বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ভাষা সৈনিক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জননেতা আব্দুর রৌফ চৌধুরীর ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আগামীকাল (২১ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার)। তিনি ছিলেন বৃহত্তর দিনাজপুরের (দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও) রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। তার একমাত্র ছেলে দিনাজপুর-২ আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগ নেতা খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সরকারের নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন।
তিনি ১৯৩৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) দিনাজপুর জেলার বোঁচাগঞ্জ থানার ধনতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সমাজ সেবক মৌলভী খোরশেদ চৌধুরী এবং মাতা আয়েশা খাতুন চৌধুরী। রৌফ চৌধুরী ১৯৬২ সালে পঞ্চগড়ের ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন সরকারের জ্যেষ্ঠ কন্যা রমিজা বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ৫ কন্যা ও এক পুত্রের জনক। ২০০৭ সালের ২১ অক্টোবর না ফেরার দেশে চলে যান আওয়ামী লীগের সাবেক এ কেন্দ্রীয় নেতা।

রাজনৈতিক জীবন
আব্দুর রৌফ চৌধুরী ১৯৫২ সালে সিরাজগঞ্জ থেকে মেট্টিকুলেশন, এরপর ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি ও দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। সিরাজগঞ্জে পড়ার সময়েই তিনি ভাষা আন্দোলনে একজন সক্রিয় সংগঠক ছিলেন এবং এজন্য তাকে কারাবরণ করতে হয়। পরে এইচএসসি পরীক্ষা দেন ঢাকা কলেজ থেকে। সেখানে পড়াবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে দিনাজপুরে ফিরে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করেন।
তিনি পাকিস্তান আমলে বৃহত্তর দিনাজপুর (দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড়) জেলা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পরপর ১৯৭২ সালে কৃষক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ছাত্র সংসদের নেতৃত্ব দেন। ছিলেন কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ এর পূর্ববর্তী সময়ে দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন একাধারে ১৫ বছর।
জননেতা আব্দুর রৌফ চৌধুরী ১৯৯০ সালে বোচাগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে দিনাজপুর-১ আসন (বীরগঞ্জ- কাহারোল) থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০০২ সালে জোট সরকারের শাসনামলে ১৫ আগস্ট সেতাবগঞ্জে জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচিতে পুলিশের বাধার সম্মুখীন হয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। এ আঘাত থেকে আর পুরোপুরি সেরে উঠতে পারেননি এ নেতা।

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন তিনি। এসব অঞ্চলে পঁচাত্তর পরবর্তী সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে সামনের কাতারে নেতৃত্ব দেন।
মুক্তিযুদ্ধ আব্দুর রৌফ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধকালে মুজীবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের দূত হিসেবে ছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় জোনে। সেই সঙ্গে বোচাগঞ্জ উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর বোচাগঞ্জ উপজেলাকে পাক-হানাদার মুক্ত করেন।
ক্রীড়াজীবন
৫০ থেকে ৬০-এর দশকে ফুটবল খেলায় দিনাজপুরের জন্য অনেক সুনাম বয়ে এনেছিলেন তিনি। তৎকালীন স্থানীয় ডি.এস.এ দলের অপরিহার্য খেলোয়াড় ছিলেন এবং দিনাজপুর ডি.এস.এ দলের হয়ে রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, পাবনা, রাজশাহী জেলায় নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে জয়ের মুকুট ছিনিয়ে আনেন। সেই সময় উত্তরবঙ্গের সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচিত হয়ে ছিলেন। খেলোয়াড়ের পাশাপাশি তিনি সফল ক্রীড়া সংগঠকও ছিলেন। তার নির্দেশনায় অনেক কৃতী খেলোয়াড় গড়ে ওঠেন।
কর্মসূচি
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বোচাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচিতে জেলা আওয়ামী লীগ, পার্শ্ববর্তী অন্যান্য জেলা-উপজেলা, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নেবে।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, ২১ অক্টোবর বুধবার সকাল ৮টায় দলীয় কার্যালয়ে জাতীয়, দলীয় ও কালো পতাকা উত্তোলন ও কালো ব্যাজ ধারণ। সকাল সাড়ে ৮টায় মরহুমের সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ। সকাল সাড়ে ৯টায় দোয়া মাহফিল (মরহুমের সমাধিস্থল), সকাল সাড়ে ১০টায় আব্দুর রৌফ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে স্মরণ সভা ও দোয়া। আওয়ামী লীগ ছাড়াও আব্দুর রৌফ চৌধুরী ফাউন্ডেশনসহ স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন, কোরআনখানি ও মিলাদ আয়োজনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
ইত্তেফাক/জেডএইচডি
