ফৌজদারি মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের নামে আসামিকে পাঠানো হয় রিমান্ডে। তদন্তের স্বার্থেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আদালতের অনুমতি নিয়ে এই জিজ্ঞাসাবাদ চলে। তবে অনেক মামলায় দফায় দফায় রিমান্ড মঞ্জুরের ঘটনাও ঘটে। প্রয়োজন নেই, অথচ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে একাধিকবার রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে উচ্চ আদালতে ও জনমনে। তবে রিমান্ড আবেদন এবং তা মঞ্জুরের অপব্যবহার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য পৃথক নীতিমালা করে দিয়েছিল সর্বোচ্চ আদালত। এই নীতিমালা প্রতিপালনে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটগণ যে শৈথিল্য দেখাচ্ছেন, তা উঠে এসেছে উচ্চ আদালতের দেওয়া একাধিক রায় ও আদেশে। এ ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বলেছে, ম্যাজিস্ট্রেটরা (সাধারণত যেভাবে করে থাকেন) এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করেননি। তারা সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা, নীতিমালা ও রিমান্ড-সংক্রান্ত আইন অনুসরণ করছেন না, যা ফৌজদারি আইন ও নিরপেক্ষ তদন্তের পরিপন্থি।
অভিযুক্তকে রিমান্ডে নেওয়ার নামে বিচারিক সময় ও অর্থের অপচয় কাম্য নয়। এ বিষয়ে বিচারকদের আরো সতর্ক হতে হবে। সম্প্রতি চিত্রনায়িকা পরীমনি ও মডেল মরিয়ম আক্তার মৌকে মাদক মামলায় একাধিকবার রিমান্ডে পাঠানোর ঘটনায় ম্যাজিস্ট্রেটগণ সর্বোচ্চ আদালতের গাইডলাইন এবং এ-সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন করেছেন, এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছে হাইকোর্ট।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ-সংক্রান্ত মামলায় ১৮ বছর আগে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের সেই রায় কিছুটা সংশোধন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য পৃথক পৃথক নীতিমালা করে দিয়েছে আপিল বিভাগ। কিন্তু এই নীতিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের ওপর, অনেক সময় তারাই তা প্রতিপালন করছেন না। তাহলে আপিল বিভাগের এই রায়ের বাস্তবায়ন কবে হবে?

১৯৯৮ সালে ঢাকায় ডিবি হেফাজতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রুবেল। ঐ ঘটনায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর দায়েরকৃত এক রিট মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৩ সালে হাইকোর্ট ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে ১৬৭ ধারার বিধান সংশোধনের নির্দেশনা দেয়। এ-সংক্রান্ত আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত একগুচ্ছ নির্দেশনা মেনে চলার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলা হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে দেয় আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য পৃথক নীতিমালা করে দেয় সর্বোচ্চ আদালত। এই রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে রিভিউ পিটিশন দায়ের করে রাষ্ট্রপক্ষ।
গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঐ রিভিউ পিটিশন শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসে। তখন অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশ্যে আপিল বিভাগ বলে, ১৮ বছর আগে হাইকোর্ট রায় দিয়েছে। সেই রায়ের বাস্তবায়ন কোথায়? তাহলে রায় দিয়ে লাভ কী? তখন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছিলেন, ‘আমরা রায় রিভিউ চেয়েছি।’ আপিল বিভাগ বলে, রায়ের কোথায় কোথায় আপত্তি সেটা আপনাকে স্পষ্ট করে বলতে হবে। পুরো রায় রিভিউ হবে না। এর পরই ঐ বছরের এপ্রিল মাসে রিভিউর ওপর শুনানির জন্য দিন ধার্য করে দেয় আপিল বিভাগ। কিন্তু মার্চ মাস থেকে দেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হয়। বন্ধ হয়ে যায় আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম। গত বছর করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। বর্তমানে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বে রয়েছেন অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন। তবে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করায় তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
