সোমবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ৩ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

ছয় মাস পর কনফার্মেশন

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২১, ১৫:৫৬

ঠিক আটটা বেজে পঞ্চান্ন মিনিটে বায়োমেট্রিকে ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে  টেবিলে বসতেই তাসমিমা স্যারের ইন্টারকম ডাক। পুরো অফিসে তখন হাসপাতালের আইসিইউ’র মতো গম্ভীর নীরবতা, লাইফ সাপোর্টে থাকা স্বজনের মৃত্যুর আতঙ্কে দিনযাপন  আর যেকোনো মুহূর্তে নির্দিষ্ট জীবিকা হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মাঝে খুব একটা পার্থক্য নেই।

এ সময়ে এই ডাকের অর্থ সবার জানা। জানা অথচ অনুল্লেখ্য। অনস্বীকার্য এই সম্ভাবনাটা নিয়েই অফিস করছে সবাই। তাসমিমা স্যার কখন ডাকেন! গোল্ডেন অ্যাসেট নামক কোম্পানিটির এমডি তিনি।  ‘ম্যাডাম’ ডাকা  একদম পছন্দ করেন না, অফিসে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে আসা, করতে আসা, ছেড়ে চলে যাওয়া সবাই জানে এই অলিখিত নিয়মটা। 

স্যারের ঘরে একটা ফুরফুরে গন্ধ, অচেনা আতঙ্কের মতো, অস্তিত্বের ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দেয়। অনেকটা  মৃতবাড়ির আতর, লোবানের মতো, পবিত্র অথচ ভয়ার্ত। গন্ধটা নাকি তার ব্যবহৃত পারফিউমের। কী পারফিউম ব্যবহার করেন তিনি? নিশ্চয়ই কোনো নামি দামি ব্র্যান্ড।  আদার ব্যাপারির জাহাজের খবর নেওয়ার দরকার নেই অবশ্য! বাইরে বের হওয়ার সময় গায়ে একটু পাউডার বোলানোও যার কাছে বিলাসিতা, তার পারফিউমের ব্র্যান্ডের খবর নেওয়ার দরকারটা কী! নিজের অর্বাচীন বোকা চিন্তায় নিজেই হেসে ফেলে সে। 

তাসমিমা স্যার যখন-তখন যে কাউকে ডাকেন না। তাসমিমা স্যার ডাকা মানেই চোরাবালিতে পা আটকে যাওয়া, উত্তাল সমুদ্রে লাশ হয়ে ভেসে ওঠা। তাই যতদিন, যতবার স্যারের ডাকে এই স্বপ্নের মতো সুসজ্জিত কক্ষটিতে ঢুকেছে তুহিন, ততবারই মনে হয়েছে, এই তো চোরাবালিতে পা আটকালো বলে, এই গন্ধটি সে হারিয়ে ফেললো বলে! তাই  যতবার তার কক্ষে ঢুকেছে, প্রাণভরে গন্ধটা ভেতরে নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে, যেন কোনোভাবেই হারিয়ে না যেতে পারে। যেন গন্ধটা ঢুকে যায় ফুসফুসের অলিন্দে অলিন্দে। আইসিইউ রোগীর নেওয়া অক্সিজেনের মতো এই গন্ধটা দীর্ঘ নিশ্বাসে নিতে পারে, আবার প্রশ্বাসে ছাড়লেও ভেতরেই থেকে যায়। 

কিন্তু কক্ষ থেকে বেরিয়ে প্রতিবারই টের পেয়েছে গন্ধটি আর তার সঙ্গে নেই। আজও ভুল করেনি বুক ভরে শ্বাস নিতে। যথারীতি  আজও বের হয়ে টের পেয়েছে গন্ধটি সঙ্গে নেই।  আজ তাসমিমা স্যার তুহিনের হাতে যে খামটি ধরিয়ে দিয়েছেন, তাতে একেবারে গন্ধ শুষে নেওয়ার শেষ বার্তা  চাকরির ছাড়পত্র, অর্থাৎ কাল থেকে আর চাইলেও সে গন্ধটা ফুসফুস ভরে নেওয়ার সুযোগ  পাবে না। এই ভাবনায় যে বিষণ্নতা মনকে যেভাবে গ্রাস করে, চাকরি হারানোর ফলে তার দিকে ধেয়ে আসা সমস্যাগুলো তাকে সেই মুহূর্তে সেভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে না। সকালবেলা শার্ট-টাই,  অফিসের উজ্জ্বল আলোর নিচে নিজস্ব চেয়ার, পিসি, ফিসফিসিয়ে কথা বলা আভিজাত্য, ফ্রি চা-কফি কাল থেকে কিছুই নেই। নিরুত্তাপ ম্যাড়মেড়ে ঘরের অনুপেক্ষণীয় অসহ্যতা।

