করোনা ভাইরাস মহামারির ক্ষতি কাটাতে সরকার শিল্প ও সেবা খাতের জন্য স্বল্প সুদে যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তা থেকে ছোট ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না। অথচ তাদেরই বেশি দরকার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা এ খাত থেকে টাকা আগেই নিয়ে নিয়েছেন। এজন্য এ বিষয়ে এখন আর তারা কোনো কথা বলছেন না। অন্যদিকে তারাই যেহেতু চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী সেজন্য প্রণোদনা ঋণের অগ্রগতি এখন নেই বললেই চলে। ছোট উদ্যোক্তারা এ বিষয়ে গভর্নরসহ অন্যদের কাছে চিঠি দিলেও তাতে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। ফলে আদালতের দারস্ত হতে হচ্ছে তাদের।
এ খাতের ঋণের সদ্ব্যবহার হচ্ছে না এমন তথ্যের সত্যতা পাওয়ার পর ব্যাংকগুলোকে সঠিকভাবে প্রণোদনার ঋণ বিতরণের নির্দেশনা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। আর যারা এ খাত থেকে ঋণ পায়নি এমন প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দিতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি নির্দেশনা দেয়।

ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বড় ব্যবসায়ীদের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা ঋণের বাস্তবায়ন শতভাগের কাছাকাছি হলেও ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য বরাদ্দ ঋণ এখনো অনেক কম। চলতি অর্থবছরের প্রথম আড়াই মাসে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাত এবং কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে প্রণোদনা ঋণ বিতরণের হার ৩ শতাংশের নিচেই রয়ে গেছে। এই দুই খাতে চলতি মূলধন হিসেবে প্রণোদনার ঋণ দেওয়ার কথা ছিল।
এদিকে সময়মতো ঋণ না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা । আর এ বিপদের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর অভিযোগ করেছেন অনেক উদ্যোক্তা। ফাহাদ স্টিল করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী মো. রাকিবুল হাসান সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে এমন একটি চিঠি দিয়েছেন। যেখানে তার ব্যাবসায়িক ক্ষয়ক্ষতি এবং ঋণ না পাওয়ায় শোচনীয়ভাবে দিন যাপনের কথা তুলে ধরেছেন। সে চিঠির কোনো উত্তর দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ঘটনায় সংক্ষুব্ধ হয়ে তিনি হাইকোর্টে রিট ফাইল করেছেন। পরে এ ঘটনা ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দিয়েছে আদালত।
সূত্র জানায়, আলোচ্য দুই খাতের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতে দ্বিতীয় দফায় ঘোষিত ৩৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের বিপরীতে চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৫১৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এটি ঘোষিত প্যাকেজ ঋণ তহবিলের মাত্র ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। মোট ৫৫টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এ ঋণসুবিধা পেয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত
অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত সিএমএসএমই খাতে দ্বিতীয় দফায় ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঋণ প্যাকেজের বিপরীতে চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছে ৫৬৯ কোটি ১৯ লাখ টাকা। যা মাত্র দুই দশমিক ৮৪ শতাংশ। আর অনুমোদনের বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে ৪৭৭ কোটি টাকা বা দুই দশমিক ৩৮ শতাংশ।
সভায় উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর ব্যাংক ব্যবস্থার আওতায় সরকার ঘোষিত ১০টি প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে দুটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে। এর একটি হচ্ছে—২১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ‘রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল’ (সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ৯২০ জন ঋণগ্রহীতা) এবং অপরটি রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা প্রদানে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ তহবিল (সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৩৭ লাখ ৭৮ হাজার ৯৬৯ জন শ্রমিক)।
বাকি আটটি প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতে প্রথম দফায় ৪০ হাজার কোটি টাকার ঋণ তহবিলের বিপরীতে দেয়া হয়েছে ৩২ হাজার ৭০৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, যার বাস্তবায়ন হার ৮১.৭৫ ভাগ এবং সুবিধাপ্রাপ্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ৩,৩০৯টি। সিএমএসএমই খাতে প্রথম দফায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিলের বিপরীতে ঋণ দেয়া হয়েছে ১৬ হাজার ২১৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, যার বাস্তবায়ন হার ৮১.০৭ শতাংশ এবং সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ১,০০, ১২১টি। প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রি-ফাইন্যান্সিং স্কিম’-এর আওতায় ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ তহবিলের বিপরীতে দেওয়া হয়েছে ৩৭৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাস্তবায়নের হার ৭.৫১ ভাগ এবং সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ৬৫টি।

ছবি: সংগৃহীত
এসএমই খাতের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের আওতায় ২৭৪টি আবেদনের বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়েছে ২৯ কোটি চার লাখ টাকা। কৃষি খাতে ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন স্কিমের বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ৪৯৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
বাস্তবায়ন হার ৮৯.৮৭ ভাগ এবং সুবিধাভোগী কৃষক/কৃষি খামারের সংখ্যা ১,৮৩,০৭৫। অন্যান্যের মধ্যে পর্যটন খাতের (হোটেল/মোটেল/থিম পার্ক) কর্মচারীদের বেতনভাতা প্রদানে ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ তহবিলের ঘোষণা দেওয়া হলেও এ খাতে কোনো ঋণ দেয়া হয়নি।
বৈঠকসূত্র জানায়, করোনাকালীন গত ২০২০ সালের এপ্রিল-মে মাসের জন্য ঋণের বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সুদ-ভর্তুকি বাবদ ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে ১ হাজার ৩৯০ কোটি ৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়। যার বাস্তবায়ন হার ৬৯.৫ এবং সুবিধাভোগী ঋণগ্রহীতা ৭২ লাখ ৮২ হাজার ২৫৩ জন।
ইত্তেফাক/এএএম
