নগরীর বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের (এম এ মান্নান ফ্লাইওভার) একটি পিলারে ফাটল দেখা দেওয়ায় জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা অভিমুখে আরাকান সড়কের ওপর উঠা-নামার জন্য নির্মিত পাশাপাশি দুটি র্যাম্পের পূর্ব পাশের একটি পিলারের ওপরের অংশে মারাত্মক ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে গত সোমবার রাত ১০টা থেকে পুলিশ দুটি র্যাম্প দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এদিকে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারে আরাকান সড়ক অংশের র্যাম্পের পিলারের ফাটল সৃষ্টি নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) মধ্যে পরস্পরকে দোষারোপ করে আঙুল তুলতে দেখা গেছে।
ফাটল ধরা র্যাম্পের নিচের সড়কটিতে যানবাহন চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। হকার, অস্থায়ী দোকানপাট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যপাশের র্যাম্পের নিচের সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মইনুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, শোলকবহর থেকে কর্ণফুলী ব্রিজ অভিমুখে ফ্লাইওভারের মূল অংশ দিয়ে যানবাহন যথারীতি চলাচল করছে। সিটি করপোরেশন ও সিডিএর প্রকৌশলীরা ফ্লাইওভারের ফাটল অংশ পরিদর্শন করেছেন। বিশেষজ্ঞদের খবর দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার পিলারের ফাটল দেখতে প্রকৌশলীদের সঙ্গে নিয়ে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার এলাকায় যান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। পরে সাংবাদিকদের মেয়র বলেন, ফ্লাইওভার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো ধরনের ভুলত্রুটি ছিল কি না, তা তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে। আমরা সিডিএকে চিঠি দেব, কারণ তাদের তত্ত্বাবধানে এটি নির্মিত হয়েছে। তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এটা সিডিএর অধীনের প্রকল্প। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সিডিএকে চিঠি দেওয়া হবে।
নগরীতে প্রথমবারের মতো নির্মিত বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের চান্দগাঁও অভিমুখী অংশের দায়-দায়িত্ব সিডিএর বর্তমান কর্মকর্তাগণ নিতে চাইছেন না। সিডিএর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, মূল বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণের অনেক পর বহদ্দারহাট থেকে চান্দগাঁও অভিমুখী দুটি র্যাম্প সংযোগ করা হয়। এটির জন্য কোনো ডিপিপি বা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পাশ করা হয়নি। সিডিএর বিগত চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত একজন প্রকৌশলী জানান, ডিপিপি অনুমোদন না থাকায় সিডিএ কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে কোনো টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। এর ফলে এই দুটি র্যাম্প নির্মাণের তদারকির জন্য কোনো অফিসিয়াল প্রকল্প পরিচালক ছিল না।
জানা যায়, প্রকল্প পরিচালক অফিসিয়াল পিডি না থাকলেও সিডিএর একজন নির্বাহী প্রকৌশলী র্যাম্প দুটি নির্মাণ কাজ তদারকি করেছেন। এমনকি বহদ্দারহাট মূল প্রকল্পের পারমর্শক প্রতিষ্ঠান ডিপিএম-এর তত্ত্বাবধানে কাজটি হয়েছে বলে জানা যায়।
জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর দায়িত্বে থাকা বিগত চেয়ারম্যানের সময় শুধুমাত্র একটি বোর্ড সভায় বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের সাথে দুটি র্যাম্পের সংযোগ করে চান্দগাঁও অভিমুখী স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এই অংশটির কাজ মানসম্পন্ন না হওয়ার কারণে অল্পদিনের মধ্যেই কলামে স্ক্র্যাচ সৃষ্টি হয়েছে বলে সিডিএর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী জানান। তাছাড়া প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ফ্লাইওভারে এই অংশের নির্মাণ ব্যয়ের উত্স কী তা সকলের অজ্ঞাত রয়েছে।
সিডিএ কর্তৃক প্রথমবারের মতো নগরীর বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণকালে ফ্লাইওভারের গার্ডার পড়ে অন্তত ১৭ জন লোক মারা যায়। সিডিএ কর্তৃক নির্মিত ঐ ফ্লাইওভার নির্মাণে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ঐ সমুদয় অর্থ সিডিএর নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হয়। এ নিয়ে সিডিএ কর্মকর্তা-কর্মচারীর পক্ষ থেকে তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করায় অনেককে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। তাছাড়া ঐ ফ্লাইওভার নির্মাণে প্রাণহানিসহ অন্যান্য ত্রুটির কারণে জনমনেও বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করতে দেখা যায়। এমনকি চট্টগ্রাম নগর পরিকল্পনাবিদগণ সে সময় সংবাদ সম্মেলন করে ঐ ফ্লাইওভার নির্মাণের ব্যাপারে আপত্তি তোলেন।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী হাসান বিন শামস ইত্তেফাককে বলেন, যে পিলারটিতে ফাটল ধরেছে এটি মূল ফ্লাইওভারের অংশ নয়। চান্দগাঁর দিকে আরাকান সড়কের ওপর নির্মিত দুটি র্যাম্পের একটি। সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের সময় নির্মাণ করা মূল পরিকল্পনার বাইরের একটি এক্সটেনশন মাত্র। আমরা ফ্লাইওভারটি সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের সময় র্যাম্প দুটির ওপর দিয়ে ভারি যানবাহন চলাচল করতে দেওয়ার ওপর নিষেধ করেছিলাম। এরকম একটি সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডও স্থাপন করেছিলাম। কিন্তু সিটি করপোরেশন সাইনবোর্ড সরিয়ে শহর এলাকার হালকা যানবাহনের পাশাপাশি ট্রাক-ট্রেইলারসহ ভারি যানবাহন চলাচল করার সুযোগ করে দেয়।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, পূর্ব পাশের র্যাম্পের পিলারের ওপর ক্যান্টিলিভারে এই ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান তার উদ্যোগে ফান্ড কালেকশন করে মূল ফ্লাইওভারের সঙ্গে সংযুক্তির জন্য ২০১৭ সালে আরাকান সড়কের ওপর র্যাম্প দুটি নির্মাণ করেন। আমরা ২০১৯ সালে এই র্যাম্পের ওপর দিয়ে শহর এলাকার হালকা যানবাহন ছাড়া ভারী যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলাম। ২০১৯ সালের ১ ডিসেম্বর ফ্লাইওভার ও র্যাম্প দেখাশোনার জন্য সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীদের দায়িত্ব হস্তান্তর করি। কিন্তু তারা পরে ভারী যানবাহন চলাচল করতে দেয়। এখন পূর্ব পাশের র্যাম্পের একটি পিলারের ওপর ক্যান্টিলিভারে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। আমরা নকশাকারি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে খবর দিয়েছি। আশা করি, তারা ঠিক করে দিতে পারবে।
ইত্তেফাক/আরকে