বৃষ্টিতে ভিজে আধামাইল দূরে পরোটা ভাজির দোকানটাতে যাওয়া হবে না। খাওয়াও হবে না। খিদে লাগবে, সহ্য করে নিলে চল্লিশ টাকা বেঁচে যাবে। এই মুহূর্তে চল্লিশ টাকা বাঁচানো খুব জরুরি নয়। আবার বেঁচে গেলেও মন্দ নয়। বাসার জন্য এক প্যাকেট বিস্কিট নেওয়া যাবে।

এই মহামারী কালে একের পর এক শিপমেন্ট বাতিল হচ্ছে, এক্সপোর্ট বলতে গেলে বন্ধ। কোম্পানি লক আপের মুখোমুখি। এই অবস্থায় এমপ্লয়ি পোষা কঠিন বটে। শুধু তুহিনকে নয়, অনেককেই। প্রতিদিন একজন দুজন করে চিঠি পাচ্ছে। তুহিনও মানসিক ভাবে তৈরি ছিল। চিঠিটি স্যার মেইলে দিলেই পারতেন, তা না করে হাতে হাতে দিলেন মূলত সঙ্গে আনুষঙ্গিক সান্ত্বনা কিংবা অনিবার্য  অপারগতামূলক কথাগুলো বলার জন্য। দু-দুটো শিপমেন্ট অর্ডার ঝুলে আছে। পজেটিভ ডিসিশান এলে আবার তাকেই সবার আগে ডাকা হবে, এই সান্ত্বনাটুকুই বা কম কী, এই ঊষর সময়ে? চিঠিটি হাতে হাতে দেওয়ার সময় তিনি মুচকি হেসে  আশ্বস্ততার সুরে বলেছেন,  দুয়েকদিনের মধ্যেই হয়তো আবার সে ডাক  পেতে পারে। এমনটা বিশ্বাস করতে তার ভালো লাগে। তুহিনের  কাছে কথাগুলো কেবল সান্ত্বনা মনে হয় না,বিশ্বাস্য আশ্বাসই বোধ হয়।

এর একটা গ্রহণযোগ্য কারণ রয়েছে অবশ্য। তাসমিমা স্যারের অফিসে তার চাকরিটা হয়েছিল বিশেষ তদবিরে। সে অন্য ইতিহাস। অন্যরকম ইতিহাস। বেশ চটকদার ও ব্যতিক্রম।  ফাঁকে সেটা একটু বলে নেওয়া যেতে পারে।  তানিয়ার প্রতি আকর্ষণ জন্মেছিল তাসমিমা স্যারের। একটা প্রজেক্টে কাজ করতে গিয়ে কলকাতার হোটেল রুমে তাসমিমা স্যার রুমে ডেকে নিয়ে তানিয়ার গায়ে হাত দিয়েছিলেন। ফেসবুকে নারীর অধিকার নিয়ে তুড়ি ছুটানো তানিয়া অবশ্য এই আকর্ষণকে দোষের মনে করেনি। কিন্তু বিনা অনুমতিতে গায়ে হাত দেওয়ায় ক্ষেপে গিয়েছিলো ভীষণ। তাসমিমা কড়া নারীবাদী, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওর লাখখানেক ফলোয়ার। সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে ওর কলম, থুড়ি, স্ট্যাটাস তীব্র সোচ্চার। একবার যদি কিছু লিখে দেয় তো  তাসমিমা স্যারের বিদেশ ফেরত ডিগ্রি, কোম্পানির গুড উইল সব পচা শামুকে পা কাটার মতো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে চোখের নিমিষে। আর এই ফেসবুক ভাইরালের হুজুগে যুগে তো কত মিথ্যেই কান নিয়েছে চিলের মতো দেশে বিদেশে ছড়িয়ে যায়, আর এ তো জলজ্ব্যান্ত সত্য ঘটনা! 

