একাত্তরের ক্ষতচিহ্ন স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো দগদগে ঘা হয়ে বিরাজ করছে। এবারে ২০২১ সালের দুর্গাপূজার সময় ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলা আমাদের ফিরে নিয়ে যায় ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী এবং তাদের অনুসারীদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের দিকে। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। এই পরিস্থিতিতে চীন যখন তার সব ঋতুর বন্ধু পাকিস্তানের ওপর ভর করে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব-বলয় বৃদ্ধি করতে চাইছে তখন এ ব্যাপারে দ্বিতীয় বার চিন্তা তথা বাংলাদেশের কাছে চীনের ক্ষমা চাওয়ার যৌক্তিকতা এই লেখায় তুলে ধরা হচ্ছে।
চীনের কূটনীতি দক্ষিণ এশিয়ায় তার বন্ধু খুঁজে বেড়াচ্ছে। চীন এক্ষেত্রে তার সব ঋতুর বন্ধু পাকিস্তান, নতুন দোসর নেপাল, ঋণ-ফাঁদে বন্দি শ্রীলঙ্কাকে পেয়েছে। আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা দখলের সঙ্গে সঙ্গে সে দেশও চীনের ক্ষমতার অধীনে চলে গিয়েছে। যদিও তালেবানশাসিত বর্তমান আফগানিস্তান সরকারি পর্যায়ে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে চাইছে।
প্রশ্ন হলো, উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে চীন কেমন? সম্পর্কটা শুরু হয়েছিল হত্যাকারী এবং হত্যার শিকারে পরিণত হওয়া দুটি রাজনৈতিক সত্তার মধ্যকার মিথষ্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। চীনের বিরোধিতা সত্ত্বেও ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি চীন। বঙ্গবন্ধু চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চীন তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরেই কেবল চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর এবং ১৯৯১ সালে দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক পালাবদলের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব শুরু করে। খালেদা জিয়ার শাসনামলে ভারতীয় প্রভাবমুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে চীনের দ্বারস্থ হওয়া শুরু করে। যা উভয় দেশের জন্য সম্প্রসারিত কৌশলগত লাভ ছিল।
চীন ও পাকিস্তান তখন (১৯৯১-১৯৯৬) বাংলাদেশে সর্বাধিক সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী ছিল। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের জন্য এগুলো প্রয়োজন হয়েছিল। চীন-পাকিস্তান অক্ষ শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাব দেশের রাজনীতি, আমলাতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের গভীরে প্রবেশ করেছিল।
পরবর্তী বছরগুলোতে, বাংলাদেশে মেগা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে চীন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার হিসাবে আবির্ভূত হয়। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত তৃতীয় বিশ্বের কয়েকটি দেশে ঋণফাঁদে ধরা খাওয়া সম্পর্কে বিশ্বের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোর প্রতি বাংলাদেশের নেতাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। যা ঘটেছে তা হলো মেগা প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগকৃত বিশাল অঙ্কের টাকা এসব দেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগার পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ঋণের ফাঁদে বন্দি হওয়া সরকারগুলোকে ঋণমুক্ত করার জন্য চীন মেরিটাইম বন্দর এবং অন্য ফ্যাসিলিটিজগুলো ৯৯ বছরের লিজ নিয়েছে। এভাবেই কাহিনিটির পরিসমাপ্তি ঘটে! মনে রাখতে হবে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদাতা সর্বশেষ দেশ চীন।
১৯৭২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, গ্রেট ব্রিটেন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং আরো অনেক দেশ একটির পর একটি করে যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সমস্যা শুরু হয় যখন ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের জন্য বাংলাদেশ আবেদন করে তখন। বাংলাদেশের যখন আন্তর্জাতিক খাদ্য সাহায্য এবং পুনর্বাসনের জন্য বাজেট প্রয়োজন ছিল তখন চীন স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুই বার জাতিসংঘে বাংলাদেশে সদস্যপদের বিরোধিতা করেছে। ইচ্ছাকৃতভাবে চীন কর্তৃক বাংলাদেশের আবেদনের বিরোধিতা করার কারণ ভারতের হাতে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি এবং বেসামরিক ব্যক্তিবর্গেও প্রত্যাবর্তন বাস্তবায়ন না হওয়া। নিশ্চিতভাবেই পাকিস্তানকে ভালো রাখার উদ্দেশ্যেই চীন এই কাজটি করেছে।
এশীয় মহিরুহ চীনা তত্পরতার সামনে টিকে থাকা এবং দেশের কূটনৈতিক সামর্থ্য বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (এনএএম), কমনওয়েলথ এবং ইসলামি সম্মেলন সংস্থায় (ওআইসি) যোগদান করেন, যা বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করে।
সে সময় বাংলাদেশে সক্রিয় চীনাপন্থি কমিউনিস্ট পার্টিগুলো চীনা কমিউনিস্ট পার্টিও আশীর্বাদ লাভ করত। কয়েকটি ভাগে বিভক্ত বামপন্থি দলগুলো মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, স্বাধীন বাংলাদেশকে বাতিল করতে চেয়েছিল, ভারতপন্থি বলে নিন্দা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের বিরোধিতা করেছিল।
বঙ্গবন্ধু তার ‘আমার দেখা নয়াচীন’-এ লিখেছেন যে তিনি দুই বার চীন সফর করেছিলেন। প্রথম ১৯৫২ সালে এবং পরে ১৯৫৭ সালে। তার এই সফরের সময় তিনি মাও জে দং, জৌ এন লাই প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য তার অনুরোধে চীন সম্মত হবে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থন আদায়ের জন্য বঙ্গবন্ধু কূটনৈতিক চ্যানেল উন্মুক্ত করেছিলেন। বেইজিংয়ে সে সময় পাকিস্তানের ঝানু কূটনীতিক (১৯৬৯-১৯৭২), পুরান ঢাকার নবাব বংশের সদস্য খাজা মোহাম্মদ কায়সারকে তার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর দেশে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
রাষ্ট্রদূত কায়সারকে চীনা প্রধানমন্ত্রী জৌ এন লাই এই মর্মে অবহিত করেন যে, তিনি তার অসুবিধাটা বোঝেন। যা হোক, কায়সার ১৯৮৪ সালে দুই বছরের জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হয়ে বেইজিংয়ে ফিরে আসেন।
সাংবাদিক ও কবি ফয়েজ আহমদকেও বঙ্গবন্ধু চীনে পাঠিয়েছিলেন। ১৯৬০-এর দিকে রেডিও বেইজিং-এর বাংলা সার্ভিসে ফয়েজ যখন কাজ করতেন তখন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল। ১৯৬৬-১৯৬৯ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকাকালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ফয়েজের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। তখনই চীনা রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ফয়েজের ঘনিষ্ঠতার কথা বঙ্গবন্ধু জানতে পেরেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো ফয়েজ হংকং হয়ে বেইজিং যান এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। দুর্ভাগ্যবশত তিনি বেইজিং থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসেন। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মিশনগুলো একের পর এক ব্যর্থ হওয়ার পরেও বঙ্গবন্ধু আশা ছাড়েন নাই।
শেষ পর্যন্ত চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, তবে নির্বাচিত বঙ্গবন্ধু সরকার থাকতে নয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী অভ্যুত্থানের নেতাদের সরকারের শাসনকে চীন স্বীকৃতি দেয়।
লেখক: ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ এবং চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইত্তেফাক/কেকে