রায় বাস্তবায়ন না হওয়া প্রসঙ্গে সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম কে রহমান ইত্তেফাককে বলেন, আপিল বিভাগের রায় বাস্তবায়ন করতে নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ বাধ্য। যদি সেই রায় না মানা হয় তাহলে তা আদালত অবমাননাকর। আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও সংবিধান মানলে এই রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি না করা হয় তাহলে তা আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থি। তিনি বলেন, রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটকে যৌক্তিক কারণ দেখতে হবে। যখন আপিল বিভাগের রায় বাস্তবায়নে বা প্রতিপালনে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা অনীহা বা শৈথিল্য প্রদর্শন করে তখন সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট থেকে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। যদি এটা করা হয় তাহলে রিমান্ডের অপব্যবহার বন্ধ হবে।
আপিল বিভাগের নীতিমালায় কী আছে :
নীতিমালায় বিচারকদের প্রতি দেওয়া উল্লেখযোগ্য নির্দেশনাগুলো নিম্নরূপ :আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ যদি আইনের বাইরে গিয়ে কাউকে আটক করে থাকেন, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট দণ্ডবিধির ২২০ ধারায় ঐ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭(২) ধারা অনুসারে ডায়ারির অনুলিপি ছাড়া কাউকে আদালতে হাজির করে আটকাদেশ চাইলে ম্যাজিস্ট্রেট, আদালত, ট্রাইব্যুনাল একটি বন্ড গ্রহণ করে তাকে মুক্তি দিয়ে দেবেন। আটক থাকা কোনো ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট মামলায় যদি গ্রেফতার দেখাতে চায়, সেক্ষেত্রে যদি ডায়ারির অনুলিপিসহ তাকে হাজির না করা হয়, তাহলে আদালত তা মঞ্জুর করবে না। গ্রেফতার দেখানোর আবেদনের ভিত্তি না থাকলে বিচারক আবেদন খারিজ করে দেবেন। হেফাজতে কারো মৃত্যু হলে বিচারক মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে মৃত ব্যক্তিকে পরীক্ষা করবেন। নিপীড়নে মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদন পাওয়া গেলে হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন অনুসারে ঐ কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট থানার ওসি বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কমান্ডিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে নিতে হবে। ফরওয়ার্ডিং লেটার এবং মামলার ডায়ারিতে কোনো ব্যক্তিকে আটক রাখার জন্য সন্তোষজনক কারণ পাওয়া গেলে বিচারক পরবর্তী বিচারিক পদক্ষেপের আগ পর্যন্ত তাকে আটক রাখার আদেশ দিতে পারেন। আটক ব্যক্তিকে কোনো আদালতে হাজির করা হলে ১৬৭ ধারায় শর্তগুলো পূরণ হয়েছে কি না, তা দেখা ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারকের দায়িত্ব।
রায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি উল্লেখযোগ্য নির্দেশনা হচ্ছে :গ্রেফতারের পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা গ্রেফতারের একটি স্মারকপত্র তৈরি করবেন এবং এতে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির স্বাক্ষর, তারিখ লিপিবদ্ধ থাকবে। গ্রেফতারের পর ১২ ঘণ্টার মধ্যে অবশ্যই তার কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, তা না পাওয়া গেলে ঐ ব্যক্তির পরামর্শে কোনো বন্ধুকে গ্রেফতারের স্থান এবং হেফাজতে রাখার বিষয়টি অবহিত করবেন। কোন যুক্তিতে, কার তথ্যে বা অভিযোগে ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে ঠিকানাসহ তা কেস ডায়ারিতে লিখতে হবে। আটক ব্যক্তি কোন কর্মকর্তার তদারকিতে আছেন তাও উল্লেখ করতে হবে। মামলা নিবন্ধন হওয়ার পর আটকাদেশ বা ১৬৭(২) অনুযায়ী হেফাজত চাইতে পারবেন।
ব্লাস্টের কৌঁসুলি রেজাউল করিম ইত্তেফাককে বলেন, রায়ের ওপর কোনো স্থগিতাদেশ নাই। রিভিউ শুনানির জন্য রয়েছে। আমরা শুনানির জন্য প্রস্তুত রয়েছি। যখন কার্যতালিকায় আসবে তখনই শুনানি করব।
ইত্তেফাক/এসএ
