বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ২১:২২

পৃথিবীর প্রতিটি দেশ, জাতি বা সভ্যতা, প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব কিছু ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। সময়-কাল বা জাতি ভেদে এসব সংস্কৃতি ভিন্ন হতে পারে তবে নির্দিষ্ট সংস্কৃতি নির্দিষ্ট দেশ-কালের পরিচয় বহন করে। যুগ যুগ ধরে এসব সংস্কৃতি বিশ্বব্যাপী নিজের দেশ বা জাতিকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। বলা হয়ে থাকে, কোনো দেশ সম্পর্কে জানতে হলে শুরুতেই জানতে হবে সে দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিজস্ব কিছু সংস্কৃতি যা অন্যান্য দেশ থেকে সে দেশকে আলাদা করে এবং স্বতন্ত্রতা দান করে। ঠিক তেমনিভাবে বাংলাদেশেও রয়েছে কিছু নিজস্ব সংস্কৃতি। যুগ যুগ ধরে প্রচলিত থাকায় সংস্কৃতিগুলো বাঙালি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে এ বিষয়গুলো। বাঙালি ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিগুলোর ভেতর উল্লেখযোগ্য হলো—নবান্ন উত্সব, নৌকা বাইচ, যাত্রা পালা,  লোকজ সংগীত, লাঠি খেলা, মোরগ লড়াই, সাপ খেলা, বায়োস্কোপ, বৈশাখী মেলা, পালকির ব্যবহার ইত্যাদি। যুগ যুগ ধরে বাংলার গ্রামীণ উত্সব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে এ বিষয়গুলো।

এককালে নবান্ন উত্সবে মেতে উঠত গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘর। নানা রকম পিঠে-পুলিতে ম ম গন্ধে ভেসে যেত চারদিক। বাড়ি বাড়ি আদান-প্রদান হতো নানা রকম পিঠেপুলি। বর্ষার মৌসুমে কানায় কানায় পূর্ণ নদীগুলোতে চলত বিশাল বিশাল নৌকার বাইচ। বাহারি সাজে সাজানো হতো নৌকাগুলো। নদীর দুই তীরে হাজার হাজার মানুষ আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করত নৌকা বাইচ। পুরো বর্ষার মৌসুম জুড়ে চলত এ উত্সব। শীতের আগমন ঘটত যাত্রাপালা দিয়ে। শীতকালে সারা দিনের কর্ম-ব্যস্ততার পর গ্রামীণ সমাজে সন্ধ্যার পর বসত যাত্রা পালা। হাড় কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে আবাল-বৃদ্ধ সব বয়সি মানুষ জমায়েত হতো যাত্রা উপভোগ করতে। গ্রামে গ্রামে পুথি পাঠের আয়োজন হতো। বিভিন্ন স্থানের লোকজ সংগীতে উঠে আসত সমাজের বাস্তব চিত্র ও নানা ধরনের অসঙ্গতির কথা। গ্রামে গ্রামে আয়োজিত হতো বায়স্কোপ। নানা বয়সি লোক ভিড় জমাতো বায়োস্কোপ দেখতে। বৈশাখ মাসের প্রথম তিন দিন দেশের সব জায়গাতেই বৈশাখী মেলা উদ্যাপিত হতো। নানা ধরনের পসরা সাজিয়ে দোকানিরা বসত মেলা প্রাঙ্গণে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুষ্ঠিত হতো হালখাতা। অন্যরকম এক আমেজ বিরাজ করতো চারপাশে।

বাঙালি সত্তার সঙ্গে মিশে গেছে এ উত্সবগুলো। বহুকাল ধরে বাঙালির বিনোদন বা অবসর কাটত এ উত্সবগুলোকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়া শহরকে ভেদ করে গ্রামে পৌঁছে গেছে। শহরের জীবনযাপনের ন্যায় গ্রামীণসমাজেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। পোশাক-আশাক, খাদ্যাভাস, চাল-চলন, আচার-আচরণ, উত্সব-অনুষ্ঠান ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। এখন গ্রামে গ্রামে নবান্নের সেই আমেজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। নতুন ধানে পিঠে-পুলির আয়োজন হলেও তা হয় অনেকটা ক্ষুদ্র পরিসরে। বর্ষায় আগের মতো নৌকাবাইচ চোখে পড়ে না। লোকজ সংস্কৃতির পরিবর্তে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন আধুনিক গানে মত্ত সব বয়সি মানুষ। সাপ খেলা, বায়োস্কোপ তো প্রায় হারিয়েই বসেছে। পুঁথি পাঠ হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। বিয়েবাড়িতে ব্যবহূত অপরিহার্য পালকির ব্যবহারও চোখে পড়া ভার। পালকির বদলে জায়গা করে নিয়েছে বিভিন্ন ধরনের মোটরযান। বৈশাখী মেলার নেই সেই চিরচেনা রূপ। গ্রামীণ খেলাধুলার পরিবর্তে মোবাইল ফোনভিত্তিক বিভিন্ন খেলা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আধুনিকতা কেড়ে নিয়েছে আমাদের দেশীয় ঐতিহ্যকে। সর্বোপরি বলা যায়, নিজস্ব সংস্কৃতির পরিবর্তে জায়গা করে নিয়েছে বিভিন্ন পশ্চাত সংস্কৃতি।

সংস্কৃতির বিনাশের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির সম্প্রীতির বন্ধনও। ফলে মানুষের মাঝেও কমে আসছে আত্মার বন্ধন। এখন আগের মতো একে অপরের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে না, স্বার্থপরতায় ছেয়ে গেছে চারপাশ। বিনোদনের খোরাক হিসেবে মানুষ ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন বা টেলিভিশনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যার দরুন বিদেশি বিভিন্ন সংস্কৃতি অনায়াসেই জায়গা করে নিচ্ছে আমাদের মন ও মগজে। ফলে হারাতে বসেছে হাজার বছরের বাঙালি নিজস্ব সংস্কৃতি। স্বকীয়তা ভুলে আজ বাঙালি জাতি ভিনদেশি সংস্কৃতির দাসত্বের শিকার।

সংস্কৃতির এ আগ্রাসান রোধ করতে পারে দেশের জনগণের সচেতনতা। মহাত্মা গান্ধী একবার বলেছিলেন, একটি জাতির সংস্কৃতি বাস করে দেশের জনগণের হূদয় ও আত্মার মাঝে। বাঙালি জাতিকে এগিয়ে আসতে হবে নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষায়। নিজ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য নষ্ট হয় এমন ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি ফিরে পেতে গ্রহণ করতে হবে কিছু পদক্ষেপ। যদিও কোনো কোনো এলাকায় হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি রক্ষায় বিভিন্ন উত্সবের আয়োজন করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা নগণ্য। নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে হাজার বছরের পুরোনো সেই সংস্কৃতিকে। বছরের বিভিন্ন সময় আয়োজন করতে হবে সেসব উত্সবের। তবেই আস্তে আস্তে বাঙালি ফিরে পাবে তার ঐতিহ্য এবং স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হবে জাতি।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়