যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডে চেক জালিয়াতির আরও একটি নতুন ঘটনা উদঘাটিত হয়েছে। এতে নতুন করে আরও প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে চেক জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় কোটি টাকা আত্মসাত হয়েছে। ২০১৭ থেকে এ পর্যন্ত ২৬টি চেকে ১৪ লাখ টাকার ৮৩ হাজার ৭৪২ টাকার বিপরীতে জালিয়াতির মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে।
এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনে আরও একটি নতুন অভিযোগ দিয়েছে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ। নতুন অভিযোগও হিসাব সহকারী আবদুস সালাম ও বর্তমান চেয়ারম্যান মোল্লা আমীর হোসেন সচিব থাকাকালীন সময়ের। তবে প্রশ্নে উঠেছে গত ৫ বছরে বোর্ডের অভ্যন্তরীণ অডিট ফাঁকি দিয়ে কিভাবে জালিয়াতি চক্র পার পেয়ে গেল।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বোর্ড চেয়ারম্যান, সচিব ও হিসাব সহকারীর নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট এই অর্থ আত্মসাতে জড়িত থাকায় জালিয়াতির বিষয়টি ধামাচাপা অবস্থায় ছিল।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগের উপ-পরিচালক এমদাদুল হক বলেন, আবদুস সালাম (হিসাব সহকারী) আগে অডিট শাখায় কর্মরত ছিল। সে জালিয়াতির বিষয়টি ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছিল। আর ঐ সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনিচ্ছাকৃত ভুলে জালিয়াতির বিষয়টি নজর এড়িয়ে গেছে। অডিট শাখায় নতুন লোক নিয়োগ হয়েছে। চেক যাচাই বাছাই করতে গিয়ে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়েছে। জালিয়াতির বিষয়ে দুদকে অভিযোগ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত চেক জালিয়াতির মাধ্যমে ৪ কোটি ৯৪ হাজার টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন যশোর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. নাজমুচ্ছায়াদাত জানান, ইতোমধ্যে শিক্ষাবোর্ডের চেক জালিয়াতির মাধ্যমে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৫ জনের নামে মামলা হয়েছে। আরও প্রায় আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পেয়েছি। পূর্বে দায়েরকৃত মামলার তদন্তে নতুন করে পাওয়া অভিযোগের বিষয়টি সংযুক্ত হবে। নতুন অভিযোগ পর্যালোচনা করা হবে।
শিক্ষাবোর্ড সূত্র জানায়, চেক জালিয়াতির মাধ্যমে নতুনভাবে উন্মোচিত ঘটনায় ২ কোটি ৪৩ লাখ ৭ হাজার ৮৭৮ টাকা আত্মসাত হয়েছে। এরমধ্যে ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট বিজনেস আইটি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে আয়কর বাবদ ১২ হাজার ২৭৬ টাকার বিপরীতে ৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৩৪ টাকা তুলে নেওয়া হয়। একই সালের ৪ অক্টোবর শহরের জামে মসজিদ লেনের নূর এন্টারপ্রাইজ নামে ৫৮ হাজার ৩৫ টাকার বিপরীতে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৩৫ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৯ এপ্রিল মেসার্স খাজা প্রিন্টিং প্রেসের নামে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৫৩০ টাকার বিপরীতে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৩০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই তারিখে নিহার প্রিন্টিং প্রেসের নামে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৫৩০ টাকার বিপরীতে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ২০১৯ সালে ১৯ আগস্ট সামিয়া ইলেকট্রনিক্সের নামে ৫৫ হাজার ৭৬২ টাকার বিপরীতে ৩০ লাখ ৮৯ হাজার ৯০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই বছরের ৮ জুলাই নূর এন্টারপ্রাইজের নামে ৮১ হাজার ৪৭৬ টাকার বিপরীতে ১৫ লাখ ৮৯ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
একই বছরের ৭ অক্টোবর সেকশন অফিসার আবুল কালাম আজাদের নামে ইস্যুকৃত ৯৪ হাজার ৩১৬ টাকার বিপরীতে ৩০ লাখ ৯৮ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই বছরের ২৬ নভেম্বর নূর এন্টারপ্রাইজের নামে ইস্যুকৃত ৭৮ হাজার ৭০৭ টাকার বিপরীতে ৩৫ লাখ ৯৮ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি মিম প্রিন্টিং প্রেসের নামে ইস্যুকৃত ২০ হাজার ২৪০ টাকার বিপরীতে ২৫ লাখ ৮০ হাজার ১০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই বছরের ৪ মার্চ সাধারণ সহকারী (বর্তমানে হিসাব সহকারী) আবদুস সালামের নামে ইস্যুকৃত ৬ হাজার ১৯৫ টাকার চেকের বিপরীতে ২৫ লাখ ৮০ হাজার ১০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই বছরের ১২ মার্চ শাহী লাল স্টোরের নামে ইস্যুকৃত ১১ হাজার ১৯৯ টাকার চেকের বিপরীতে ৩৫ লাখ ৮০ হাজার ১০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই বছরের ৩১ আগস্ট নূর এন্টারপ্রাইজের নামে ইস্যুকৃত ৯২ হাজার ৩৪৬ টাকার চেকের বিপরীতে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৩০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই বছরের ১২ নভেম্বর নূর এন্টারপ্রাইজের নামে ইস্যুকৃত ১৬ হাজার ৮৩৩ টাকার চেকের বিপরীতে উত্তোলন করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৪০৩ টাকা। একই বছরের ১৭ ডিসেম্বর শরীফ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিংয়ের নামে ইস্যুকৃত ২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫০ টাকার চেকের বিপরীতে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৪৫০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ২০২১ সালের ১৩ জুন অর্পানেটের নামে ইস্যুকৃত ২১ হাজার ১৭৭ টাকার চেকের বিপরীতে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৪০৭ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই বছরের ১৩ সেপ্টেম্বরর অর্পানেটের নামে ইস্যুকৃত ২৭ হাজার ৭৫৮ টাকার চেকের বিপরীতে ৩ লাখ ৩১ হাজার ২৩৯ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
এর আগে ১৮ অক্টোবর আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৫ জনকে আসামি করে মামলা করে দুদক। দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয় যশোরের সহকারী পরিচালক মাহফুজ ইকবাল এই মামলা করেন। অভিযুক্তরা হলেন যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোল্লা আমীর হোসেন, সচিব অধ্যাপক এএম এইচ আলী আর রেজা, হিসাব সহকারী আবদুস সালাম, প্রতারক প্রতিষ্ঠান ভেনাস প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিংয়ের মালিক রাজারহাট এলাকার বাসিন্দা আবদুল মজিদ আলীর ছেলে শরিফুল ইসলাম বাবু, ও শেখহাটী জামরুলতলা এলাকার শাহীলাল স্টোরের মালিক মৃত সিদ্দিক আলী বিশ্বাসের ছেলে আশরাফুল আলম। মামলা হবার পর ঐদিন রাতেই চেয়ারম্যান ও সচিব তাদের বাংলো থেকে বের হয়ে যান। এরপর তারা কেউ অফিসে আসেননি।
শিক্ষাবোর্ড কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোল্লা আমীর হোসেন ও হিসাব সহকারী আবদুস সালামের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন চেক জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাত করেছে। তাদের স্বপদে বহাল রেখে নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব নয়। অর্থ আত্মসাতে যাদের নামে এসেছে, তাদেরকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।
ইত্তেফাক/এমএএম
