সামাজিকভাবে উপর্যুপরি হেনস্তার স্বীকার হওয়া, বিপরীত লিঙ্গে অধিক সুরক্ষা নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে বলে মনে করা, একটি বিশেষ লিঙ্গের মানুষকে সমাজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে মান্য করা অথবা এক লিঙ্গের মানুষের ভেতর বিপরীত লিঙ্গের আচরণগত বৈশিষ্ট্যের সিংহভাগ বিদ্যমান থাকায় সম্প্রতি মানুসের লিঙ্গ পরিবর্তনের হার বেড়েছে বিশ্বজুড়ে।
তবে এসব কারনগুলোর পাশাপাশি জেন্ডার ডিসফোবিয়ায় ভোগা মানুষেরা তাদের জন্মের সময় প্রাপ্ত লিঙ্গ এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে এক ধরনের ফোবিয়া বা অসন্তুষ্টির কারনেও লিঙ্গ পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকে থাকেন।
শরীরে কাঙ্খিত লিঙ্গের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হরমোন প্রয়োগ, যেমন পুরুষ হতে চাইলে নারীদেহে টেস্টোস্টেরন এবং নারী হতে চাইলে পুরুষদেহে প্রজেস্টেরন হরমোন প্রয়োগ, সার্জারির মাধ্যমে শরীরের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অঙ্গগুলো কেটে বাদ দেওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে সাধারণত লিঙ্গ পরিবর্তন করা হয়।
ডেনমার্কে বিশ্বে প্রথম সফলভাবে লিঙ্গ পরিবর্তনের সার্জারিটি হয় ১৯৫২ সালে। জর্জ জোর্গেনসন নামের সাবেক এক মার্কিন সৈন্যে লিঙ্গ পরিবর্তন করে পরিণত হন হলিউডের তত্কালীন সময়ে পরিচিত মুখ ক্রিস্টিন জোর্গেনসনে। তবে সামাজিক প্রতিরক্ষা ও ব্যক্তিগত আকাঙ্খার জের ধরেই লিঙ্গ পরিবর্তন করার দাবিকে মানতে নারাজ বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, সামাজিকভাবে প্রভাবিত ফ্যাক্টরগুলোর চেয়ে মানুষের জন্মের আগে জিন ও হরমোন দ্বারা সৃষ্ট জৈব রাসায়নিক সিগন্যাল লিঙ্গ পরিবর্তন আকাঙ্খার উপর বেশী প্রভাব ফেলে।
মনুষ্য ভ্রুণ ক্রমবিকাশের খুব প্রাথমিক ধাপে লিঙ্গ নির্ধারনকারী হরমোন যখন তৈরি হয়, ঐ সময় তার হরমোন লেভেল কোনো কারণে বদলে গেলে ফিনোটাইপেও এর প্রভাব পড়ে। ফলশ্রুতিতে প্রকৃতিগতভাবে নির্দিষ্ট এক লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ করার স্বাভাবিক যে প্রবণতা কাজ করার কথা, তা বিঘি্নত হয় অথবা ক্ষেত্রবিশেষ ঐ ব্যক্তির বাহ্যিক যৌনাঙ্গের গঠনও প্রভাবিত হয়। কিন্তু লিঙ্গ পরিবর্তন করে কুখ্যাত অপরাধীর গা ঢাকা দেওয়ার প্রচলন শুরু হওয়া, পরিবারের আশা আকাঙ্খার প্রেক্ষিতে জোর করে সন্তানকে লিঙ্গ পরিবর্তনে বাধ্য করা ও মানুষের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে প্রভাব পড়ার শঙ্কায় সমালোচিত হয়ে আসছে আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানের এ পদ্ধতিটি।
তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের উপর ভিত্তি করে প্রণিত ‘ইয়গিয়াকার্তা’ নীতিমালা বলছে, প্রত্যেকটি ব্যক্তির নিজ লিঙ্গের প্রতি অনুভূত অন্তর্নিহিত ভাবনা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে অস্ত্রপ্রচারের দ্বারা, চিকিত্সাগতভাবে বা অন্য কোনো উপায়ে স্বাধীনভাবে লিঙ্গ নির্বাচন করার অধিকার রয়েছে। সেই সাথে লিঙ্গের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য রীতিনীতি যেমন পোশাক, বক্তব্য, ব্যবহারের সামঞ্জস্যপূর্ণতা ঐ ব্যক্তির পছন্দমতোও হতে পারবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই নীতির তৃতীয় ধারামতে, কারও লিঙ্গের বৈধ স্বীকৃতির জন্য জোর করে সেঙ্ রিএসাইনমেন্ট সার্জারি, স্টেরিলাইজেশন বা হরমোন থেরাপির মত চিকিত্সা পদ্ধতি প্রয়োগ করা যাবেনা বলেও বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
তবে নারী-পুরুষের স্বতন্ত্র সক্ষমতা, স্মৃতি এবং আগ্রাসন প্রবণতা হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হয় বলে পরবর্তী জীবনে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস থেকে নির্গত হরমোন ব্যক্তি জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। যেমন, নারীর যৌন হরমোন একটি মাসিক চক্রের মধ্য দিয়ে যায় যা পুরুষের ক্ষেত্রে হয় না। লিঙ্গ পরিবর্তীত রূপে তাই কারো ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে শারীরিক জটিলতা। সেই সাথে নারী থেকে পুরুষে পরিবর্তীত হয়ে পুনরায় নারীতে ফিরে আসলে অনেকেই নারীসুলভ কণ্ঠ ও কমনীয়তা হারিয়ে ফেলেন।