যাই হোক, পরে তাসমিমা স্যারের উদ্যোগেই একটা গ্রহণযোগ্য নেগোশিয়েসন হয়েছিল দুজনের। আর একটা ওপর দেখানো বন্ধুত্বও। যার অদূরপ্রসারী লাভ এই চাকরি। তাসমিমা স্যার অবশ্য জানেন না তানিয়ার সঙ্গে তুহিনের সম্পর্কটা কী বা কতখানি! তানিয়ারও বিশেষ ইচ্ছা ছিল না, এই কোম্পানিতে তুহিন চাকরি করুক। 

আসলে তুহিনের চাকরিটা অনেক হিসাব-নিকাশের ফসল। তাসমিমা স্যার ভেবেছেন তানিয়ার অনুরোধে একটা চাকরি দিয়ে তানিয়াকে কিছু দায়বদ্ধ করে রাখা যায়, যেন তার মুখ খোলা নিয়ে আর অযথা টেনশন না থাকে। তানিয়াও তুহিনের চাপাচাপিতে শেষ মেশ ভেবেছে, ক্ষতি কী! যথেষ্ট যোগ্যতা নিয়েই তো তুহিন চাকরিতে যাচ্ছে। যেনতেন কাউকে তো সে জোর করে ঢোকাচ্ছে না। 

আদতে তুহিনের পারিবারিক পরিস্থিতি  তখন একেবারে খাদে পড়া গাড়ির মতো উপায়হীন। মাথার ওপর রোজগার করা বড় ভাইটা হঠাৎ রোড এক্সিডেন্টে মারা গেলে পারিবারিক  সমস্যাগুলো অপারেশান থিয়েটারে মারা যাওয়া রোগীর খবর নিয়ে বাইরে আসা ডাক্তারের মতো অসহায় হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে যায়। ভাইয়ের বউ, নাবালক বাচ্চা। হার্টের রোগী বাবার পেনশনের টাকাটা যাও ছিল সবেধন নীলমণি,  মাসিক বেনিফিট আসতো। বাবার হার্টে রিং বসাতে সবটুকু ভাঙতে হলো, বাবাও বাঁচলো না। মায়ের চোখে ভেসে থাকা নির্বিকার হতাশা কতটা চল্লিশ বছর সংসার করা জীবনসঙ্গীর জন্য কতটা ফুরিয়ে যাওয়া টাকাগুলোর জন্য তুহিন  ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেনা মা মুখ না খোলার ফলে। এখন মাকে অবশ্য মাঝে মাঝেই পেনশনের টাকাগুলোর জন্য হা হুতাশ করতে শোনা যায়। নিজের একগাদা মেডিক্যাল টেস্টের বিল  কিংবা রব্বানির সেশন ফির বড় সড় এমাউন্টের প্রয়োজন পড়লেই মা 'তবু মানুষটা বাঁচলেও বুঝতাম' বলে টাকার জন্য আফসোসটা ওজনহীন করতে চান বটে প্রাণপণে, কিন্তু পারেন না। তুহিন জানে সংসারে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে বাঁচা মানে সবার অহেতুক বোঝা হয়ে বাঁচা। না ফেলা যায়, না রাখা যায় এমন পুরনো আসবাব হয়ে গিয়েছিলেন বাবা। সারাজীবন পরিবার পেলে পুষে, শেষ বয়সে বাবার মৃত্যুর জন্য আফসোসের চেয়ে টাকার আফসোসটাই সংসারে বড় হয়ে দেখা দেয়, এর চেয়ে অনিবার্য নগ্ন সত্য আর হয় না। স্বীকার করলেও, স্বীকার না করলেও। 

