নির্মাণে এসে সফল হওয়া আফ্রিকান-আমেরিকানদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য— রায়ান কুগলার (ব্ল্যাক প্যান্থার), জর্ডান পিলে (গেট আউট), ব্যারি জেনকিন্স (মুনলাইট), অ্যাভা ডুভারনে (সেলমা)।

সেই ১৯৮৬ সালে প্রথমবার কানে আসেন স্পাইক লি। উৎসবটির প্যারালাল বিভাগ ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে স্পাইক লি’র প্রথম ছবি “শি’জ গটা হ্যাভ ইট’’ ইয়ুথ প্রাইজ জেতে। এরপর ১৯৮৯ সালে মূল প্রতিযোগিতায় স্থান করে নেয় তার ‘ডু দ্য রাইট থিং’। ১৯৯১ সালে ‘জঙ্গল ফিভার’ ছবির মাধ্যমে আবারও প্রতিযোগিতা বিভাগে ফেরেন তিনি। আউট অব কম্পিটিশন বিভাগে ১৯৯৬ সালে দেখা গেছে ‘গার্ল সিক্স’। ১৯৯৯ সালে ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটে ছিল তার ‘সামার অব স্যাম’। ২০০২ সালে তার ‘টেন মিনিটস ওল্ডার’ জায়গা পায় আঁ সাঁর্তে রিগায়। সব মিলিয়ে পাঁচবার কানের অফিসিয়াল সিলেকশনে স্থান করে নিয়েছে তার কাজ।

২২ বছর পর ২০১৮ সালে ‘ব্ল্যাকক্ল্যান্সম্যান’ ছবির মাধ্যমে কান উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে ফেরেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিন নিবাসী স্পাইক লি। বুড়িয়ে গেলেও ক্যামেরার পেছনে তেজ ও শৈল্পিক মনোভাবের সুস্পষ্ট প্রমাণ দিয়ে চলেছেন তিনি। দারুণ রসবোধ, গোয়েন্দাধর্মী থ্রিলার ও রাজনৈতিক আবহে সাজানো ছবিটি কানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার গ্রাঁ প্রিঁ পেয়েছে।

এরপর চিত্রনাট্যকার হিসেবে প্রথমবার অস্কার জেতেন তিনি। ১৯৮৯ সালে ‘ডু দ্য রাইট থিং’ ছবির জন্য সেরা মৌলিক চিত্রনাট্যকার বিভাগে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল তাকে। তবে ওইবার পুরস্কার জোটেনি কপালে। অবশেষে ৯১তম আসরে অস্কারের সোনালি মূর্তি পান তিনি। এর আগে ২০১৫ সালে সম্মানসূচক অস্কারে ভূষিত করা হয় তাকে।
স্পাইক লি একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, সম্পাদক ও প্রযোজক। চার দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য ছবি বানিয়েছেন তিনি, সময়ের সঙ্গে সেগুলো পেয়েছে ধ্রুপদী মর্যাদা। সিনেমায় নানান প্রশ্ন ও বিতর্কিত বিষয় তুলে ধরেছেন তিনি। জনসাধারণের দৃষ্টিকোণ থেকে নিজের একের পর এক ছবিতে যৌক্তিকতার সঙ্গে সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন। তার প্রতিটি কাজকে বলা যায় কৃষ্ণাঙ্গদের চিরকালের দুঃখ, যন্ত্রণা আর তাদের প্রতি বৈষম্যের কাব্য।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া রাজ্যের আটলান্টায় ১৯৫৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন স্পাইক লি। বেড়ে উঠেছেন নিউ ইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনে। প্রকৃত নাম শেলটন জ্যাকসন লি। শুরুতে লেখালেখিকে গুরুত্ব দিতেন। নিজের সব চিত্রনাট্য নিজেই লিখতেন। আমেরিকান সিনেমার মুক্তমনা মানুষটি শুরু থেকেই নিজের প্রতিটি ছবিতে জোরালো ও সাহসী বিষয়, ক্ষুরধার পরিচালনা, বলিষ্ঠ সংলাপ, ছন্দময় দক্ষতা ও জুতসই গানের সম্মিলন ঘটিয়েছেন।

স্পাইক লি’র ছবির তালিকায় আরও উল্লেখযোগ্য– ‘ম্যালকম এক্স’ (১৯৯২), ‘গেট অন দ্য বাস’ (১৯৯৬), ‘হি গট গেম’ (১৯৯৮), ‘দ্য ভেরি ব্ল্যাক শো’ (২০০০), ‘শি হেট মি’ (২০০৪), ‘ইনসাইড ম্যান’ (২০০৬), প্রামাণ্যচিত্র ‘ফোর লিটল গার্লস’, ‘হোয়েন দ্য লেভিস ব্রোক: অ্যা রিক্যুইয়েম ইন ফোর অ্যাক্টস’ (২০০৪)।
ইত্তেফাক/জেএইচ
