সোমবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ৩ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

আভিজাত্য, বিশালত্বে অমর গ্র্যান্ড মস্ক

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২১, ০৯:৩১

এশিয়া কাপের ম্যাচ কাভার করতে ২০১৮ সালে দুইবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে এসেছিলাম। কিন্তু ম্যাচের বাইরে আবুধাবি শহর, বাইরের কিছুই দেখা হয়নি। এবার বিশ্বকাপেও গত ২৭ অক্টোবর আবুধাবিতে এসে স্টেডিয়াম থেকে ভগ্ন মনরথে ফিরে গিয়েছিলাম দুবাই।

বাংলাদেশের ম্যাচ থাকলেও গতকাল সকালের সময়টা কাজে লাগানোর চিন্তা করেছিলাম। শারজাহর আল জুবেইল বাস স্ট্যান্ড থেকে খুব সকালে পাকিস্তানি ড্রাইভার মোহাম্মদ শেরিনের ট্যাক্সিতে আমরা কজন রওনা হই। গন্তব্য আবুধাবির শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মস্ক (মসজিদ)। সুবিশাল এই মসজিদের গল্প অনেকবার শুনেছি। কিন্তু চর্মচক্ষে তা দেখা হয়নি। ড্রাইভার শেরিনের তথ্য অনুযায়ী আটটি গেইট আছে মসজিদের। খুঁজে নিতে হবে কোন গেইট খোলা আছে। কারণ করোনার কারণে কিছু কড়াকড়ি রয়েছে এখন।

বেলা ১১টায় পৌঁছে যাই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। নিরাপত্তা কর্মীর দেখানো পথে চলে যাই প্রবেশ মুখে। বিশ্বকাপ কাভার করতে আসা বাংলাদেশি আরও জনা ১৫ সাংবাদিক, দর্শককেও পেয়ে যাই সেখানে।

ঢুকতে যেতেই দেখাতে হয়েছে করোনার টিকা নেয়ার সনদ, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে করোনা পরীক্ষায় নেগেটিভ হওয়ার রিপোর্ট। জায়গা শপিং মলের মতো বিরাট, রয়েছে বিভিন্ন পণ্যের দোকান। ওয়াশরুম, নামাজের ঘর সবই আছে। পুরোটাই মাটির নিচে।

শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মস্ক।

মসজিদে যেতে বিনামূল্যে নিবন্ধন করতে হলো অনলাইনে। মসজিদে গিয়ে সুযোগ না থাকায় এখানেই ওযু করে যেতে হলো। বিমানবন্দরের মতোই স্ক্যানিং হলো সঙ্গে থাকা সবকিছুর। ল্যাপটপ রেখে যেতে হলো, লকার রুমে। তারপর লম্বা টানেলের ন্যায় পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয়, চলন্ত সিঁড়ি রয়েছে। ফিরতি পথে অবশ্য ক্লান্ত দর্শনার্থীরা ছোট ছোট গাড়ির সেবা নিতে পারেন।

গতকাল মঙ্গলবার দেখা গেল, হাজারো দর্শনার্থী এখানে। বিভিন্ন দেশের, নানা বর্ণের লোকের সমাগম। প্রাচ্যের অনেক দেশের স্বল্পবসনা নারীদের পোশাক দিল কর্তৃপক্ষই। আবার অনেকে নিজে থেকে বোরখা তথা পরিপূর্ণ পর্দা নিয়েই এসেছেন। মিনিট দশেকের পথ শেষে ভূমি থেকে উঁচুতে মসজিদে এসে পৌঁছাই।

মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের জায়গা হলেও সামগ্রিকভাবে সবার জন্যই উন্মুক্ত এটি। আকর্ষণীয় এই স্থাপনা দেখতে আগ্রহী বহু পর্যটক। ৩০ একর জমির উপর ১১ বছরে নির্মাণ করা হয়েছে গ্র্যান্ড মসজিদ। আমিরাতের প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহইয়ান এর নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন। মৃত্যুর পর মসজিদের পাশেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। মসজিদটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২ বিলিয়ন দিরহাম (৫৪৫ মিলিয়ন ডলার)। ৪১ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন। ৮২টি গম্বুজ রয়েছে, মিনারের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৩৫১ ফিট। মার্বেল, স্বর্ণ, পাথর, সিরামিকস ব্যবহার হয়েছে মসজিদে। ১৪ টি দেশ থেকে এসেছে এসব সরঞ্জাম।

শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মস্ক।

নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বেশ কঠোর। মূল নামাজ ঘরে এখন প্রবেশ নিষেধ। সৌভাগ্যক্রমে আমরা যোহরের নামাজটা জামাতে এখানে আদায় করতে পেরেছিলাম। প্রত্যেককেই একটা আলাদা বড় কাগজ দেয়া হয়। সামাজিক দূরত্ব মেনে নামাজ আদায়ের পর সেটি ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হয়।

তীব্র রোদেও দর্শনার্থীদের বিরামহীন ছুটে চলা। ঘুরে ঘুরে বড় বড় ঝাড়বাতি দেখা, বিভিন্ন স্থাপত্যশৈলীর সঙ্গে নিজেদের ক্যামেরা বন্দী করেন পর্যটকরা। তবে মসজিদের দেয়ালে হেলান দেয়া বারণ। পরিপূর্ণ শৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই মসজিদ পরিদর্শন করতে হয় সবাইকে। অবশ্য নিবিড় প্রশান্তি নিয়েই সবাই ফিরে যান।

আল্লাহর ঘর মসজিদ হলেও এর নির্মাণ যজ্ঞ, বিশালত্ব মিলে সবার কাছেই আকর্ষণীয় এবং দর্শনীয় স্থান। মুসলমানদের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও তাই গ্র্যান্ড মস্কের অপূর্ব সৌন্দর্য, আভিজাত্যের সুধা দেখতে ছুটে আসেন।

ইত্তেফাক/এমআর