তুহিনের যখন মাস্টার্স শেষ হলো, তখন কোথাও  মহামারীর কারণে চাকরি বাকরির সুযোগ দূরে থাক  ক্ষীণ আলোক রেখাটারও  সন্ধান নেই। ঘরে নিত্য হা হুতাশ, দমবন্ধ দীর্ঘশ্বাসের মাঝে খুঁজে পেতে পাওয়া গেলো, একমাত্র তাসমিমা স্যারের এই খোলা জানালাটাই। মধ্যবিত্তের ভাবধরা মুখোশের অন্তরালের অভাবটা ঠিক খুলে দেখানো যায় না যেখানে সেখানে, নিম্নবিত্ত যেভাবে পারে সাহায্যের জন্য যেকোনো তালিকায় নামটা লিখিয়ে নিতে; মধ্যবিত্ত পারে না। পেটে খিদে মুখে লাজ! নির্দয় সামাজিক রীতি।  মহামারীর জন্য নানা দিক থেকেই আয়োজন চলছিল তখন সাহায্য সহযোগিতার। না কোথাও লাইন ধরা যায়, না  ঘরের এই নিত্য হা হুতাশ গায়ে সয়। এমন করুণ অবস্থায় পৌঁছেছিল তুহিন পরিবার নিয়ে। তুহিনই তাই ওকে চাপাচাপি করছিল তাসমিমা স্যারের অফিসে তার চাকরির জন্য তদবির করতে। তানিয়া চাইলে ওর বাবাকেও বলতে পারতো তুহিনের কথা, কিন্তু মুশকিল হলো তানিয়ার বাবা তুহিনকে দেখলেই বাংলা সিনেমার নায়িকার বাবার মতো মুখে চরম বিরক্তি ঝুলিয়ে দেন, সুযোগ পেলে ব্লাডি, স্কাউন্ডেল গালি দিতেও যে ছাড়বেন না, এটা তুহিনও বোঝে, তানিয়াও বোঝে। ফলে প্রেমিকের সম্মান রক্ষার্থে তুহিনকে বাবার মুখোমুখি করতেই চায় না ও। 

আজ ছাড়পত্রটি হাতে নিয়ে নিজের মানসিক  প্রস্তুতি থাকার কারণে তুহিন তেমন না ঘাবড়ালেও বেরিয়ে অন্যান্য সবার বিষণ্ন মুখে ঝুলে থাকা অব্যক্ত সান্ত্বনা আর আতঙ্কের বিব্রতকর আবহাওয়া পাড়ি দেওয়া কঠিন হয়। নিজের টেবিলে এসে বসে সে। শেষ বার কফিতে চুমুক দেয়।

প্রথমেই ফোন দেয় তানিয়াকে। তানিয়াকেই খবরটা সবার আগে জানানো দরকার। বারকয়েক ফোন করে তুহিন, কিন্তু তানিয়া ফোন ধরে না। আজ বাবার পছন্দ করা পাত্র, এলাকার ভবিষ্যৎ এমপির সঙ্গে বিয়ে পাকা  হওয়ার কথা তানিয়ার। তানিয়া দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এ বিয়ে সে করবে না। বাবার পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করার জন্য এত বড় বড় নারী অধিকারের বুলি আওড়ে গেলো এতকাল? অন্তত গতকাল পর্যন্ত তাই মত  ছিল তানিয়ার। তুহিনকে ছাড়া জীবন সে ভাবতেই পারে না। কিন্তু এই মুহূর্তে তানিয়া ফোন ধরছে না। তবে কি তানিয়া মত পাল্টেছে কিংবা পাল্টাতে বাধ্য হয়েছে? কে জানে! মানুষের মন তো নানা পারিপ্বার্শিক বাস্তবতায় পাল্টায়।     

বাইরে ঠিক দুপুর। দরদর করে ঘামিয়ে দেওয়া তীব্র রোদ ছিল একটু আগেও। কিন্তু বৈশাখের এই তপ্ত দহনটা হঠাৎই টুক করে গিলে নিয়েছে কাল বৈশাখীর কালো মেঘ। নিমিষে, জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতেই একটা বজ্রপাত জানালার কাঁচ কাঁপিয়ে দিলো ঝনঝনিয়ে। আর দেখতে দেখতেই ঝুম বৃষ্টি। সামনের কম্পিউটারে এক গাদা পেন্ডিং মেইল। দ্রুত শেষ করে, বুঝিয়ে দিয়ে যেতে হবে। অনেক কাজ, দ্রুত সারতে আদেশ দিয়েছেন তাসমিমা স্যার। কিন্তু কোনো কাজই হাতে উঠছে না তুহিনের। বারবার জানালা গলিয়ে দৃষ্টি চলে যাচ্ছে বাইরে। সে দৃষ্টিতে  হতাশা থাকার কথা, স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা থাকার কথা, সবকিছু ছাপিয়ে থাকার কথা অসহায়ত্ব। অথচ এর কিছুই না বরং  টুপটাপ বর্ষা পানি,পানিনে আগ লাগায়া। হুট করে গানটা স্মৃতি থেকে এসে ঠোঁটে বসে গুনগুনিয়ে উঠে আপনা-আপনি। হাসি পায় তুহিনের। গুনগুনিয়ে ওঠা আওয়াজটা তিতা ট্যাবলেটের মতো গিলে ফেলে ভাবে,যার ড্রয়ারে স্যাক হয়ে যাওয়ার চিঠি, কাল থেকে যার চাকরি নাই, ঘরে যার চার চারটি মুখ হা করে তার দিকে তাকিয়ে আছে তার বৃষ্টি দেখে গান আসে কণ্ঠে? দ্রুত কাজে মনোযোগী হয় তুহিন। চাকরি নেই বলে মোটেই অবহেলা দেখাতে চায় না। বলা তো যায় না, তাসমিমা স্যার যখন বলেছেন,যদি আবার ডাকেন!  তার স্কিলনেসের সাক্ষ্য থাকুক পাহারারত।   

মোবাইল স্ক্রিনে ১১ টা মিসডকল। ফোনটা সাইলেন্ট ছিল। এরমধ্যে তানিয়ার ১১ টা কল! শুনতে পায়নি সে। মেসেজও দিয়েছে। হায় হায়  তানিয়া নিচে বৃষ্টি ভিজছে,বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছে তানিয়া। দ্রত লিফটে নিচে নামে তুহিন।  তানিয়ার ঠাণ্ডা এলার্জি আছে। ঠাণ্ডা থেকে শ্বাসকষ্ট, ইনহেলার। বেচারি। নিজেকেও বলতে ছাড়ে না বেচারা! আহা!  বেচারা! বেচারা তুহিন। নিশ্চয়ই কত আশা নিয়ে নিশ্চয়ই এসেছে তানিয়া, কী করে এখন তাকে জানাবে আজই তানিয়ার তদবিরে হওয়া  চাকরিটা চলে গেছে তার!  

এই বৃষ্টির দুপুরের সঙ্গে নাকি খিচুড়ির সম্পর্ক আছে! ইলিশ ভাজা। লিফটে নামতে নামতে ভাবে , নাটক সিনেমার মতো এই দুপুরে তানিয়াকে সঙ্গে নিয়ে খিচুড়ি খাওয়া উচিত তার। কিন্তু বাস্তবে আজ দুপুরে তুহিনের কিছুই না খাওয়ার প্ল্যান। বৃষ্টি ভিজে আধামাইল দূরে পরোটা ভাজির দোকানটাতে যাওয়া হবেনা। খাওয়াও হবে না। খিদে লাগবে, সহ্য করে নিলে চল্লিশ টাকা বেঁচে যাবে। এই মুহূর্তে চল্লিশ টাকা বাঁচানো খুব জরুরি নয়। আবার বেঁচে গেলেও মন্দ নয়। বাসার জন্য এক প্যাকেট বিস্কিট নেওয়া যাবে।

চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছ, চাকরি পাওয়ার চারমাস পর আজ মনে হচ্ছে চাকরি পাওয়ার কথাটা বাসার কাউকে না বললেও চলতো। সবার প্রত্যাশা এভাবে লাগামহীন হয়ে উঠতো না। যেখানে সে নিজেও জানতো ছয়মাস প্রভিশনাল পিরিয়ড। ছয়মাস পার হলেই তবে চাকরি স্থায়ী।

প্রভিশনাল পিরিয়ড পার হওয়ার আগেই চাকরি নেই। কোম্পানির দোষ দিয়ে লাভ কী? পেন্ডামিকের আঘাত সেরে উঠে কয়েকটা অর্ডার আসার সঙ্গে সঙ্গেই  দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা, অর্ডার বাতিল; এসব তো কিছুই মিথ্যা নয়। প্রথম লকডাউনের ধাক্কা সামলে গোছগাছ করে শুরু করেই মাস চারেকের বেতন টেনেছে কোম্পানি। পাঁচ মাসের মাথায় জবাব দিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় যে কোম্পানির ছিল না, তা তো সে নিজেও বোঝে। 

তানিয়া  অপেক্ষা করছে। তানিয়াদের বাসার গলির মুখে 'স্বপ্নে'র বিরাট শো রুম, গলিতে ঢুকতেই বিশাল সাইনবোর্ড চোখে পড়ে,সাইনবোর্ডের পেছনে  তানিয়াদের বাড়িতে ঝলমল লাল-সবুজ-নীল আলো ঝলমল করছে। 

প্রথম চাকরি পাওয়ার একটা আলাদারকম আনন্দ আছে। আর তা যদি হয় একেবারেই আয় রোজগারহীন মধ্য মেঘনায় ডুবে যাওয়া নৌকার যাত্রীর মতো  হতাশায় ডুবে থাকা কোন পরিবারের,  জীবনের হাঁফ ছাড়তে এর চেয়ে বড় কোনো দাওয়াই নেই। চাকরির কথাটা বলে বলতে গেলে সে হামজার মতো উদ্ধারকারী জাহাজ নিয়ে হাজির হয়েছে সে হতাশায় ডুবন্ত  পরিবারের সামনে। মুক্তি দিতে চেয়েছে পুরো পরিবারকে দমবন্ধ ডুবে মরার অসহায় অবস্থা থেকে। পেরেছেও। সিনেমার নায়কের মতো নিয়োগপত্র দৌড়াতে দৌড়াতে মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া, মা আমার চাকরি হয়েছে। মা আমার চাকরি হয়েছে। ব্যাপারটা তেমন পাণ্ডুলিপির মতো ছিল না যদিও, তবে তার চেয়ে কমও ছিল না। তুহিনের পরিবারের জন্য অকল্পনীয় আশার ব্যাপার ছিল। 

নিচে নেমে তানিয়াকে কোনো রকমে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠায় সেই বেলা।  তানিয়া প্রথমে কিচ্ছু শুনতে রাজি হয় না, কোনো অজুহাত, কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ। চাকরিটা আজ চলে যাবে বেলা শুনছো, তুহিনের কণ্ঠে এরকম কৌতুকের সুরে তানিয়া ঠিক সত্যটা উপলব্ধি করে না, তবু দৃঢ়কণ্ঠে বলে, আমি খুব ভালো একটা চাকরি করি, তুমি জানো তুহিন। আর পুরুষ চাকরি করবে, ঘরের বউ বসে বসে খাবে এরকম নারী আমি নই। তাও তো তুমি ভালো করেই জানো।

ফেসবুকে নারী অধিকার নিয়ে তুমুল স্ট্যাটাস লেখা তানিয়া হ্যান্ডসাম বেতন পায় তুহিন জানে। তানিয়াকে সেই মুহূর্তে আর পরিষ্কার করে বলা হয় না, ততক্ষণে চাকরিটা চলে গেছে! বলার পরিবেশও তৈরি হয় না। জাঁদরেল মন্ত্রী ওর বাবা, আর তার পছন্দের পাত্র এতেই ঘুরপাক খায় আলোচনা। 

সন্ধ্যায় ওকে বাড়ি থেকে নিয়ে আসবে, এই শর্তে নিশ্চিত হয়ে তানিয়া বৃষ্টি ভিজে আবার ফিরে যেতে রাজি হয়, রিকশার হুডের ভেতরে ঢুকে যায় সব ভরসা গোছগাছ করে, আশা সঞ্চিত করে। অদ্ভুত মেয়ে তানিয়া, এই ঠিক দুপুরে তুহিন ওকে না খাইয়ে বিদায় দিচ্ছে, ওর কোনো অভিযোগ নেই, অভিযোগ করা যায়, এমনটাই সে ভাবতে পারে না।  

মাসের বেতনের খামটা হাতে নিয়ে তুহিন  বাসায় ঢোকে। অন্ধকার ঘরে ভাবি এসে টেবিলে চা রাখে। কপালে হাত রাখে। বুকজোড়া ইচ্ছে করে বাহুতে ঠেস দেয় যেন অসচেতনে লেগে গেছে, হাত কপাল ছেড়ে বুকের ঘন লোমে বিলি কেটে শরীর জাগাতে চেষ্টা করে। তুহিন ভাবিকে বলতে চায়, ভাবি আমার চাকরিটা আজ চলে গেছে। ভাবি খুব বুদ্ধিমতী। ভাইয়ার মৃত্যুর পর তুহিনকে হাত করে বুদ্ধির জোরেই টিকে থাকতে পেরেছে এ বাড়িতে। অভ্যাসের মতোই শাড়ির আঁচল খসিয়ে দেয় লোভার্ততার আশায় । তুহিনের আজ সাড়া নেই। কোনোভাবেই টলাতে না পেরে অবশেষে বলে, বাবুর প্রাইভেট টিউটরের বেতন দিতে হবে কাল। আবশ্যিক জেনেই আলো জ্বালিয়ে টাকাটা গুনে দেয় তুহিন। বলা হয় না, চাকরিটা আর নেই, সামনের মাসে কী হবে, সে জানে না। 

তানিয়া অপেক্ষা করছে। যাওয়ার আগে মাকে চাকরি চলে যাওয়ার খবরটা জানাতে চায় তুহিন।  জানাতে চায় তানিয়াকে নিয়ে আসার ব্যাপারটাও। মা আঁটি না বাঁধা আম কাটছেন উঁচু পিড়িতে বসে, আচার দেবেন। চাকরি যাওয়ার খবরটা দেওয়ার ধারেকাছে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে দেন না তিনি এই কাঁচা আম কাটা ঘ্রাণের মসৃণ সাংসারিক আয়োজনে। স্বাভাবিক অভ্যস্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে জানান, ঘরের বাজার প্রায় তলানিতে। আর হবেই তো, মাসের মাত্র শুরু, হিসাব করে চলাতে তবু দুয়েকটা দিন বেশি কাটছে। বলা হয় না, আগামী অনিশ্চয়তার কথা কিংবা মা-ই বলার সুযোগ দেন না। 

মাহীনের ঘরটা পার হওয়ার সময় মাহীন হাতের স্মার্টফোন টেবিলে রেখে সামান্য মনোযোগ এদিকে ঘুরিয়ে জানান দেয়,  ভাইয়া সেকেন্ড সেমিস্টারের টাকাটা এই সেকেন্ড উইকেই দিতে হবে। স্মার্টফোনের উজ্জ্বল আলোতে মাহীনের চোখদুটো আরও বুদ্ধিদীপ্ততায় চকচক করে। মা যেমন বলে, তার ছেলেদের মধ্যে মাহীনই সবচেয়ে বুদ্ধিমান। নিজের প্যান্ট শার্ট, স্মার্টফোন সব সে নিজে রোজগার করে কিনে। পরিবারের কাছে চায় না। যে পরিবারের নিত্যদিনের ভদ্রস্থ আবশ্যিক খরচগুলো আটকে থাকে, সে পরিবারের ছেলের এই দামি শার্ট প্যান্ট, স্মার্টফোন না কিনলে চলে কি না, প্রসঙ্গগুলো অবশ্য উহ্যই থেকে যায়, তুহিন বলতে চেয়েও কখনো বলে না। মাহীনকেও সে  আজ বলতে চায়, মাহীন আমার চাকরিটা চলে গেছে। মাহীনও সেই সুযোগ সৃষ্টি করে না; বরং নিজের বিরক্তিটাই প্রকাশ করে, কে জানে এবারও হয়তো অনলাইনেই পরীক্ষা নেবে, কিন্তু সেশন ফি তো দিতেই হবে ভাইয়া।  

তুহিনের জন্য অপেক্ষা করছে তানিয়া। দুপুরে ফিরে যাওয়ার পর থেকে তানিয়া অবশ্য আর ফোন দেয়নি। ওর বাসার দিকে রওয়ানা হয় তুহিন। তানিয়া  অপেক্ষা করছে। তানিয়াদের বাসার গলির মুখে 'স্বপ্নে'র বিরাট শো রুম, গলিতে ঢুকতেই বিশাল সাইনবোর্ড চোখে পড়ে,সাইনবোর্ডের পেছনে  তানিয়াদের বাড়িতে ঝলমল লাল-সবুজ-নীল আলো ঝলমল করছে। ছাদ থেকে নিচতলা পর্যন্ত। তানিয়ারা যেন কোন বাসাটায় থাকে? এ পাড়ার সব বাসাই দেখতে একই রকম। এখানে দাঁড়িয়ে আগে তানিয়াকে আবার একটা ফোন দেওয়া যাক।

ইত্তেফাক/এনই

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

মঈন ও তার বাইসাইকেল 

‘তোমরা নতুন লেখক তৈরি করো না বাপু’

অন্যের সিলেবাসে চলার দাসত্ব ও আত্মহত্যার দর্শন 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ফাদার দ্যতিয়েন যেভাবে হয়ে ওঠেন বাঙালির আত্মজন 

জীবন কি ‘পোকা’ হয়ে ওঠারই নাম? 

কবিতা

অভিভূতকর অপেক্ষা