আইনি লড়াই-সমঝোতা কিছুতে নিস্তার নেই নারীর

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২১, ১২:৪৩

সম্প্রতি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কনকদিয়া ইউনিয়নের একটি ঘটনা সারাদেশে আলোচনার ঝড় তোলে। ‘প্রেমের টানে বাড়ি ছাড়ে দুই কিশোর-কিশোরী। তাদের আটক করে ডাকা হয় সালিশ। সালিশে কিশোর-কিশোরীর বাড়ি ছাড়ার ঘটনাটির সমাধান হবে বলে আশা করা হয়। কিন্তু সবাইকে অবাক করে মাত্র ১৪ বছর বয়সি সেই কিশোরীকে বিয়ে করেন ৬০ বছর বয়সি সালিশকর্তা ইউপি চেয়ারম্যান। বিয়েতে কনের পরিবার বাধ্য হয়ে রাজি হয়।

দুই মাস আগে ছয় বছরের একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয় একই এলাকার ডিশলাইনের দোকান কর্মচারী দ্বারা। এ বিষয়ে শিশুকন্যার মাকে মামলা করতে বললে তিনি বলেন, মামলা করতে হলে কী করতে হবে তা তিনি জানেন না। তখন ১০৯ নম্বরে ফোন দিলে অপরাধী ধরা পড়ে। কিন্তু মাসখানেক সময় অতিবাহিত হতে না হতেই বিষয়টি টাকার বিনিময়ে সমঝোতা হয়ে যায়। শিশুকন্যার মাকে বিষয়টি নিয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, আমার মেয়ের চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার। টাকা না হলে আমার মেয়ের চিকিৎসা হবে না। আর মামলা কইরা আমি কী পামু, হেরা খারাপ পোলা, তাই ট্যাকা নিয়া মীমাংসা করছি মামলা।

মহিলা নয়, যেন যৌন পুতুল! নারী-নির্যাতন সে দেশে আর পাঁচটা ঘটনার মতোই  'স্বাভাবিক'! | TheWall

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশে দ্রুত সুরক্ষা পেতে বিভিন্ন ধরনের হেল্পলাইন চালু রয়েছে। যেখানে দেশে যে কোনো প্রান্ত থেকে ফোন দিলেই অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে সহযোগিতা পাওয়া যায়। তবে এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, হেল্পলাইনে ফোন দিয়ে নিপীড়ন থেকে সাময়িক রক্ষা পাওয়া গেলেও সমঝোতার কারণে সমাজ থেকে নিপীড়ন দূর হচ্ছে না বরং দিনে দিনে নিপীড়ন বাড়ছেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে এ সমঝোতাগুলো করা হয়। ফলে অপরাধী পার পেয়ে যায়। এ ছাড়া সমাজে প্রকট ভাবে রয়েছে ভিকটিম ব্লেইমিং যেখানে ভুক্তভোগীকেই উলটো দোষী করা হয়। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, বিচারহীনতা, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধীকে আড়াল করার চেষ্টা, নিরাপত্তাহীনতা, দীর্ঘদিন মামলা ঝুলে থাকার মতো জটিলতায় ভুক্তভোগী বা তার পরিবার সমঝোতার পথে যেতে বাধ্য হয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

করোনাকালে নারী নির্যাতনের হার বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৮ হাজার ১২১ জন। অর্থাত্ প্রতিদিন গড়ে ৫৪ নারী শারীরিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এই পাঁচ মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৮৭ জন, যৌন সহিংসতার শিকার ৫১৭ জন, মানসিক নিপীড়নের শিকার ১ হাজার ১০৩ জন এবং যৌতুকের জন্য নির্যাতন সয়েছেন ৭১৩ জন নারী।

২০২০ সালে নিপীড়নের শিকার হন ১৭ হাজার ৮৭৬ জন নারী। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ১৭৬। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনি জটিলতায় কেউ যেতে চায় না, ফলে সমঝোতার দিকেই যায় বেশির ভাগ ঘটনা। এ জন্য সমাজব্যবস্থা অনেকটা দায়ী বলে মনে করছেন তারা। প্রাচীনকাল থেকে সালিশি ব্যবস্থা চলছে। অনেক ঘটনা অর্থের বিনিময়ে মিটমাট করতে চান। তাতে দোষীর শাস্তি হয় না। ফলে অপরাধ কমে না।

আগামীকাল থেকে শুরু আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ

বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী বলেন, সালিশ প্রথা বন্ধ করতে হলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। দ্রুত সমাধানের জন্যে অভিযোগকারী সালিশে রাজি হন। আর সালিশের উদ্দেশ্যই থাকে সমঝোতা করানো। আমাদের আইন আছে, কিন্তু ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষা, দ্রুত বিচারকার্যের ব্যবস্থা নেই বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আইনজীবী মাকসুদা আক্তার বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা সামাজিক চাপে সমঝোতার দিকে যান। এতে অপরাধী শাস্তি পায় না। ফলে অপরাধী আশকারা পেয়ে যায়, দ্বিতীয়বারও একই অপরাধ করার সাহস দেখায়। অন্যদিকে আইনি সহায়তা পেলেও ভুক্তভোগী অনেকে সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে আড়ালে থাকতে চান, ফলে অনেক ঘটনা জানা যায় না।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি