দর্শন ও বিজ্ঞান, শত্রু নাকি বন্ধু! মিল নাকি অমিল! এত কথায় না গিয়ে দুই ভাবে বলা যায়। যেখানে দর্শনের ব্যর্থতা, সেখানে বিজ্ঞানের শুরু; অথবা যেখানে বিজ্ঞান উত্তরহীন, সেখানে দর্শন তার উত্তর।
আরেকভাবে বললে—জ্ঞানের দুই পিঠ। দর্শন ও বিজ্ঞান। কিন্তু একই মুদ্রা—জ্ঞান। আর এই মুদ্রার ব্যবহার—সত্য খুঁজে পাওয়া। জ্ঞানের মুদ্রার বিনিময়ে সত্য খুঁজে বের করাই দর্শন ও বিজ্ঞানের কাজ। দর্শনের মূল হাতিয়ার যুক্তি ও বিজ্ঞানের মূল হাতিয়ার পদ্ধতি। আবার দুটো একই জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করে কী করে পৃথক হয়ে উঠল, তা নিয়ে আলোচনা যাওয়া যাক।
দর্শনের মূল অস্ত্র লজিক। খুব সহজ বাংলা-যুক্তি। আমরা প্রতিনিয়ত অনেক সমস্যার মুখোমুখি হই জীবনে। সেগুলোর কোনটি ভালো, কোনটি মন্দ, কোনটি নিলে ঠিক, কোনটি বাদ দিলে সঠিক—এমন সব দ্বন্দ্বে ভুগি। তখন দরকার পড়ে এমন একটি চিন্তাপদ্ধতি, যার মাধ্যমে সব সমস্যার সিদ্ধান্তে আসার একটি পথ বের করা যাবে। এই পদ্ধতিটিই হলো লজিক বা যুক্তি। বিতর্ক যুক্তি নয়, বিতর্ক হলো তারা জানার সীমাবদ্ধতার ঘরে নিজেকে নিজে হয়রানির হাত থেকে বাঁচতে আরেক জনকে অযথা হয়রানি করা। যুক্তি হলো কতগুলো প্রস্তাবের আন্তঃসম্পর্ক। প্রথমে কিছু প্রস্তাবকে সিদ্ধান্ত আকারে মানা হয়। সে সিদ্ধান্তের আলোকে অন্য আরো কিছু প্রস্তাবকে বিশ্লেষণ ও বিতর্কের মধ্যে দিয়ে আরেকটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া, যা প্রথম প্রস্তাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। লজিক হলো আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে তার সত্য-মিথ্যা নিরূপণের একটি চিন্তা পদ্ধতি। একটি লজিকের তিনটি পার্ট—প্রস্তাবনা, পদ্ধতি, সিদ্ধান্ত। দর্শনের যে প্রস্তাবনাগুলোর আলোকে সিদ্ধান্তটি আসে, তাদের বলে premises। Premises-এর আলোকে যে সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়, তাকে বলে proposition বা অন্যভাবে conclusion। তাহলে দাঁড়াল, কিছু আপাতসঠিক সিদ্ধান্তের আলোকে আরেকটি সিদ্ধান্তকে সঠিক ধরার বা প্রকাশের যে পদ্ধতি, সেটাই লজিক বা যুক্তি।
কথা এখানেই শেষ হলে তো দ্বন্দ্ব থাকে না। দ্বন্দ্বটা শুরু হয় একটা লজিক যে ঠিক, কী করে বুঝব! পদ্ধতি একটি উপায়, কিন্তু মানদণ্ড কী? লজিকের উদ্দেশ্য সত্য বের করা, সত্যটুকু প্রতিষ্ঠা করা। তাহলে সত্যটাই তার মানদণ্ড। এখন তাহলে প্রশ্ন করতে হয়—সত্য কী! কী করে জানি বা জানব এটি সত্য! তার যে মাপকাঠির নাম যে জ্ঞানকে ব্যবহার করছি, কী করে বুঝলাম সেটি সত্য! দর্শন ও বিজ্ঞান কি সত্য পরিমাপের মাপকাঠি?
আসলে দর্শন ও বিজ্ঞান দুটোই এক ধরনের পদ্ধতি। সত্য বের করার পদ্ধতি। কিন্তু সে পদ্ধতিতে প্রাপ্ত সিদ্ধান্ত যে সঠিক বা সত্য, তা কী করে বুঝব। দর্শনের একটি বিশাল উপশাখা রয়েছে এ নিয়ে! নাম :Epistemology। বাংলায় জ্ঞানতত্ত্ব। আমরা যা কিছু ভাবি, যা কিছু দেখি, যা কিছু শুনি, তার কোনটি সঠিক, কোনটি ভুল, তা কী করে বুঝব, এ নিয়ে দর্শনের যে আলোচনা, তাই এপিস্টেমলজি। Epistemology গ্রিক দুটো শব্দ থেকে আসা! Episteme মানে knowledge বা understanding, জ্ঞান বা বোঝা। logos মানে reason বা argument, কারণ বা বিতর্ক। এপিস্টেমলজি দর্শনের আধুনিক উপশাখা হলেও দর্শনের ইতিহাসের দৃষ্টিকোণে এপিস্টেমলজি আসলে দর্শনের শুরুর সময় থেকেই পাশাপাশি চলছিল। নলেজের তিনটি পার্টকে নিয়েই জ্ঞানতত্ত্বের পথচলা। truth, belief, justification। সত্য, বিশ্বাস ও যুক্তি। আবার অনেকের মতে, epistemology-র হাত ধরেই বিজ্ঞানের শুরু।
যেমন :প্লেটোর এপিস্টেমোলজি ছিল কোনো কিছু জানার চেষ্টা এবং. যে জানল, তার জানাটুকু তার জন্য কতটা ভালো বা খারাপ, তা নিরূপণের চেষ্টা। প্লেটোর জ্ঞানতত্ত্বে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য এসেছিল লব্ধ জ্ঞানের ব্যবহার উপযোগিতা দিয়ে।
আবার জন লকের এপিস্টেমলজি প্লেটোর পথ থেকে বেরিয়ে অন্য পথ ধরল। কী জানলাম আমরা—সেটার বিচার হবে কীভাবে জানলাম আমরা, তার মধ্যে দিয়ে। প্লেটো যেখানে যে জানছেন তার ব্যবহার উপযোগিতা দিয়ে জানার সত্য মিথ্যার চেষ্টা করছিলেন, লক সেখানে কী জানছেন তার চেয়ে কীভাবে জানছেন সেটা দিয়ে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের পথ বেছে নিলেন।
ইমানুয়েল কান্ট লকের মেথডকে একটু অন্য রকম করে ভাবতে চাইলেন। মানুষ কী করে জানেন যে তিনি কিছু জানছেন, এটি তার কিছু আপাত-কন্ডিশনের ওপর নির্ভর করে এবং সেই পরিস্থিতিগুলোর আলোকেই তিনি জানতে পারেন। তার মানে কি কখনোই আমরা পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে পারি না কোনটি পিউর সত্য, কিন্তু পুরোই বানানো! আমাদের জানাগুলো কি তাহলে আংশিক সত্য বা আংশিক মিথ্যার সংমিশ্রণ! বিশ শতকে এসে বার্ট্রান্ড রাসেল বিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতা, দুটোর সমন্বয়ে সত্যকে জানা ও বোঝার পথকে বেছে নিয়েছিলেন। সেই পথে কিছুকাল চললেও কার্ল পপারের ফলসিফিকেশন থিওরি এপিস্টোমোলজির সুতোটা আবার ভেঙে দেয়। পপারের থিওরির মতে—বিজ্ঞান সেটাই, যা একই সঙ্গে পরীক্ষায় প্রমাণিত, আবার ধরে নিতে হবে যে এটি আপাতপ্রমাণিত, কিন্তু যে কোনো সময় ভুল প্রমাণিত হতে পারে। তার মানে রাসেল যখন লক ও কান্টের পথকে এক করে দর্শন এবং বিজ্ঞানের যৌথ প্রয়োগে এপিস্টেমলজির আরেকটি পথ তৈরি করেছিলেন, কার্ল পেপার সেটাতেও সংশয় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। যা জানলাম, সেটাও পূর্ণাঙ্গ সত্য নয়, বরং অসত্য প্রমাণেই তার সত্যতাটুকু নিহিত।
দার্শনিকরা ভাবেন, সত্য জানার উপায় তার প্রক্রিয়ার মধ্যে। বিজ্ঞানীদের দাবি—প্রক্রিয়া যদি সত্য জানার সবচেয়ে ভালো উপায় হয়, বিজ্ঞানের ইন্ডাক্টিভ মেথড তার মধ্যে সেরার সেরা, যা দিয়ে সত্য বোঝা যায়। কিন্তু দর্শন এবং দার্শনিকরা তা মানতে নারাজ। বিজ্ঞানের পদ্ধতি একমাত্র চূড়ান্ত নয়। কারণ বিজ্ঞান তার ইন্ডাক্টিভ পদ্ধতিতে মেটার বা বস্তুসংক্রান্ত পদ্ধতিতে সত্য বোঝার উপায়টির যে উত্তর দেয়, একই পদ্ধতি অনুসরণ করে নন মেটার বা অবস্তুতে একই উত্তর পাওয়া যায় না এবং অবস্তুর ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি খাটে না।
বিজ্ঞান মনে করে সত্য মানে যা রিয়েলিটি, আর রিয়েলিটি সেটাই, যা ফ্যাক্টস। কিন্তু দর্শন বলে বিজ্ঞানের শুধু সেই সময়, সেই টুলস এবং সেই উপাত্ত পর্যন্ত ঠিক, উপাত্তের পরিবর্তন, যন্ত্রের পরিবর্তন এবং পর্যবেক্ষণের পরিবর্তন সেই রিয়েলিটির আড়ালে আরেকটি রিয়েলিটি হাজির করে। তার মানে প্রাপ্ত ফেক্টস শুধু কিছু ফ্যাক্টস সেই সময়ের জন্যে, সেটি কখনোই রিয়েলিটি না, আর যা রিয়েলিটি না, তা সত্য নয়। সত্য যাচাইয়ে বিজ্ঞানের ইন্ডাক্টিভ মেথড যে অসম্পূর্ণ, এটি প্রথম তুলে ধরেন ব্রিটিশ ফিলোসোফার ডেভিড হিউম। দার্শনিকরা তাদের মতামত এবং বিশ্লেষণ দিয়ে বিজ্ঞান এবং দর্শনের আলাদা পথ যেমন বানিয়ে ফেলেছেন, তেমনি দর্শন ও বিজ্ঞান একটা সময়ে একই জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করে একটা সময় পর পৃথক পথে একই উদ্দেশ্যকে লক্ষ্য রেখে কাজ করছে।
জ্ঞানরাজ্যে দর্শনকে বলে রাজা। আর এই দর্শন থেকেই জ্ঞানের দুটি মূল শাখা। একটি হলো দর্শন, আরেকটি বিজ্ঞান। মানুষ কীভাবে চিন্তা করবে, এটি গাইড দেয় দর্শন। সে চিন্তা কীভাবে কাজে লাগবে, সেটার পথ জোগায় বিজ্ঞান। দর্শনের গাইডে প্রকৃতিকে জানার বিশেষ জ্ঞান প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে বিজ্ঞান। প্রাচীনকালে, গ্রিক দর্শনের দুটো শাখা ছিল। ফিজিকস ও মেটা-ফিজিকস। আজকে যাকে পদার্থবিদ্যা বা ফিজিকস বলা হয়, সেটা দর্শনের হাত ধরেই আসে। তখন যা ফিজিকস বা পদার্থ বা বস্তু, তার সম্পর্কিত জ্ঞানই ছিল দর্শন। দর্শনের আরেকটি শাখা হলো মেটা ফিজিকস বা যা ফিজিকসের বাহিরে। অর্থাত্ যা বস্তু নয়, বস্তুর বাহিরে এমন জ্ঞান। যেমন :ধর্ম, স্রষ্টা, অনুভূতি, যুক্তি, আইন, রাজনীতি।
পনেরো শতকের দিকে দর্শনের ফিজিকস হয়ে উঠল ধীরে ধীরে বিজ্ঞান, আর মেটা ফিজিকস থেকে বিকশিত হতে লাগল রাজনীতি, অর্থনীতি, মনস্তত্ত্ব, ভাষা, সমাজনীতি। মূল দর্শনে পড়ে রইল যুক্তি, ধর্মতত্ত্ব, আইন, এবং মানুষ কী করে বুঝবে যা সে জানে-বোঝে, সেটি একটি জ্ঞান। এমন করে জ্ঞানের রাজা দর্শনজ্ঞানের প্রতিটি শাখাকে গাইড দিয়ে দিয়ে নিয়ে গেল অনেক দূরে। তাই দর্শন না বুঝলে আপনি কী বুঝলেন, সেটাই বুঝবেন না। আর দর্শন বুঝলে যা-ই জানবেন, সেটাই বুঝের আলো হয়ে ধরা দেবে।
দর্শন ও বিজ্ঞান আসলে জ্ঞানের অমীমাংসিত পথে একই উদ্দেশ্যে দুটি পথ। দুজন কখনো বন্ধু, কখনো সমালোচক! কিন্তু দিন শেষে লক্ষ্য একই—সত্য কী, বুঝতে চেষ্টা করা।
n লেখক :লন্ডন প্রবাসী কথাসাহিত্যিক
ও বিজ্ঞান গবেষক

